পর্যটন দফতর পারেনি। সিটিসি পারল।
সঠিক জায়গায় সঠিক বিপণন এবং নিখুঁত ব্যবসার ভাবনাকে হাতিয়ার করলে যে লাভের কড়ি ঘরে তোলা যায়, তা হাতেনাতে করে দেখিয়েছে সিটিসি (ক্যালকাটা ট্রাম কোম্পানি)। এসি ট্রামে ‘ঐতিহাসিক কলকাতা’ ঘুরিয়ে দেখানোর প্রকল্প জনপ্রিয় করে তাতে লাভের কড়িও ঘরে তুলেছে তারা। যার জেরে, একটির বদলে পুজোর পরপরই দু’টি এসি ট্রাম নামানোর কথা ভাবছে সিটিসি।
কলকাতা শহরের পর্যটনকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে ২০১২ সালে এসি ট্রাম চালানো শুরু করেছিল পর্যটন দফতর। ‘চরৈবেতি’ নামের ওই ট্রামে কলকাতা ভ্রমণ শুরু হতো বিবাদী বাগ ডিপো থেকে। যেত বেলগাছিয়া ডিপো পর্যন্ত। ট্রামে যাত্রী নেওয়া হতো ২৪ জন। ভ্রমণের সময়ে পর্যটকদের দেওয়া হত হাল্কা জলখাবারও। যাত্রীপিছু ভাড়া ছিল ২৬০ টাকা।
কিন্তু আট মাস ট্রাম চালানোর পরেও লাভের মুখ দেখতে না-পেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে প্রকল্পটি। শেষমেশ ওই ট্রাম সিটিসি-র হাতেই তুলে দেয় পর্যটন দফতর। প্রথমে ঠিক হয়েছিল, ‘চরৈবেতি’ প্রকল্পটিই তুলে দেওয়া হবে। কিন্তু সিটিসি-র পক্ষ থেকে আর্জি জানানো হয়, কিছু দিন তাদের একটা সুযোগ দেওয়া হোক। ব্যর্থ হলে প্রকল্প তুলে দেওয়ার রাস্তা তো খোলাই রয়েছে। তার পরে প্রায় দেড় বছর কেটে গিয়েছে। সিটিসি সূত্রের খবর, দু’তিন মাস পর থেকে ওই প্রকল্পে যেমন ভিড় হচ্ছে, তেমনই লাভের মুখ দেখছে সিটিসি।
সাধারণত, ট্রাম চালিয়ে সিটিসি-র লোকসান হওয়াটাই দস্তুর হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেখানে এমন একটি প্রকল্প কী ভাবে লাভজনক হয়ে উঠল?
এর পিছনে পেশাদারিত্ব এবং সঠিক বিপণনই কারণ— জানাচ্ছেন সিটিসি-র তাবড় কর্তারা। এক কর্তার কথায়, ‘‘আমরা রুটে কিছুটা বদল ঘটিয়েছিলাম। একটির জায়গায় তিনটি রুট চালানো শুরু হয়েছিল। একটি ধর্মতলা থেকে খিদিরপুর। অন্য দু’টি ধর্মতলা থেকে কালীঘাট এবং শ্যামবাজার।’’ ওই কর্তা বলেন, ‘‘আরও দু’টি বদল আনা হয়েছিল। যাত্রীদের জলখাবারের ব্যবস্থা তুলে দিয়ে ভাড়া কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাতে খিদিরপুরের ভাড়া ধার্য হয়েছে একশো টাকা এবং বাকি দু’টি রুটে দেড়শো টাকা। ট্রামের মধ্যেই একটি ছোট প্যান্ট্রি কার করা হয়েছে।
যাত্রীরা ইচ্ছে করলে সেখান থেকে চা-কফি-জলখাবার-সফ্ট ড্রিঙ্ক কিনে খেতে পারেন।’’
কিন্তু এ সবের চেয়েও বেশি সাফল্য এসেছে বিপণনে। সিটিসি-র ম্যানেজিং ডিরেক্টর নীলাঞ্জন শান্ডিল্য বলেন, ‘‘আমরা ট্রাম চালানো শুরুর পরপরই বিভিন্ন জনপ্রিয় ট্যুর অপারেটরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। যোগাযোগ করা হয়েছিল সেনাবাহিনীর অফিসারদের সঙ্গেও। বাইরে থেকে আসা পর্যটকেরা যাতে খুব সহজে এবং সস্তায় এই শহরের ঐতিহ্য সম্পর্কে মোটের উপরে একটা ধারণা পেতে পারেন, সে জন্যই এই প্রচার করা হয়েছিল। তাতে আমরা সাফল্য পেয়েছি।’’
নীলাঞ্জনবাবু জানান, সাফল্য পাওয়ার পর এ বার আরও একটি ট্রাম নামানোর কথা ভাবছেন তাঁরা। সিটিসি সূত্রের খবর, জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি, নাখোদা মসজিদ, হেয়ার-হিন্দু স্কুল, প্রেসিডেন্সি কলেজ, বিবেকানন্দের বাড়ি, চাচার হোটেল, কফি হাউস, পাস্তুর ল্যাবরেটরি, ঠনঠনিয়া কালীবাড়ির মতো পুরনো কলকাতার নানা ঐতিহ্যবাহী সৌধ এবং বাড়ি দেখানো হয় ওই যাত্রায়। ট্রাম চলার সময়েই দু’দিকের ঐতিহ্যবাহী বিষয়বস্তু দেখিয়ে তা ব্যাখ্যাও করে দেওয়া হয় যাত্রীদের। প্রকল্পে সাফল্য আসার পরে যাত্রীদের ঐতিহাসিক কলকাতা সম্পর্কে ধারণা দিতে এ বার একটি করে পুস্তিকা দেওয়ার কথাও ভাবা হচ্ছে।