অফিস যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিলাম শনিবার। ঘড়িতে তখন সকাল ১০টা সাড়ে ১০টা। খুব ব্যস্ত। খবর পেলাম ইরান হামলা করেছে! তখন ততটা মাথা ঘামাইনি। অফিস যাওয়ার তাড়া ছিল। রাস্তায় বেরোতেই অনেকের মুখে হামলা নিয়ে আলোচনা শুনলাম। আমার বাড়ি থেকে অফিস হাঁটা পথ। রোজকার মতো শনিবারও হেঁটেই, বলা চলে একটু ছুটেই অফিস ঢুকলাম। সেখানেও একই আলোচনা। তখন একটু চিন্তা হল! সঙ্গে সঙ্গে ফোন করলাম বাড়িতে। জানালাম বিষয়টা। আর টিভি, মোবাইলে নজর রাখতে বললাম।
আমার বাড়ি কলকাতার বাগুইআটিতে। মাস কয়েক আগে সেখান থেকে মা বাহরিনে এসেছেন। উনি আসার কয়েক মাসের মধ্যেই এমন হবে, ভাবতে পারিনি। যাই হোক, মনে একটা আতঙ্ক নিয়ে কাজ শুরু করলাম। কিন্তু কিছুতেই কাজে ঠিকঠাক মন বসাতে পারছিলাম না। অফিসের সকলের মুখেই একই কথা। টিভি চলছে। সেখানেও ইরানের হামলার খবর দেখাচ্ছে। সেই খবর দেখে আবার বাড়িতে ফোন করলাম। স্ত্রী ফোন ধরতেই মা এবং মেয়ের খবর নিলাম। স্ত্রী বলল, মেয়ে স্কুলে যায়নি। স্কুল নাকি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আর মা-ও একটু আতঙ্কে আছে। মায়ের সঙ্গে কথা বলে আশ্বস্ত করলাম ঠিকই, কিন্তু আমিও ভয়ে ছিলাম। তত ক্ষণে কলকাতায় পরিবারের বাকিরাও ফোন করে আমাদের খোঁজখবর নেওয়া শুরু করেছেন। তাঁদেরও আশ্বস্ত করলাম কোনও রকমে।
অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্তারা মিটিং করে ছুটি দিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আমিও আমার ডিপার্টমেন্টের সকলকে ছুটির কথা জানিয়ে ব্যাগ গুছিয়ে বাড়িতে ফিরে যাই। তবে সারা ক্ষণই চোখ ছিল মোবাইলের পর্দায়। আমার মেয়ের আট বছর বয়স। দু’বছর আগে বাহরিনে এসেছি আমরা। কিন্তু আগে কখনও এমন অবস্থা দেখিনি। বাহরিন খুবই ছোট্ট দেশ। মোটের উপর শান্তিতেই থাকি আমরা। কিন্তু গত ৪৮ ঘণ্টায় সেই চেনা ছবি পাল্টে গিয়েছে।
আরও পড়ুন:
সকাল হোক বা দুপুর কিংবা রাত— মাঝেমাঝেই সাইরেন বাজছে। আর সাইরেন বাজলেই আতঙ্ক। খালি ভাবছি, আবার কোথায় হামলা হল! শনিবার বিকেলের পর থেকেই ঘরে বন্দি আমরা। সারা সন্ধ্যা টিভি দেখে, মোবাইলে খবরাখবর নিয়ে কাটালাম। রাত আড়াইটের সময় আবার সাইরেন বেজে ওঠে। সাইরেনের শব্দে ঘুম ভাঙতেই ধড়মড়িয়ে উঠলাম। সোজা চলে গেলাম ছাদে। কারণ, ঘরের মধ্যে থেকে কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না।
আমাদের মতো আরও অনেকেই ছাদে জড়ো হয়েছিলেন। সকলের চোখেমুখেই আতঙ্ক। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি আলোর ছটা। টিভি বা মোবাইলে এত ক্ষণ যা দেখছিলাম, এ বার সেটাই চোখের সামনে দেখলাম। দেখলাম ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র কী ভাবে এ দিক থেকে অন্য দিকে যাচ্ছে। তবে এটাই স্বস্তির, বেশির ভাগ ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্রই মাটিতে বা কোনও বিল্ডিংয়ে আছড়ে পড়ার আগে মাঝআকাশে ধ্বংস হয়েছে। বেশ কিছু ক্ষণ ছাদে থাকার পর ঘরে ফিরে আসি। তখনও ঘন ঘন সাইরেন বাজছে। সেই আওয়াজ শুনতে শুনতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বুঝতে পারিনি। রবিবার খুব ভোরে ঘুম ভাঙে। বেশি ক্ষণ ঘুমোতেও পারিনি।
রবিবার সারা দিন ঘরবন্দি ছিলাম। আমি থাকি সালমাবাদে। রবিবার সকালে তেমন সাইরেনের শব্দ শুনিনি। কিন্তু ছাদে গিয়ে দেখলাম অদূরে তিনটি বড় বড় বিল্ডিংয়ে আগুন ধরে গিয়েছে। ধোঁয়া বার হচ্ছে তখনও। বুঝলাম যে সব ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি, সেগুলি আঘাত করেছে ওই বিল্ডিংগুলিতে। খবর নিয়ে জানলাম ভাগ্যক্রমে কারও কোনও ক্ষতি হয়নি! একটু নিশ্চিন্ত হলাম। তবে ভয় যে কাটল তা নয়। মনে হচ্ছিল, ওই ড্রোন আমাদের বিল্ডিংয়েও আঘাত করতে পারত!
রবিবার সাইরেনের শব্দ শুনতে না-পেয়ে ভাবলাম আর হামলা হবে। হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। কিন্তু সন্ধ্যা গড়াতে না-গড়াতে আবার সাইরেন বাজতে শুরু করল। ঘন ঘন সাইরেন। সেই সঙ্গে বিকট শব্দ। কোথায় আবার হামলা হল, তা নিয়ে চিন্তা শুরু হয়ে গেল। টিভিতে দেখার চেষ্টা করছিলাম, কোথায় হামলা হয়েছে! তবে তেমন খবর না-পাওয়ায় উৎকণ্ঠা নিয়ে ঘুমালাম। সোমবার সকাল ৬টা নাগাদ আবার সাইরেনের শব্দেই ঘুম ভাঙল।
খোঁজখবর নিয়ে জানলাম, মিনাসালমান বন্দরে একটি জাহাজে হামলা হয়েছে! ভাবছি, কী হবে। সোমবার ঘন ঘন সাইরেন না-বাজলেও একদম বন্ধ হয়নি। তবে নতুন করে কোথায় হামলা হয়েছে, তা জানতে পারছি না। কাল কী হবে জানি না। পরের সপ্তাহেই মেয়ের পরীক্ষা। কিন্তু স্কুলে যাওয়া বন্ধ। স্কুল বলেছে, পরীক্ষা হবে অনলাইনে। কিন্তু এই ‘যুদ্ধ পরিস্থিতিতে’ পড়াশোনায় মন বসাতে পারছে না মেয়ে। আমরাও চিন্তায়। বাহরিনে দু’বছরের বেশি রয়েছি। এই ছবি দেখিনি। যাঁরা কয়েক দশক ধরে রয়েছেন, তাঁরাও দেখেননি। এখনও জানি না, কাল অফিস যেতে পারব কি না। কবে আবার সব স্বাভাবিক হবে, তারই অপেক্ষায় রয়েছি।
(লেখক বাহরিনের সালমাবাদের মার্সিডিজ় বেঞ্জের ওয়ার্কশপে সুপারভাইজ়ার পদে কর্মরত)