মিশিগানে এক গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্পে আরও অনেক জনের সঙ্গে ছিল ১৪ বছর বয়সি জেন (নাম পরিবর্তিত)। হাসিখুশি ওই মেয়েটির সঙ্গে এসে আলাপ করেন ঘিসলাইন ম্যাক্সওয়েল। আইসক্রিম খেতে খেতে বাড়তে থাকে আলাপচারিতা। তত ক্ষণ পর্যন্ত সব ঠিকঠাক চলছিল। সাধারণ কথাবার্তা চলছিল দু’জনের মধ্যে। তবে পরিস্থিতির বদল ঘটে যখন তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন ৪১ বছর বয়সি জেফ্রি এপস্টিন! আলোচনার মোড় ঘুরে যায় অন্য খাতে।
সম্প্রতি আমেরিকার বিচার দফতর এপস্টিন ফাইলের ৩০ লক্ষ পাতা প্রকাশ্যে এনেছে। তার মধ্যে রয়েছে ২০০০ ভিডিয়ো। ১ লক্ষ ৮০ হাজার ছবি। সেই ফাইলের ছত্রে ছত্রে রয়েছে নানা গল্প। অনেক ভুক্তভোগী, নির্যাতিতার কাহিনি। কী ভাবে তাঁরা প্রতারণার ফাঁদে জড়িয়ে পড়তেন, তার বিস্তারিত বয়ান রয়েছে ওই ফাইলে। তারই এক অংশে জেন নামে ওই নির্যাতিতার কথাও রয়েছে।
‘দ্য টাইমস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেনের সঙ্গে এপস্টিনের আলাপের প্রথম পর্ব ছিল নিতান্তই সাধারণ। কথাবার্তা যত এগোতে থাকে, ততই জেনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠেন এপস্টিন। তার পরই তিনি জানান, তাঁর নামাঙ্কিত একটি স্কলারশিপ রয়েছে। তা অনায়াসেই পেতে পারে জেন। আমেরিকার বিচার দফতরের প্রকাশ করা ফাইলে বলা হয়, মিশিগানের ওই ক্যাম্পে প্রতারণার প্রথম বীজ বপন করে দিয়েছিলেন এপস্টিন।
পরে ফ্লরিডার পাম সমুদ্রসৈকতে গিয়ে জেনের মায়ের সঙ্গে আলাপ করেন এপস্টিন। নিজের ব্যবহারে মুগ্ধ করেন তিনি। তার পরে নিজের প্রাসাদে মা এবং মেয়েকে আমন্ত্রণও করেন। কথাবার্তার বড় অংশ জুড়েই ছিল জেনের প্রশংসা। তার সম্ভাবনার নানা দিক উন্মোচিত করতে থাকেন। নানা ভাবে প্রলুব্ধ করেন। সেই প্রলোভনের ফাঁদে পা দিয়ে ফেলে জেন। বড় অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে তাঁকে প্রথমে এপস্টিনকে ‘মালিশ’-এর কাজে নিয়োগ করা হয়। তবে তখনও ওই নাবালিকা বুঝতে পারেনি, ভবিষ্যতে তার জন্য কী অপেক্ষা করছে। যৌন নির্যাতনের শিকার হয় সে। প্রায় তিন বছর আটক হয়ে ছিল জেন।
আমেরিকার বিচার দফতরের অনুমান হাজারের বেশি মহিলা এপস্টিনের যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। প্রতারণার ফাঁদে ফেলতে নানা পন্থা অবলম্বন করতেন তিনি। সময়, পরিস্থিতি বুঝে পরিকল্পনা ছকতেন এপস্টিন। কখনও থাকত অর্থের প্রলোভন, আবার কখনও স্কলারশিপ বা গ্ল্যামার জগতের আলোয় আকৃষ্ট করতেন মেয়েদের। শুধু আমেরিকা নয়, এপস্টিন তাঁর জাল বিছিয়ে রেখেছিলেন বিশ্বের নানা প্রান্তে। পূর্ব ইউরোপে মহিলাদের বেছে বেছে মডেলিং জগতে প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফাঁদ পারতেন কুখ্যাত যৌন অপরাধী এপস্টিন।
আরও পড়ুন:
টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোন মহিলাদের নিশানা করা হবে, কাদের কাজে লাগানো যেতে পারে, কারা ‘টোপ’ গিলতে পারেন— এই সব বাছাইয়ে কেন্দ্রীয় ভূমিকা ছিল ম্যাক্সওয়েলের। প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী, ম্যাক্সওয়েল বিভিন্ন স্কুলের উপর নজর রাখতেন। কোন নাবালিকার কিসে দুর্বলতা বা তাদের পারিবারিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর নিতেন। সেই দুর্বলতা বা ফাঁক দিয়েই নাবালিকাদের জীবনে ঢুকে পড়তেন তিনি। প্রথম প্রথম সিনেমা দেখানো, ঘুরতে নিয়ে যাওয়া, খাওয়াদাওয়া, কেনাকাটার মধ্যে আকৃষ্ট করতেন। তার পরই ফেলতেন আসল টোপ। সেখানে ঢুকে পড়তেন এপস্টিন।
পাম বিচ, নিউ ইয়র্ক, নিউ মেক্সিকো কিংবা আমেরিকার ভার্জিন দীপপুঞ্জে বিমানে করে নিয়ে যাওয়া হত নাবালিকাদের। কাউকে কাউকে আবার লন্ডন বা প্যারিসেও রাখা হত তাদের। ‘মালিশ’-এর জন্য ৩০০ মার্কিন ডলার দেওয়ার অফার দেওয়া হত। শুধু তা-ই নয়, বলা হত, যদি ওই নাবালিকা তার সঙ্গে অন্য কাউকে নিয়ে যেতে পারে তবে মিলবে আরও ২০০ মার্কিন ডলার। অর্থ এবং সুযোগ ছিল নাবালিকাদের নিয়ন্ত্রণের মূল হাতিয়ার ছিল এপস্টিনের।
২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জনৈকা ভার্জিনিয়া জিওফ্রে এপস্টিনের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তোলার পর দেশ-বিদেশের সংবাদমাধ্যমে শোরগোল পড়ে যায়। ২০০৮ সালে এপস্টিনের বিরুদ্ধে নাবালিকা ধর্ষণ ও নিগ্রহের অভিযোগে মামলা দায়ের হয়েছিল। ২০১৯ সালের অগস্টে গ্রেফতারির মাসখানেকের মাথায় জেলেই আত্মহত্যা করেন তিনি। ২০২২ সালে ম্যাক্সওয়েলকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি জেল খাটছেন।