যে পথে হাতিরা বন থেকে বনান্তরে যায়, কলেজটা ঠিক সেই রাস্তার উপরেই।
সাঁঝের মুখে, যে পথে হরিণকুল শেষ বার জলের ডোবাটার দিকে দল বেঁধে হেঁটে যায়। নিঃশব্দে যাদের পিছু নেয় চিতাবাঘ, সেই পথেই সাইকেল কিংবা মোটরবাইকের ধুলো উড়িয়ে ঘরে ফিরছেন ছেলে-মেয়েরা।
রেল লাইনের পাশে, যে বনে রোদের আড়ালটুকু ঢুলুঢুলু চোখে উপভোগ করে হস্তিকুল, বাজখাই পাকুড়ের ডালে ধনেশ পাখি তার নিভৃত বাসা তৈরি করে যে ছায়ায়— কলেজ ব্রেকে শাল-সেগুনের সেই বনটাই পড়ুয়াদের সোল্লাশ আড্ডাখানা।
ডুয়ার্সের বানারহাটের লাগোয়া মরাঘাট চা বাগান ছুঁয়ে সেই আদিম ছায়ায় সদ্য গড়ে উঠেছে ‘বানারহাট হিন্দি কলেজ’। হাতি-হরিণের করিডরের আস্ত কলেজ বাড়ি গড়ে উন্নয়নের মুকুটে আরও একটি পালক গুঁজে জেলা প্রশাসনরে বিবৃতি—এলাকায় কলেজ গড়ার দাবি ছিল দীর্ঘ দিনের। সে সমস্যা মিটল।
স্থানীয় বাসিন্দা বুধিরাম ওঁরাও অবশ্য মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ‘‘বন পথে কলেজ গড়ায় কি সমস্যা মিটলো নাকি সমস্যা আরও ডেকে আনা হল!’’ বুধিরামের মতো স্থানীয় বাসিন্দারা, যাঁরা বছরের পর বছর, রেতি আর বানারহাটের জঙ্গলে হাতি-হরিণ-চিতাবাঘের সঙ্গে ঘর করেন, তাঁরা জানেন—করিডর বন্ধ হয়ে গেলে বনের পথ ছেড়ে হাতিরা বেরিয়ে আসে লোকালয়ে, চিতাবাঘ হানা দেয় গাঁয়ের গোয়ালে। তখন ঠেকাবে কে? তাঁর মতো আর পাঁচ জন আম আদমির কথায় অবশ্য কান দেওয়ার প্রয়োজন মনে করছেন না জেলা প্রশাসনের তাবড় কর্তারা। জলপাইগুড়ির জেলাশাসক পৃথা সরকার যেমন, সরকারি জমিতে কলেজ গড়ার মধ্যে আপত্তির কিছু দেখছেন না। এমনকী, ওই বন পথে কলেজ ভবন গড়ায় তেমন সমস্যার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন খোদ বনমন্ত্রী বিনয়কৃষ্ণ বর্মনও। বলছেন, ‘‘কলেজ আর কতটুকু জায়গা জুড়ে হয়েছে ওতে করিডর নষ্ট হয় না। বন্য পশুদের চলাচলের ক্ষতি হবে না।’’
সরকারি এই সিলমোহরে বুক বেঁধেই পড়ুয়ারা আসবেন তাদের সাধের হিন্দি কলেজে। ফিরে যাবেন বাইকের ধুলো উড়িয়ে।
যা দেখে সিউরে উঠছেন পশুপ্রেমীরা। পরিবেশ প্রেমী সংগঠন গুলির কর্মকর্তারা এক যোগে জানাচ্ছেন— কখনও দেশহারা শরনার্থীর দখলদারিতে আবার কখনও রাজনৈতিক নেতাদের মদতে করিডর জুড়ে বসত গড়েছে মানুষ। যা নিয়ে পালাবদলের পরে সরকারকে কখনও সতর্ক হতে দেখা য়ায়নি। এ বার রেতি-বানারহাট করিডর দখল করে এ ব্যাপারে ফের এক বার সরকারি ‘ঔদাসীন্য’ প্রমাণ করল রাজ্য সরকার।
বেশ কয়েকটি পরিবেশ প্রেমী সংস্থা ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তার প্রশ্নটিও খতিয়ে দেখার আবেদন করেছে। তাদের আশঙ্কা, যে কোনও সময়ে হাতিরা হানা দিতে পারে কলেজ চত্বরে। ঢুকতে পারে চিতাবাঘ। প্রশ্ন, তখন সামাল দেবে কে?
আলিপুরদুয়ার ‘নেচার ক্লাব’-এর পক্ষে অমল দত্ত বলেন, ‘‘ওটা একটা পরিচিত করিডর। হাতিদের অহরহ চলাচলের পথ। ওটা বন্ধ হয়ে গেলে হাতিরা লোকালয়ে ঢুকে পড়তে কতক্ষণ।’’ ‘ডুয়ার্স জাগরণ’ নামে অন্য একটি পরিবেশ প্রেমী সংস্থার সম্পাদক ভিক্টর বসুর কথায়, ‘‘ওখানে একটি ভেষজ তেল তৈরির কারখানা ছিল। সংস্থার পক্ষ থেকে দেওয়াল তোলা হয়েছিল। ভেঙে দিয়েছিল হাতিরা। জানি না এ বার কী হবে।’’
বানারহাট এলাকায় কলেজ নেই। ২৫ কিলোমিটার দূরের ধূপগুড়ি কিংবা বিশ কিলোমিটার দূরের বীরপাড়াই ছিল বানারহাটের পড়ুয়াদের উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্র। কলেজ গড়ার দাবিটা তাই দীর্ঘ দিনের।
পালাবদলের পরে তাই এলাকায় এসে মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা ছিল, অচিরেই গড়া হবে বানারহাট কলেজ। স্থানীয় বাগানে হিন্দি ভাষিদের আধিক্য বুঝে তাই হিন্দি কলেজ করারই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল শিক্ষা দফতরে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কলেজ ভবন তৈরির কতা ঘোষণার পরেই শাসক দলের মদতপুষ্ট বেশ কিছু দুষ্কৃতী ওই এলাকায় গাছ কাটা শুরু করেছিল। উন্নয়নের দোহাই দিয়ে প্রায় পাঁচ একর জমির গাছ অচিরেই খোয়া গিয়েছিল।
গাছ গিয়েছে খোয়া, চলাচলের পথ হয়েছে দখল— এক বন কর্তার কথায়, ‘‘এ বার পড়ুয়াদের সঙ্গে হাতিরাও না কলেজে ক্লাশ করতে ঢোকে!’’