জল্পনা দানা বেঁধেছিল গত বছর অক্টোবরেই। এ বার সংবাদমাধ্যম বিবিসি প্রচারিত একটি অডিয়ো টেপ তাকে এ বার অন্য মাত্রা দিল। ফাঁস হওয়া ওই অডিয়ো ক্লিপ আদতে আফগানিস্তানের শাসক তালিবানের সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লা আখুন্দজ়াদা একটি ঘরোয়া বৈঠকের বক্তৃতা বলে প্রকাশিত খবরে দাবি। সেখানে সরাসরি আধিপত্য প্রতিষ্ঠা নিয়ে সংগঠনের অন্দরে তুমুল সংঘাতের কথা কবুল করেছেন তালিবান প্রধান।
ওই বক্তৃতায় আখুন্দজ়াদার আক্ষেপ, ‘‘তালিবান দেশ পরিচালনার জন্য যে ইসলামিক আমিরশাহি প্রতিষ্ঠা করেছিল, সেখানে সরকারের ভেতরের লোকেরাই এ বার একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। এই বিভাজনের ফলে, আমিরশাহি ভেঙে পড়বে এবং শেষ হয়ে যাবে।’’ কিন্তু যুযুধান কোন দুই পক্ষকে তিনি দুষছেন, স্পষ্ট করে তা কিছু বলেননি তালিবান প্রধান। তবে সূত্রের খবর, তালিবানের একটি গোষ্ঠীর নেতৃত্বে রয়েছেন পাক সেনার মদতপুষ্ট তালিবান নেতা তথা আফগানিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিরাজুদ্দিন হক্কানি। অন্য গোষ্ঠীর নেতা, আফগান প্রতিরক্ষামন্ত্রী মহম্মদ ইয়াকুব।
আরও পড়ুন:
ইয়াকুব তালিবানের প্রয়াত প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা মহম্মদ ওমরের পুত্র। ইয়াকুব আফগান তালিবানের অন্দরে ‘পাকিস্তান ঘনিষ্ঠ’ হিসেবে পরিচিত ‘হক্কানি নেটওয়ার্কে’র বিরোধী বলে গণ্য। আফগান প্রধানমন্ত্রী হাসান আখুন্দ, উপ-প্রধানমন্ত্রী মৌলানা বরাদরও রয়েছেন এই গোষ্ঠীতে। আফগান তালিবানের অন্দরে এই গোষ্ঠীই এখন মূল নীতিনির্ধারক। বস্তুত, আফগান তালিবানের অন্দরে ‘সবচেয়ে শক্তিশালী’ নেতা হিসেবে পরিচিতি মধ্য ত্রিশের ইয়াকুব। ২০১৩ সালে মার্কিন বিমানহানায় পিতা ওমরের মৃত্যুর পরে প্রথমে নাকি তাঁকেই সংগঠনের নেতা মনোনীত করা হয়েছিল কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে অভিজ্ঞতা কম থাকায় তিনি নিজেই এই পদ থেকে সরে এসেছিলেন। পরিবর্তে সুপারিশ করেছিলেন পিতৃবন্ধু আখুন্দজ়াদার নাম। তিনি তখন দু’গোষ্ঠীর কাছেই ‘গ্রহণীয়’ ছিলেন।
কিন্তু ‘উদারপন্থী’ হিসাবে পরিচিত ইয়াকুব গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্প্রতি দূরত্ব বেড়েছে আখুন্দজ়াদার। তালিবান প্রধানের অনুগত গোষ্ঠীটি কান্দাহারকেন্দ্রিক। তালিবানের এই অংশ দেশকে একটি কঠোর ইসলামিক রাষ্ট্রের দিকে নিয়ে যেতে চায়। তারা আধুনিক বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে আখুন্দজ়াদার অনুগত ধর্মীয় নেতাদের মাধ্যমে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ করতে আগ্রহী। অন্যদিকে, ইয়াকুব-আখুন্দ-বরাদরের রাজধানী কাবুলভিত্তিক গোষ্ঠী এমন একটি আফগানিস্তানের কথা বলছেন, যা ইসলামের মূলনীতি অনুসরণ করলেও বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, আর্থিক সংস্কার কর্মসূচি চালানো এবং এমনকি মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ দেওয়ার পক্ষপাতী।
আরও পড়ুন:
গত অক্টোবরে তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি) বিদ্রোহীদের দমনের নামে পাক ফৌজ আফগানিস্তানে মাটিতে বিমান হামলা চালালে পাল্টা প্রতিরোধ গড়েছিলেন ইয়াকুবেরা। কিন্তু সে সময় ইসলামাবাদ ঘনিষ্ঠ সিরাজউদ্দিন এক বারও পাকিস্তানের সমালোচনা করেননি। ঘটনাচক্রে, আফগানিস্তানে শরিয়তি বিচারব্যবস্থার প্রধান আব্দুল হাকিম হক্কানি রয়েছেন ওই ‘নেটওয়ার্কে’। হাকিম আবার আখুন্দজ়াদার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। বিগত মার্কিন মদতপুষ্ট সরকারের জমানায় পাক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই-এর মদতে কাবুলের ভারতীয় দূতাবাসে হামলা চালানোর অভিযোগ রয়েছে সিরাজউদ্দিনের নেতৃত্বাধীনকুখ্যাত ‘হক্কানি নেটওয়ার্কে’র বিরুদ্ধে। গত সেপ্টেম্বরে আখুন্দজাদা ইন্টারনেট এবং মোবাইল ফোন পরিষেবা বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল বিশ্ব থেকে আফগানিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করে তোলা। যদিও তিন দিন পর কোনও ব্যাখ্যা ছাড়াই ইন্টারনেট আবার সচল হয়েছিল। বিবিসির দাবি, ইন্টারনেট বন্ধের নেপথ্যে যা ঘটেছিল, তা ঘিরেই সংঘাতের সূত্রপাত ঘটেছে। তালিবানের কাবুল গোষ্ঠী সে সময় আখুন্দজ়াদার নির্দেশ অমান্য করে ইন্টারনেট পুনরায় চালু করে দিয়েছিল।