আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের হামলার পরে হরমুজ় প্রণালী কার্যত অবরুদ্ধ করেছে ইরান। ধাক্কা লেগেছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। এ বার তাদের নজরে হরমুজ় প্রণালীতে সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে যাওয়া কেবল বা তার। ইউরোপ এবং এশিয়া ও পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলির মধ্যে ইন্টারনেট সংযোগ রক্ষা করে এই তারগুলি। অর্থনৈতিক লেনদেনও চলে। এ বার হরমুজ়ের গভীরে বিছিয়ে থাকা এই তারগুলির জন্য প্রযুক্তি সংস্থাগুলির থেকে ভাড়া চায় তেহরান। ইরানের একটি সরকারি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, প্রশাসন পরোক্ষ ভাবে হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, বিশ্বের নামী প্রযুক্তি সংস্থাগুলি ভাড়া না মেটালে বিঘ্নিত করা হতে পারে সারা বিশ্বের ইন্টারনেট পরিষেবা।
পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে প্রবেশের পথ হল হরমুজ়। পশ্চিম এশিয়া, আফ্রিকা থেকে পণ্যবাহী জাহাজ এই হরমুজ় প্রণালী পেরিয়ে পূর্ব দিকে এগিয়ে যায়। তেমনই এই হরমুজ প্রণালীর গভীরে পাতা রয়েছে ইন্টারনেটবাহী তার, যা আমেরিকা, ইউরোপ, পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে পূর্ব এশিয়ার যোগাযোগ রক্ষা করে। সারা পৃথিবীর মধ্যে সংযোগ রক্ষার অন্য মেরুদণ্ড হল হরমুজ়ে পাতা তারগুলি। এ বার সে দিকেই নজর ইরানের। ওই তারগুলির কোনও ক্ষতি হলে গোটা পৃথিবীতে ইন্টারনেট পরিষেবা ধাক্কা খেতে পারে। ব্যাহত হতে পারে ব্যাঙ্কিং পরিষেবা। যদি তারগুলির কোনও রকম ক্ষতি হয় তা হলে বিভিন্ন দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে সংযোগ, রিমোটের মাধ্যমে কাজকর্ম, অনলাইন গেমিং এবং স্ট্রিমিং পরিষেবাও ভেঙে পড়বে। এ বার ইরান সে দিকেই নজর দিয়েছে। ওই তারগুলির জন্য তারা প্রযুক্তি সংস্থাগুলির থেকে শুল্ক আদায় নিয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু করেছে।
গত সপ্তাহে এই নিয়ে বৈঠকেও বসেছিলেন ইরানের আইনপ্রণেতারা। সেখানেই সিদ্ধান্ত হয়, হরমুজ়ে সমুদ্রের তলদেশে বিছিয়ে থাকা তারগুলির জন্য এ বার ভাড়া চাওয়া হবে প্রযুক্তি সংস্থাগুলির থেকে। এক্স অ্যাকাউন্টে ইরানি সেনার মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাঘারি লিখেছেন, ‘‘ইন্টারেনেটের তারেও ভাড়া চাপাব আমরা।’’ ইরানের রেভলিউশনারি গার্ডের সঙ্গে যুক্ত সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, তেহরান যে ইন্টারনেট তারের জন্য শুল্ক আদায়ের পরিকল্পনা করেছে, তা রূপায়িত হলে গুগ্ল, মেটা, মাইক্রোসফ্ট, অ্যামাজ়নের মতো সংস্থাগুলিকে তাদের আইন মেনে চলতে হবে। সাবমেরিন কেবল সংস্থাগুলিকে শুল্ক দিতে হবে। পাশাপাশি সেই তারগুলি রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামতের দায়িত্ব পাবে শুধুই ইরানের সংস্থা।
কয়েকটি প্রযুক্তি সংস্থা হরমুজ়ে ইন্টারনেটবাহী তারগুলি পাততে বিনিয়োগ করেছে। তবে এগুলি ইরানের জলসীমা অতিক্রম করেছে, কি না, তা স্পষ্ট নয়। মেটা, মাইক্রোসফ্টের মতো সংস্থা কতটা ইরানের চাপের কাছে মাথা নত করবে, সেই নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কারণ, আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার কারণে এই মার্কিন সংস্থাগুলি ইরানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনে যেতে পারবে না। ফলে কেউ কেউ মনে করছেন, এই সংস্থাগুলি ইরানের হুঁশিয়ারিকে তেমন গুরুত্ব দেবে না।
তবে ইরান কিন্তু কড়া ভাষাতেই হুঁশিয়ারি দিয়েছে। সে দেশের একটি সংবাদমাধ্যম বলছে, গভীর সমুদ্রে পাতা এই তারগুলির ক্ষতি হলে এক হাজার কোটি মার্কিন ডলার ক্ষতি হতে পারে নামী প্রযুক্তি সংস্থাগুলির। সারা পৃথিবীর ইন্টারনেট পরিষেবা ধাক্কা খেতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চিন সফরের পরে জল্পনা তৈরি হয়েছিল, ইরানের সঙ্গে সংঘর্ষে আরও ঘি পড়তে পারে। তার মধ্যেই ইরান হুঁশিয়ারি দিয়ে দিল যে, এ বার তাদের নিশানা অনেক বৃহৎ। সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ ইকোনমিকসের পশ্চিম এশিয়ার প্রধান দিনা এসফান্দিয়ারির মতে, ইরানের লক্ষ্য বিশ্বের অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দেওয়া। যাতে আর কেউ তাদের আক্রমণ করার কথা না ভাবে।
আরও পড়ুন:
সূত্রের খবর, হরমুজ় দিয়ে অনেক ইন্টারনেটবাহী তার গেলেও সবক’টি ইরানের জলসীমার মধ্যে দিয়ে যায়নি। সতর্ক ভাবেই আন্তর্জাতিক সংস্থা তা এড়িয়ে গিয়েছে। বদলে ওমানের জলসীমার মধ্যে দিয়ে সেই তার বিছিয়েছে তারা। তবে টেলিকম গবেষণা সংস্থার গবেষক আলান মলদিন জানান, ফ্যালকন এবং গাল্ফ ব্রিজ ইন্টারন্যাশনাল (জিবিআই)-এর তারগুলি ইরানের জলসীমার মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। ইরানের প্রশাসনের তরফে সরাসরি সেই তারের ক্ষতি করা নিয়ে কোনও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়নি। তবে প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত সংবাদমাধ্যম বার বার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
ইউরোপ এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, ইরান যদি হরমুজ়ের পরে লোহিত সাগর নিয়েও একই সিদ্ধান্ত নেয়, তা হলে গোটা পৃথিবীর ইন্টারনেট পরিষেবা মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। ২০২৪ সালে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথির জাহাজের নোঙরে ছিঁড়ে গিয়েছিল তিনটি তার। হংকংয়ের এইচজিসি গ্লোবাল কমিউনিকেশনস জানিয়েছে, ওই ঘটনায় ওই অঞ্চলের ইন্টারনেট পরিষেবার ২৫ শতাংশ ব্যাহত হয়ে পড়েছিল।
গভীর সমুদ্রে পাতা তার বিচ্ছিন্ন করে ‘শত্রুপক্ষ’কে বিপাকে ফেলার পদক্ষেপ নতুন নয়। ১৮৫০ সালে প্রথম ইংলিশ চ্যানেলে সমুদ্রের গভীরে পাতা হয়েছিল টেলিগ্রাফ তার। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জার্মানির টেলিগ্রাফ তার কেটে দিয়েছিল ব্রিটেন। এর ফলে বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি জার্মানি। এ বার ইরান সেই পথেই কি এগোচ্ছে! ব্লুমবার্গ ইকোনমিকসের পশ্চিম এশিয়ার প্রধান এসফান্দিয়ারির মতে, এত দিন ইরান জানত, হরমুজ় তাদের হাতে। এ বার তারা ধীরে ধীরে বুঝতে পারছে, ওই নিয়ন্ত্রণ কতটা ক্ষমতাশালী করতে পারে তাদের।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
- ইরানের বাহিনী তীব্র প্রত্যাঘাতের হুঁশিয়ারি দেওয়ার পর সমাজমাধ্যমে নতুন বিবৃতি দিলেন ট্রাম্প। লিখেছেন, ‘‘ওরা নাকি বলেছে প্রত্যাঘাত করবে। সেটা করার সাহস যেন না দেখায়। যদি করে, আমরা এমন আঘাত করব যা আগে কখনও দেখা যায়নি।’’
- আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই নিহত হয়েছেন। রবিবার সকালে তেহরান এই সংবাদ নিশ্চিত করেছে। তেহরানের রাস্তায় কান্নার রোল। মহিলারা খামেনেইয়ের ছবি হাতে রাস্তায় নেমেছেন। ইরান জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট-সহ তিন সদস্যের কাউন্সিলের হাতে আপাতত দেশ চালানোর ভার থাকবে।
- শনিবার সকাল থেকে ইরানের উপর হামলা শুরু করেছিল ইজ়রায়েল। নেতানিয়াহু দাবি করেন, খামেনেই এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজ়েশকিয়ানকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। আমেরিকাও সেই হামলায় ইজ়রায়েলকে সমর্থন করেছে। ইজ়রায়েলি ও মার্কিন বাহিনীর যৌথ হামলায় মুহুর্মুহু ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়েছে তেহরান-সহ ইরানের বড় শহরগুলিতে। ইরান প্রত্যাঘাত করছে। পশ্চিম এশিয়া জুড়ে যুদ্ধের আবহ।
-
সুযোগ পেলেই চোরাগোপ্তা হামলা! সাবেক পারস্যের হাতে মার খাওয়ার প্রতিশোধ নিচ্ছে ‘নিরীহ’ আরব রাষ্ট্র
-
হরমুজ় প্রণালীতে চলল গুলি! ইরান-আমেরিকার মধ্যে বাড়ল উত্তেজনা, সংঘর্ষবিরতিতে কি ইতি? কী বললেন ডোনাল্ড ট্রাম্প
-
আমেরিকার হৃৎস্পন্দন বন্ধের হুঙ্কার, হরমুজ়ে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবহর ধ্বংসে ‘আত্মঘাতী তিমি’দের নামাচ্ছে ইরান!
-
ইরানের বন্দরে একের পর এক জাহাজে আগুন! লেবাননে মুহুর্মুহু হামলা ইজ়রায়েলের, পশ্চিম এশিয়ায় আবার সামরিক উত্তেজনা বাড়ছে
-
‘আমেরিকার সামনে দুই বিকল্প, বলও ওদের কোর্টে’! যুদ্ধ নিয়ে প্রস্তাব ফেরাতেই ট্রাম্পকে বার্তা ইরানের, কোন দিকে ইঙ্গিত