E-Paper

মাথাব্যথা বাড়াচ্ছে ডলার, আশঙ্কা বাড়ছে খুচরো দাম ও দেশের আর্থিক বৃদ্ধি নিয়েও

কেন্দ্রের তরফেও দেশে ডলার প্রবাহ বাড়াতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিদেশি লগ্নিকারীদের সরকারি ঋণপত্রে করা লগ্নিকে পুরোপুরি করমুক্ত করে দিয়েছে তারা।

অমিতাভ গুহ সরকার

শেষ আপডেট: ০৮ জুন ২০২৬ ০৭:২৮

— প্রতীকী চিত্র।

খুচরো মূল্যবৃদ্ধির হার গুটি-গুটি পায়ে বাড়তে থাকলেও এই দফায় রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক সুদ বাড়াল না। অর্থাৎ রেপো রেটকে (যে হারে তারা অন্য ব্যাঙ্ককে ধার দেয়) অপরিবর্তিত রাখল ৫.২৫ শতাংশে। আসলে জুনের বৈঠকে শীর্ষ ব্যাঙ্কের ঋণনীতি কমিটির মূল লক্ষ্য ছিল লাগামছাড়া ডলারকে বাগে আনা, যাতে টাকার পতন রোখা যায়। তাই দেশে আরও বেশি ডলার আনার ব্যবস্থা করতে তারা যে সিদ্ধান্তগুলি নিয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম— বিদেশি লগ্নিকারীদের বাজারে নতুন ছাড়া ১৫, ৩০ এবং ৪০ বছর মেয়াদি সরকারি ঋণপত্র কেনার অনুমতি দেওয়া এবং বিদেশে রফতানি বাবদ পাওনা অর্থ (ডলার) ১৫ মাসের জায়গায় এ বার থেকে ৯ মাসের মধ্যে দেশে আনার বাধ্যবাধকতা। পাশাপাশি, অনাবাসী ভারতীয়দের জন্যে বাড়ানো হয়েছে নথিবদ্ধ শেয়ারে লগ্নির ঊর্ধ্বসীমাও। এত দিন একটি সংস্থার ৫% পর্যন্ত শেয়ার কিনতে পারতেন তাঁরা। এখন থেকে ১০% কিনতে পারবেন।

কেন্দ্রের তরফেও দেশে ডলার প্রবাহ বাড়াতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিদেশি লগ্নিকারীদের সরকারি ঋণপত্রে করা লগ্নিকে পুরোপুরি করমুক্ত করে দিয়েছে তারা। অর্থাৎ তুলে দেওয়া হয়েছে তাদের বন্ডে লগ্নির উপর দীর্ঘকালীন মূলধনী লাভ কর (১২.৫%)। সুদের উপরেও কর কাটা হবে না। আশা, এতে ভারতীয় ঋণপত্রের বাজারে বিদেশি লগ্নি অনেকটা বাড়বে। বাড়বে ডলার আমদানিও।

এ বার সুদ ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়তে পারে বলে অনুমান করেছিলেন একাংশ। সেটা না হওয়ায় শিল্প খুশি। স্বস্তিতে ঋণগ্রহীতারাও। কারণ, বাড়ি-গাড়ি সমেত কোনও ঋণেই কিস্তির খরচ বাড়বে না। তবে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক দামের উপর নজর রাখবে। পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে খোলা রেখেছে ভবিষ্যতে সুদ কমানো বা বাড়ানোর পথ। তাদের অনুমান, চলতি অর্থবর্ষে মূল্যবৃদ্ধি ৫.১ শতাংশে পৌঁছতে পারে।

সরকারি পরিসখ্যান বলছে, গত অর্থবর্ষে অর্থনীতির উন্নতি প্রত্যাশা ছাপিয়েছে। ভারতের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপি বৃদ্ধির হার পৌঁছেছে ৭.৭ শতাংশে। শেষ তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) ছিল ৭.৮%। যদিও এতে তেমন আনন্দিত হওয়ার কারণ নেই। রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের অনুমান ২০২৬-২৭ সালে তা নামতে পারে ৬.৬ শতাংশে। যার মানে, দাম ও দেশেরঅগ্রগতি, দু’দিকেই উদ্বেগ বহাল।

গত শুক্রবার শীর্ষ ব্যাঙ্ক এবং সরকারের তরফে একগুচ্ছ ঘোষণার পরে টাকা কিছুটা চাঙ্গা হয়। ডলারের দাম কমে হয় ৯৪.৯৫ টাকা। বাজার অবশ্য নির্বিকার ছিল। উল্টে সেনসেক্স ১১৭ পয়েন্ট পড়ে থেমেছে ৭৪,২৪৩ অঙ্কে। ৫০ কমে নিফ্‌টি হয় ২৩,৩৬৭।

যুদ্ধজনিত নানা সমস্যা সত্ত্বেও এশিয়ার কয়েকটি দেশের শেয়ার বাজার ভাল রকম চাঙ্গা। ঝিমিয়ে বরং ভারতের বাজার। সর্বকালীন উচ্চতা থেকে সেনসেক্স ১১,৫০০ পয়েন্ট পিছিয়ে। কারণ হিসেবে উঠে আসছে একাধিক বিষয়— জ্বালানির চড়া দাম, আমদানি করা তেল-গ্যাসের উপর অত্যধিক নির্ভরতা, ডলারের নিরিখে টাকার দুর্বলতা, প্রযুক্তি বিশেষত কৃত্রিম মেধা (এআই), সেমিকনডাক্টরের মতো প্রযুক্তিতে দেশের পিছিয়ে থাকা, নাগাড়ে বিদেশি লগ্নির প্রস্থান ইত্যাদি। যে কারণে বাজারে মোট শেয়ার মূল্যের নিরিখে ভারত সাত নম্বরে নেমে গিয়েছে। জায়গা ছেড়ে দিতে হয়েছে তাইওয়ান এবং দক্ষিণ কোরিয়াকে।

অর্থনীতির বিভিন্ন দিক থেকে যা খবর আসছে, তা কিন্তু মন্দ নয়। মে মাসে জিএসটি সংগ্রহ ৩.২% বেড়ে পৌঁছেছে ১.৯৪ লক্ষ কোটি টাকায়। গত মাসে গাড়ি বিক্রি বেড়েছে। মাথা তুলেছে কারখানায় উৎপাদন। এ ক্ষেত্রের পিএমআই সূচক ৫৪.৭ থেকে বেড়ে হয়েছে ৫৫। পিএমআই পরিষেবা সূচক ছ’মাসের সর্বোচ্চ হয়ে পৌঁছেছে ৫৯.৮-এ। এই দুই সূচকের পঞ্চাশের বেশি থাকার অর্থ বৃদ্ধি। তবে এত সব ভাল প্রতিফলন বাজারে পড়ছে না। এর মূল কারণ ডলারের দাম বৃদ্ধি এবং বিদেশি লগ্নির দেশত্যাগ।

গত সপ্তাহে রাজেশ এক্সপোর্টস নামে এক নথিবদ্ধ সংস্থায় বড় মাপের আর্থিক কারচুপির অভিযোগ তুলেছে বাজার নিয়ন্ত্রক সেবি। এমন ঘটনা আগামী দিনে ভারতীয় বাজারের প্রতি বিদেশি লগ্নিকারীদের আস্থা আরও কমিয়ে দিতে পারে।

আপাতদৃষ্টিতে ভাল দেখালেও দেশের অর্থনীতির অন্দরে কিন্তু সমস্যা দানা বাঁধছে। বিদেশ থেকে নিট প্রত্যক্ষ লগ্নিও শুকিয়ে যাচ্ছে। মোদী সরকারের অন্যতম মাথাব্যথা শিল্পে বেসরকারি লগ্নির খরা। বিদেশ প্রত্যক্ষ লগ্নিও শুকিয়ে গিয়েছে। উল্টে বহু ভারতীয় সংস্থা বিদেশের মাটিতে পুঁজি ঢালছে বা লগ্নির আগ্রহ দেখাচ্ছে। যেমন, কলকাতার সংস্থা টেগা ইন্ডাস্ট্রিজ় সম্প্রতি খননে ব্যবহার্য যন্ত্র তৈরির আমেরিকান সংস্থা মলিক্যাপ-কে কিনেছে। গৌতম আদানি ও মুকেশ অম্বানীর গোষ্ঠী আমেরিকায় যথাক্রমে ১০০০ কোটি এবং ৩০,০০০ কোটি ডলার লগ্নির ঘোষণা করেছে। আবার তথ্যপ্রযুক্তি, টেলিকম, ওষুধ ক্ষেত্রেও ভারত থেকে বিদেশে যাচ্ছে পুঁজি। দেশের শেয়ার বাজারকে চাঙ্গা করতে এক দিকে যেমন বিদেশি লগ্নি ফেরাতে হবে, অন্য দিকে তেমনই দেশে সরকারি-বেসরকারি লগ্নি বাড়াতে হবে। বাজারের পতনে আশঙ্কা মাথায় নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন শেয়ার ও ফান্ডের ছোট-বড় অসংখ্য লগ্নিকারী।

(মতামত ব্যক্তিগত)

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

US Dollars Indian Econo Inflation market price

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy