Advertisement
০৩ ডিসেম্বর ২০২২

মড়ার ভান করে শুয়ে বুলেটের অপেক্ষায়

চাপ চাপ রক্ত। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা লাশ। কানফাটানো চিৎকার। এর মধ্যেই প্রায় এক ঘণ্টা মড়ার ভান করে পড়েছিলেন ২২ বছরের ইসোবেল বোদেরি। শুক্রবার রাতে বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে বাতাক্লাঁ থিয়েটারে গিয়েছিলেন ‘ঈগলস অব ডেথ মেটাল’ রক ব্যান্ডের গান শুনতে। আর তখনই মৃত্যুর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ। ফেসবুকে ইসোবেল জানিয়েছেন তাঁর সেই কাহিনি।চাপ চাপ রক্ত। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা লাশ। কানফাটানো চিৎকার। এর মধ্যেই প্রায় এক ঘণ্টা মড়ার ভান করে পড়েছিলেন ২২ বছরের ইসোবেল বোদেরি। শুক্রবার রাতে বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে বাতাক্লাঁ থিয়েটারে গিয়েছিলেন ‘ঈগলস অব ডেথ মেটাল’ রক ব্যান্ডের গান শুনতে। আর তখনই মৃত্যুর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ। ফেসবুকে ইসোবেল জানিয়েছেন তাঁর সেই কাহিনি।

শেষ আপডেট: ১৭ নভেম্বর ২০১৫ ০৩:৩৬
Share: Save:

এমনটাও হতে পারে!

Advertisement

অন্যান্য শুক্রবারের মতো সে দিনের পরিবেশটাও বেশ হাল্কা। রক গান শুনতে শুনতে সবাই নাচছে। হাসছে। আর ঠিক তখনই সামনের দরজাটা দিয়ে ওরা ঢুকল। শুরু করল এলোপাথাড়ি গুলি। সন্ত্রাস হামলা? বিশ্বাসই হয়নি। ভেবেছিলাম, এটাও ওই অনুষ্ঠানেরই অংশ।

একটু ক্ষণের মধ্যেই বুঝে গেলাম, এটা আসলে একটা হত্যালীলা। আমি দেখলাম, আমার ঠিক সামনেই গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়ছেন বহু মানুষ। রক্ত-বন্যা চারদিকে। বান্ধবীর রক্তাক্ত দেহ আঁকড়ে ধরে চিল চিৎকার করছেন কেউ। এ-ফোঁড় ও-ফোঁড় হয়ে যাচ্ছে হলঘরের প্রত্যেকটা দেওয়াল। মুহূর্তের মধ্যে শেষ হয়ে গেল অনেকগুলো ভবিষ্যৎ। একা হয়ে গেল বহু পরিবার।

নিরুপায়। অসহায় আমি। হত্যালীলার মধ্যে। আমিও মড়ার ভান করে পড়ে রইলাম। এক ঘণ্টারও বেশি। চেষ্টা করছিলাম শ্বাসও না নিতে। না নড়তে। না কাঁদতে। যে ভয়টাকে জাগাতে চায় ওরা, সেটাকেই জয় করতে চাইছিলাম আমি।

Advertisement

আমি বেঁচে গিয়েছি। আমি ভাগ্যবান। কিন্তু যাঁরা বাঁচলেন না, তাঁরাও তো আমারই মতো সে দিন ক্লাবে আনন্দ করতে এসেছিলেন। আমরা তো কেউ কোনও পাপ করিনি। তা হলে? আসলে এ পৃথিবীটা বড় নিষ্ঠুর। আর এই সন্ত্রাস হামলা মানুষের খারাপ দিকগুলোকেই যেন বার বার চোখের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়। কোনও দিন ভুলতে পারব না ওই লোকগুলোর মুখ। এদের ছবি সারা জীবন তাড়া করবে আমায়। শকুনের মতো। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল ওরা। খেয়াল রাখছিল, যাতে ভুলেও কেউ প্রাণ নিয়ে ফিরতে না পারে। সত্যিই যে এটা হচ্ছে, তখনও মানতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল কেউ এসে ঘুমটা ভাঙিয়ে দেবে। বলবে দুঃস্বপ্ন।

আমি কৃতজ্ঞ সেই মানুষটার কাছে, যিনি নিজের জীবন বাজি রেখে বাঁচিয়েছিলেন আমায়। কৃতজ্ঞ সেই দম্পতির কাছে, যাঁদের শেষ কয়েকটা কথা ছিল শুধু ভালবাসার, যাঁরা আমায় বিশ্বাস করতে শিখিয়েছিলেন পৃথিবীটা এখনও সুন্দর। আমি কৃতজ্ঞ সেই পুলিশের কাছে, যাঁর সাহায্যে বেঁচে গিয়েছেন হাজার হাজার মানুষ।

ভেবেছিলাম, আমার বন্ধুটিও বুঝি আর বেঁচে নেই। রক্তাক্ত এক জনকে দেখে ভেবেছিলাম, সেই আমার বন্ধু আমোরি। অঝোরে কাঁদছিলাম। বহু অপিরিচিত লোক তখন সান্ত্বনা দিয়েছিলেন আমায়। বলেছিলেন, ভয় নেই। সব ঠিক হয়ে যাবে। যদিও তাঁরাও তখন একা। তাঁরাও তখন সন্ত্রস্ত। আমি কৃতজ্ঞ তাঁদের প্রতিও।

সেই মহিলা— যিনি সে সময় নিজের বাড়ির দরজা খুলে বহু অসহায়দের সহায় দিয়েছিলেন, আমি তাঁকেও ধন্যবাদ জানাই। আর কৃতজ্ঞতা জানাই আমার বন্ধুটিকে। যে তখন আমার জন্য নতুন পোশাক না কিনে আনলে তার পর অনেক ক্ষণ ওই রক্ত মাখা জামা পরেই আমাকে থাকতে হতো।

আর অবশ্যই কৃতজ্ঞ তোমাদের প্রতি। যারা প্রতিনিয়ত আমার খোঁজ নিয়েছ। আমায় বিশ্বাস করতে শিখিয়েছ এই পৃথিবীটা এক দিন সুন্দর হবে। হবেই। এ সন্ত্রাসকে আমরা আটকাবই। এক দিন।

কিন্তু সেই ৮০ জন লোক, যাঁরা হলের ভিতরেই মারা গিয়েছেন? তাঁরা তো এখন জেগে উঠে দেখতে পাচ্ছেন না এই যন্ত্রণাটা! যে যন্ত্রণার পথ দিয়ে আজ হেঁটে যেতে হচ্ছে তাঁদের পরিবারকে। তাঁদের বন্ধুদের। আমি সত্যিই দুঃখিত। তবে জানি, কখনওই এ দুঃখে প্রলেপ দেওয়া সম্ভব নয়।

সেই মানুষগুলোর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁদের পাশে ছিলাম। আমি নিশ্চিত যে, তাঁদের জীবনের শেষ চিন্তা-ভাবনায় ঠাঁই পায়নি এই পশুগুলোর কথা। তাঁরা শেষ সময় শুধু ভাবছিলেন তাঁদের ভালবাসার মানুষগুলোর কথা। আমিও অপেক্ষা করছিলাম আমার মৃত্যুর জন্য। কখন বুলেটটা এসে আমার এই ২২ বছরের জীবনকে শেষ করে দেবে, প্রতিক্ষা করছিলাম তার। চোখের সামনে ভেসে উঠছিল ভালবাসার মুখগুলো। মনে মনে বলছিলাম, ভালবাসি তোমায়। তোমাদের। সব সময়।

এত কিছুর পরেও আমার একটাই কথা বলার। যা-ই হোক না কেন, পৃথিবীর সুন্দর দিকটাই যেন মনে রাখেন আমার বন্ধুরা। যারা হিংসা ছড়াচ্ছে তারা যেন কখনওই জিতে না যায়। শেষ মুহূর্তে এই চিন্তাগুলোই পাক খাচ্ছিল মাথায়।

গত রাতে অনেকের জীবন হয়তো পালটে গিয়েছে। বদলে গিয়েছে স্বপ্নগুলো। কিন্তু এই ঘটনার আগে যেমন ভাবে বাঁচতে চেয়েছিলাম— ঠিক যেন তেমনটাই থাকতে পারি।

তোমাদের সকলের আত্মার শান্তি কামনা করি। তোমাদের কখনও ভুলব না।

লেখা: ফেসবুকের সৌজন্যে

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.