E-Paper

দুবাইয়ের আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র! এ দৃশ্য দেখব, আগে ভাবিনি

আর তখনই একটা শব্দ। যেন বিস্ফোরণ হল কাছেই। কিন্তু ঠিক মতো ঠাহর করতে পারলাম না। তত ক্ষণে ফোন ভরে গিয়েছে নানা উড়ো খবরে।

রুমি গঙ্গোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০১ মার্চ ২০২৬ ০৯:৫৮
দুবাইয়ের আকাশে ঝলকানি। শনিবার।

দুবাইয়ের আকাশে ঝলকানি। শনিবার। পিটিআই।

দুপুরে কাজ সেরে সবে মোবাইলের মেসেজে একটু চোখ বোলাচ্ছি। দেখি দেশ থেকে দাদা জানতে চাইছেন, সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে ক্ষেপণাস্ত্র হানা চালাচ্ছে ইরান, আমরা ঠিক আছি তো? আকাশ থেকে পড়লাম। কই তেমন কিছু তো দেখিনি সকাল থেকে। কিন্তু তার পরেই আবু ধাবি থেকে এক বন্ধুর ফোন— ‘রিম আইল্যান্ডের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র পড়েছে। আমরাও দেখেছি’। সে কী কাণ্ড! ভয়ে বুক কেঁপে উঠল। কয়েক বছর আগে আমরাও আবু ধাবিতে থাকতাম।

আর তখনই একটা শব্দ। যেন বিস্ফোরণ হল কাছেই। কিন্তু ঠিক মতো ঠাহর করতে পারলাম না। তত ক্ষণে ফোন ভরে গিয়েছে নানা উড়ো খবরে। নানা ধরনের ছবি আসছে, ক্ষেপণাস্ত্র হানার, ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করারও। জানতে পারলাম, আবু ধাবিতে আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি থাকার জন্য সেখানে হামলা চালিয়েছে ইরান। রিম আইল্যান্ডে এক জনের মৃত্যু হয়েছে। এত বছর এ দিকে আছি। এ রকম কখনও শুনিনি। পশ্চিম এশিয়ার অন্যান্য দেশে যাই হোক না কেন, দুবাই-আবু ধাবিকে সব দিক দিয়েই নিরাপদ মনে হত। এত প্রাণচঞ্চল শহর। এক রকম নিশ্চিন্তই ছিলাম, এখানে কখনই কিছু হবে না। কয়েক মাস আগে দোহায় ক্ষেপণাস্ত্র হানার পরে গুজব শোনা গিয়েছিল, আবু ধাবিতেও যে কোনও সময়ে হামলা হতে পারে। গুজব ভেবেই সে সব বিশেষ পাত্তা দিতাম না।

টিভি খুলে দেখলাম, এমিরেটস বহু বিমান বাতিল করেছে। আজ দুপুরেই আমার বন্ধুরা আমাদের কাছে নির্বিঘ্নে এসে পৌঁছেছে। ওরা কিন্তু এ সবের বিন্দুবিসর্গও জানে না। বলল, বিমানবন্দরে সব কিছুই স্বাভাবিক দেখে এসেছে। কিছু ক্ষণ এ সব ভুলে ওদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। বিকেলে সকলে মিলে মেরিনায় ঘুরতে গেলাম। দুবাই মেরিনা আমাদের বাড়ি থেকে গাড়িতে মিনিট দশেক। সপ্তাহান্তে বেড়াতে যাওয়ার জনপ্রিয় ও অন্যতম ব্যস্ত জায়গা। কিন্তু গিয়েই ছন্দপতন হল। আজ শনিবার, তবু সব কেমন ফাঁকা ফাঁকা। থমকে আছে বিশাল নাগরদোলা, দুবাই আই। তবে বাহারি আলো ও নানা রকম লেজ়ার শো চলছে। সেখান থেকেই আলোর ঝলকানি ছড়িয়ে পড়ছে।

আমরা মেরিনা পৌঁছনোর মিনিট দশেকের মধ্যে ফের বড়সড় বিস্ফোরণের আওয়াজ। যে দিক থেকে আওয়াজ এল, সে দিকে তেমন কিছু চোখে পড়ল না। শুধু এক ঝাঁক পাখি উড়ে গেল। বার বার বিস্ফোরণের আওয়াজ যে দিক থেকে এসেছে, সেদিকে চোখ যেতে লাগল। কোনও আরও মিনিট পনেরো পর শুনলাম আবার এক বিস্ফোরণ। মনে হচ্ছে যেন মেঘ ডাকছে। কিন্তু আকাশেমেঘ কোথায়, বরং ঝকঝকে চাঁদ। মিনিট পনেরো পরে এক মহিলার চিৎকার শুনে দেখি, কালো ধোঁওয়া গলগলিয়ে উঠছে আমাদের কোনাকুনি একটা বাড়ি থেকে। কিছু ক্ষণ হতবাক হয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকার পর প্রথম মনে হল, দ্রুত বাড়ি ফেরা দরকার। কিন্তু বাড়ি ফিরেও কি নিরাপদে থাকব? অজানা আশঙ্কায় বুক কেঁপে উঠল।

রাস্তায় যত ক্ষণ ছিলাম, সমানেই দেখছি আকাশ চিরে এ দিক থেকে ও দিক চলে যাচ্ছে আলোর ঝলকানি। কেউ বললেন ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র, কারও আবার মতে, ক্ষেপণাস্ত্র নয়, বরং ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার পাল্টা অস্ত্র, আবার কারও মতে, পড়শি দেশের আকাশে টক্কর চলছে, তারই অভিঘাতে দুবাইয়ের আকাশেও এসে পড়ছে অস্ত্রশস্ত্রের টুকরে। তত ক্ষণে জেনে গিয়েছি, দুবাইয়ের বিখ্যাত পাম জুমেরার একটা অংশ দাউদাউ করে জ্বলছে। শুনলাম খালি করে দেওয়া হয়েছে পৃথিবীর সব থেকে উঁচু বাড়ি— বুর্জ খলিফা।

এখানে এখনও সরকারে তরফ থেকে কোনও সতর্কবার্তা জারি করা হয়নি। কিন্তু সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। অনেকেই শপিং মলে গিয়ে প্রচুর জিনিসপত্র কিনে এনেছেন, যাতে যুদ্ধ-পরিস্থিতি তৈরি হলে খাবারের অভাব না হয়। শুনলাম, কিছু কিছু দোকানে ইতিমধ্যেই জিনিসপত্রে টান পড়েছে।

পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে কিছু বুঝতে পারছি না। আপাতত অতি প্রয়োজনীয় জিনিস একটা ব্যাগে গুছিয়ে নিয়েছি। হঠাৎ যদি বাড়ি ছেড়ে বাঙ্কারে আশ্রয় নিতে হয়!

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Dubai Missile

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy