ভারত বা পাকিস্তান নয়। অন্য কোনও দেশও নয়। সব কিছুর আগে গুরুত্ব দেওয়া হবে বাংলাদেশকেই। নির্বাচনী প্রচারের প্রথম দিনে বাংলাদেশের সাধারণ জনতার উদ্দেশে এই বার্তাই দিলেন বিএনপি চেয়ারপার্সন তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার সিলেটে নির্বাচনী প্রচারসভা থেকে তিনি বলেন, “যেমন দিল্লি নয়, তেমন পিন্ডি (রাওয়ালপিন্ডি) নয়, নয় অন্য কোনও দেশ। সকলের আগে বাংলাদেশ।”
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন রয়েছে। তার আগে বুধবার পর্যন্ত প্রতীক বরাদ্দ করা হয়েছে প্রার্থীদের। বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয়েছে নির্বাচনী প্রচার। চলবে আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। নির্বাচনী প্রচারের প্রথম দিনেই সিলেট-সহ সাত জেলায় সভা রয়েছে তারেকের। সিলেটে ছিল তাঁর প্রথম সভা। আগামী দিনে সরকার গড়লে বিএনপি বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান কেমন করতে চায়, তা প্রথম সভা থেকেই স্পষ্ট করে দিলেন খালেদাপুত্র। বুঝিয়ে দিলেন, ভারত, পাকিস্তান বা অন্য কোনও দেশ নয়, বিএনপি সরকার গড়লে বাংলাদেশের প্রয়োজনকেই আগে প্রাধান্য দেওয়া হবে।
২০২৪ সালের মে মাসে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকারের পতন হয়। তার পর গত দেড় বছরে দিল্লি এবং ঢাকার মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কে এক টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছে। হাসিনার ভারতে সাময়িক আশ্রয় নেওয়া থেকে শুরু করে ক্রিকেট নিয়ে দু’দেশের সাম্প্রতিক দ্বন্দ্ব— গত দেড় দশকে এমন বিভিন্ন ঘটনায় দিল্লি এবং ঢাকার মধ্যে চাপানউতর চলেছে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচারের অভিযোগ নিয়েও বার বার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ভারত। পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে বাংলাদেশে ভারতীয় হাই কমিশন এবং অন্য কূটনৈতিক দফতরে নিযুক্ত কর্মীদের পরিবারকে দেশে পাঠানোর পরামর্শ দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। সূত্রের খবর, ভোটমুখী বাংলাদেশের পরিস্থিতি বিচার করেই এই পরামর্শ দিয়েছে বিদেশ মন্ত্রক।
অন্যদিকে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পেয়েছে বাংলাদেশের। ইউনূসদের আমলে পাকিস্তানের সঙ্গে ফের বাংলাদেশের সরাসরি বাণিজ্য শুরু হয়েছে, যা হাসিনা পতনের আগে গত দেড় দশক ধরে প্রায় বন্ধই ছিল। হাসিনা পতনের পরে পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী তথা বিদেশমন্ত্রী ইশাক দার ঢাকা থেকে ঘুরে গিয়েছেন। পাক নৌসেনার জাহাজ এসে ঘুরে গিয়েছে বাংলাদেশ থেকে। বাংলাদেশের সেনা আধিকারিকেরাও পাকিস্তান থেকে ঘুরে এসেছেন। দু’দেশের মধ্যে ভিসা-ব্যবস্থাও শিথিল হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন নেতার মুখে ভারতবিরোধী স্লোগান শোনা গিয়েছে। বাংলাদেশের তরুণ নেতা ওসমান হাদির শেষকৃত্যের সময়েও এমন বেশ কিছু স্লোগান উঠেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যখন দিল্লি এবং ঢাকার মধ্যে কূটনৈতিক টানাপড়েন প্রকট হয়েছে, তেমনই প্রকট হয়েছে বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের সখ্যও। এই পরিস্থিতিতে তারেকের এই অবস্থান যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। খালেদাপুত্র বলেন, “দেশের মানুষই হচ্ছে আমাদের রাজনৈতিক সব ক্ষমতার উৎস। সে জন্যই আমরা দেশের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে বিশ্বাস করি।”
বস্তুত, খালেদার মৃত্যুর পরে তাঁর শেষকৃত্যে বাংলাদেশে গিয়েছিলেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। সেখানে তারেকের হাতে মোদীর লেখা চিঠি তুলে দেন তিনি। চিঠিতে মোদী লিখেছিলেন, খালেদার মৃত্যু বাংলাদেশে এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি করবে বলে মনে করছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, খালেদা যে মতাদর্শ নিয়ে চলতেন, তারেকও তা আগামী দিনে সঠিক ভাবে বহন করবেন বলে তিনি মনে করেন। ‘ইন্ডিয়া টুডে’ অনুসারে ওই চিঠিতে মোদী লিখেছিলেন, ‘‘তাঁর (খালেদার) মৃত্যু একটি অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি করেছে। তবে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি এবং (রাজনৈতিক) উত্তরাধিকার অক্ষুণ্ণ থাকবে। আমি নিশ্চিত বিএনপি-তে আপনার যোগ্য নেতৃত্ব তাঁর আদর্শকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।’’ চলতি মাসে ঢাকার গুলশনে বিএনপি-র দফতরে গিয়ে তারেকের সঙ্গে প্রায় ৪০ মিনিট বৈঠক করেন ভারতীয় রাষ্ট্রদূত প্রণয় বর্মা।