আবুল-বরকতদের দেশে কি অতঃপর ভাষা শহীদ (বানান অপরিবর্তিত) দিবসের সরকারি ছুটি বাতিল? ২০২৬ সালের জন্য বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের ছুটির বিজ্ঞপ্তি ঘিরে তেমনই বিতর্ক দেখা দিয়েছে।
প্রথামাফিক ২০২৫ সালের শেষে নতুন বছরের ছুটির তালিকা প্রকাশ করেছে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। সরকারি ছুটির সেই তালিকায় কোথাও ভাষা শহীদ দিবসের উল্লেখ নেই। তা নিয়ে ইতিমধ্যেই বিতর্ক শুরু হয়েছে। অনেকের বক্তব্য, ইউনূসের সরকার ভাষা আন্দোলনের বিষয়টিই বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে মুছে ফেলতে চাইছে। আবার অন্য অনেকের বক্তব্য, এ বছর ২১ ফেব্রুয়ারি শনিবার পড়েছে। শুক্র এবং শনিবার বাংলাদেশে এমনিতেই সাপ্তাহিক ছুটির দিন। ফলে আর আলাদা করে ভাষা শহীদ দিবসের কথা উল্লেখ করা হয়নি। কিন্তু তারও পাল্টা বক্তব্য রয়েছে। যা বলছেন, সাপ্তাহিক ছুটির দিন হলেও আলাদা করে ভাষা শহীদ দিবসের উল্লেখ থাকা উচিত ছিল। সেটিই দস্তুর। অতীতে সাপ্তাহিক ছুটির দিনের সঙ্গে অন্য সরকারি ছুটির ‘সংঘাত’ হলে সংশ্লিষ্ট দিনটিতে সরকারি ছুটির ঘোষণা করা হত। কারণ, দিনটির ‘তাৎপর্য এবং গুরুত্ব’ সম্পর্কেও সকলকে অবহিত করা।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান (অধুনা স্বাধীন বাংলাদেশ)-এর ছাত্রেরা বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। আন্দোলন দমন করতে গুলি চালায় পাকিস্তানের পুলিশ। পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হয় বরকত, সালাম, রফিক, জব্বরদের। ইতিহাসবেত্তাদের মতে, ওই ভাষা আন্দোলনের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের বীজ। তার পর থেকেই স্বাধীন বাংলাদেশে ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে ‘শহীদ দিবস’ হিসাবে পালন করা হয়। শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশের এই ভাষা আন্দোলনকে সম্মান জানিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে ইউনেস্কো ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসাবে স্বীকৃতি দেয়।
প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি পড়েছিল শুক্রবার। যা বাংলাদেশে সাপ্তাহিক সরকারি ছুটির দিন। কিন্তু সরকারি ছুটির বিজ্ঞপ্তিতে ওই দিনটিকে ভাষা শহীদ দিবসের ছুটি বলেই উল্লেখ করা হয়েছিল। যা এ বছরে করা হয়নি। বিতর্ক তা নিয়েই।
প্রসঙ্গত, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা। নির্ঘণ্ট মেনে নির্বাচন এবং ফলপ্রকাশ হলে ২১ ফেব্রুয়ারির আগেই বাংলাদেশ তো বটেই, গোটা বিশ্ব জেনে যাবে কারা বাংলাদেশের নতুন শাসক হবে। তার আগে ২১ ফেব্রুয়ারির ‘ছুটি বাতিল’ হওয়ার বিতর্কের জল কোথায় গড়ায় সে দিকে নজর রয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিক ভাবে এই বিষয়ে ইউনূস সরকারের তরফে কিছু জানানো হয়নি।
বাংলাদেশের সরকারি ছুটির দিনের তথ্য বলছে, সদ্যপ্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার স্বামী জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন সেখানে শুধুমাত্র রবিবার ছিল সাপ্তাহিক ছুটি। অনেক প্রবীণ অবশ্য জানাচ্ছেন, জিয়াউরের আমলে একটি নির্দিষ্ট সময়ে শনি এবং রবিবার দু’দিন সরকারি ছুটি থাকত। জিয়াউরের পরে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রপতি হয়ে সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার বলে ঘোষণা করেন। আবার শেখ হাসিনার আমলে শুক্র এবং শনিবারকে সাপ্তাহিক ছুটির দিন বলে ঘোষণা করা হয়। হাসিনা সরকারের পতনের পরেও সেই নিয়মই বজায় আছে। কিন্তু ইউনূস সরকারের আমলে এই প্রথম ২১ ফেব্রুয়ারির উল্লেখ সরকারি ছুটির দিনের তালিকায় রইল না।
বাংলাদেশের প্রশাসনিক মহলের একাংশের বক্তব্য, সরকারি ছুটির দিন স্থির করা এমন একটি সিদ্ধান্ত, যা মন্ত্রিসভার বৈঠকে নেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে যা নেওয়া হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টামণ্ডলীর বৈঠকে। ওই বৈঠকের পরে সংবাদমাধ্যমে বৈঠকের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানানো হয় সরকারের তরফে। কিন্তু ২১ ফেব্রুয়ারি যে সরকারি ছুটির দিনের মধ্যে পরিগণিত হবে না, তা এমন কোনও সাংবাদিক সম্মেলনে বলা হয়নি।