গ্রেগরি পেক থেকে যুবরাজ চার্লস— তাঁর বন্ধুতালিকা ছিল ঈর্ষনীয়। তিনিই একমাত্র সাংবাদিক যাঁকে সবচেয়ে দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি দিয়েছিলেন ইন্দিরা গাঁধী। শুধুমাত্র মেয়েদের জন্য পত্রিকা এনেছিলেন সে যুগে। সে দিক থেকে দেখতে গেলে, ১৯৭০-৮০ সাল নাগাদ ভারতে শুরু হওয়া নারীবাদী আন্দোলনের যুগে পরিবর্তিত সময়ের দলিল হয়ে রয়েছে তাঁর সম্পাদিত পত্রিকাগুলি। ৯২ বছর বয়সে ব্রিটেনের একটি কেয়ার হোমে কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় তারকা মহিলা সম্পাদক গুলশন ইউইং (৯২)।
গত শনিবার লন্ডনের একটি কেয়ারহোমে মৃত্যু হয় গুলশনের। পরিবার তখনও জানত না, কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়েছিলেন গুলশন। ২৪ ঘণ্টা বাদে সেই রিপোর্ট পাওয়া যায়। তাঁর মেয়ে ৫৯ বছরের অঞ্জলি ইউইং মৃত্যুশয্যায় তাঁর পাশে ছিলেন। তিনি জানিয়েছেন, বার্ধক্য ছাড়া কোনও অসুস্থতা ছিলনা মায়ের।ব্রিটেনের কেয়ার হোমগুলির অন্যতম বড় প্রতিনিধি সংস্থা ‘কেয়ার ইংল্যান্ড’ জানিয়েছে, করোনাভাইরাসে ইতিমধ্যেই হোমগুলিতে মৃত্যু হয়েছে ৭৫০০ হাজার মানুষের। কেয়ার হোমে পিপিপ বা বর্মবস্ত্র ও টেটিং কিট না দেওয়ার জন্য বার বার সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে সরকারকে।
১৯৫৫ সালে জন্ম মুম্বইয়ের এক পার্সি পরিবারে। বিয়ে করেছিলেন গাই ইউইংকে। মেয়েদের জনপ্রিয় সাপ্তাহিক ম্যাগাজ়িন ‘ইভ’স উইকলি’ ও সিনে ম্যাগাজ়িন ‘স্টার অ্যান্ড স্টাইল’-এর সম্পাদক ছিলেন ১৯৬৬ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত। তিন দশকের উজ্জ্বল কর্মজীবনে হলিউড, বলিউড-সব সারা বিশ্বের সিনে মহলের কিংবদন্তীরা ছিলেন গুলশনের ঘনিষ্ট। গ্রেগরি পেক, ক্যারি গ্র্যান্টের মতো অভিনেতা থেকে শুরু করে তাবড় রাজনীতিবিদদের শুধু সাক্ষাৎকারই করেননি তিনি। তাঁরা ছিলেন গুলশনের বন্ধুস্থানীয়। তারকা বৃত্তে ওঠাবসা ছিল তাঁরা। ভারতের সবচেয়ে বিখ্যাত দুটি ম্যাগাজ়িনের সম্পাদক ছিলেন ঠিকই। নিজেও ছিলেন তারকা। নোবেলজয়ী ভি এস নয়পল তাঁর বইয়ে গুলশনের বিষয়ে বলেছিলেন, ‘ভারতের জনপ্রিয়তম মহিলা সম্পাদক’। ‘ইভ’স উইকলি’-র সম্পাদক থাকাকালীন বহু তরুণীকে সাংবাদিকতার পাঠ দিয়েছেন তিনি। তাঁর অনুপ্রেরণায় অভিনয় জগতে পা রেখেছেন বলিউডের নামজাদা অনেকে। আসলে বলিউডেও সমান জনপ্রিয় ছিলেন গুলশন। তাঁর মেয়ে জানান, দিলীপকুমার, শাম্মি কপূর, দেব আনন্দ, সুনীল দত্ত, নার্গিস, রাজ কপূরদের মতো তারকাদের সঙ্গে বহু জমকালো সন্ধ্যা কাটিয়েছেন তাঁর মা।
গুলশনের মৃত্যুতে করোনা পরিস্থিতিতে ব্রিটেনের কেয়ারহোমগুলির অবস্থা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। এক সপ্তাহের বেশি করোনার-উপসর্গ দেখা যাওয়ার পরেও গুলশনের পরীক্ষা না হওয়ায় তাঁর মেয়ে অঞ্জলি স্বাস্থ্যমন্ত্রী ম্যাট হ্যানকক ও প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের কাছে টুইট করে তদ্বির করেন দ্রুত পরীক্ষার জন্য। যাতে সেই মতো চিকিৎসা শুরু করা যায়। কিন্তু গত বুধবারের আগে গুলশনের কোভিড পরীক্ষা হয়নি বলে অভিযোগ। অঞ্জলি জানান, মায়ের অন্য শারীরিক সমস্যা ছিল না। তাঁর কথায়, ‘‘দু’সপ্তাহের বেশি আমরা নিশ্চিত ভাবে জানতে পারিনি মা করোনা আক্রান্ত হয়েছেন কি না। রিপোর্ট আসতে আসতে মা চলে গেলেন।’’