মূল্যবৃদ্ধি কমায় আশা ছিল। সেই প্রত্যাশা পূরণ করেই গত বৃহস্পতিবার ঋণনীতিতে সুদের হার কমাল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (আরবিআই)। জানাল, রেপো রেট (যে সুদে শীর্ষ ব্যাঙ্ক বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলিকে ঋণ দেয়) কমছে ২৫ বেসিস পয়েন্ট। নতুন হার ৬.২৫%। আর এর জেরে ফের বাড়ি-গাড়ি ঋণে সুদ কমবে বলেই ধারণা। ইতিমধ্যেই যে পথে হেঁটেছে স্টেট ব্যাঙ্ক-সহ কিছু ব্যাঙ্ক। তবে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাঙ্কে সুদের হার কতটা কমবে, তা জানার জন্য কিছু দিন অপেক্ষা করতে হবে।

ব্যাঙ্কিং মহলের অনেকের ধারণা, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক যে হারে সুদ কমিয়েছে, বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলি তার পুরো সুবিধা ঋণদাতাদের কাছে পৌঁছতে পারবে না। স্টেট ব্যাঙ্কও ৩০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত গৃহঋণে সুদের হার (এমসিএলআর) কমিয়েছে ৫ বেসিস পয়েন্ট। একই হারে ছ’মাস মেয়াদের ঋণে সুদ কমেছে ব্যাঙ্ক অব মহারাষ্ট্রেও। অন্যান্য ব্যাঙ্কগুলিও সুদ নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়, তা জানা যাবে এই সপ্তাহে। যাঁদের মাসিক কিস্তি দিতে হয়, তাঁরা আপাতত সেই দিকেই তাকিয়ে।

আরবিআইয়ের সিদ্ধান্তে অবশ্য বিশেষভাবে উপকৃত হবে গাড়ি ও আবাসন শিল্প। গত প্রায় এক-দেড় বছরে বেশ ঝিমিয়ে পড়েছিল এই দুই শিল্প। সুদের হার কমার হাত ধরে ক্রেতা চাহিদা বাড়লে, তা ফের চাঙ্গা হওয়ার সম্ভাবনা। এ বারের বাজেটে ইতিমধ্যেই আবাসন শিল্পকে বেশ কিছু সুবিধা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন ভারপ্রাপ্ত অর্থমন্ত্রী পীযূষ গয়াল। তার পরে গভর্নর শক্তিকান্ত দাসের প্রথম ঋণনীতিতে সুদ কমা তাদের পক্ষে সদর্থক বলেই মত অনেকের।

শুধু আবাসনই নয়। ১৮ মাস পরে সুদ কমা সামগ্রিক ভাবে শিল্পের জন্যই ভাল খবর। ব্যাঙ্কগুলি সুদ কমালে শিল্প ঋণের চাহিদা বাড়বে। আরও বেশি প্রকল্পে টাকা ঢালতে উৎসাহী হবে তারা। আবার সুদ কমলে বাজারে দাম বাড়ে বন্ডের। ফলে কমে তার ইল্ড (প্রকৃত আয়)। এতে উপকার হবে ফান্ডের লগ্নিকারীদের।

যদিও শীর্ষ ব্যাঙ্কের সিদ্ধান্ত সুদ নির্ভর মানুষের কাছে একেবারেই সুখের নয়। কারণ, ঋণে সুদ কমলে সাধারণত তা কমে আমানতেও। ফলে যাঁরা সুদের ভরসায় সংসার চালান, তাঁরা সমস্যার মুখে পড়বেন। তার উপরে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে থাকলে আগামী দিনে সুদ আরও কমানো হবে বলে জানিয়েছেন দাস। এতে ফের কমতে পারে জমায় সুদও। ফলে হাতে টাকা থাকলে এই সময়েই সুদ নির্ভর প্রকল্পে দীর্ঘ মেয়াদে লগ্নি করে রাখতে পারলে ভাল। তাতে কিছুটা হলেও বেশি টাকা ঘরে আসার সম্ভাবনা।

এমনিতে সুদ কমানো হলে শেয়ার বাজার বাড়ে। কিন্তু মার্কিন-চিন শুল্ক যুদ্ধ বন্ধ করা নিয়ে চুক্তি সই ঘিরে অনিশ্চয়তা-সহ নানা খবরে এ বার তা হয়নি। উল্টে বৃহস্পতিবার সামান্য নামার পরে শুক্রবার বেশ ভাল রকম (৪২৪ পয়েন্ট) পড়েছে সেনসেক্স। বাদ যায়নি নিফ্‌টিও। তবে সূচক এখন ৩৬ হাজারের ঘরে থাকলেও, অবস্থা বেশ খারাপ বেশিরভাগ মিড ও স্মল ক্যাপ শেয়ারের। যে কারণে গত দু’বছরে মুনাফার মুখ দেখতে পায়নি তারা।

অন্তর্বর্তী বাজেট এবং ঋণনীতি পেরিয়ে আমরা এখন ত্রৈমাসিক ফল প্রকাশের শেষ ল্যাপে। আর এই সপ্তাহটাই ফল প্রকাশের জন্য পাবে সংস্থাগুলি। গত সপ্তাহেও সামনে এসেছে বেশ কিছু সংস্থার ফল। ৭৯% বেড়ে গ্রাফাইড ইন্ডিয়ার নিট মুনাফা পৌঁছেছে ৬০৯ কোটি টাকায়। ভোডাফোন আইডিয়ার লোকসান দাঁড়িয়েছে ৫,০০৬ কোটি। অর্থবর্ষের তৃতীয় ত্রৈমাসিকে আইডিএফসি ফার্স্ট ব্যাঙ্কের নিট লোকসান হয়েছে ১,৫৩৮ কোটি। বিড়লা কর্পের লাভ বেড়ে হয়েছে ২৭ কোটি টাকা। টাটা গোষ্ঠীর টাটা ইস্পাত সংস্থা স্টিলের মুনাফা ৫৪% বেড়ে ১,৭৫৩ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। কিন্তু তখন টাটা মোটরস জানিয়েছে বিশাল লোকসানের (২৬,৯৬১ কোটি টাকা) কথা।

গত সপ্তাহে ফল প্রকাশ করেছে কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কও। নীরব মোদী কাণ্ড সামলে উঠে পঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক আবার মুনাফায় ফিরেছে। যার অঙ্ক ২৪৬ কোটি টাকা। এনপিএ বাড়লেও লোকসান কমেছে এলাহাবাদ ব্যাঙ্কের। এ ছাড়া ইউকো ব্যাঙ্কের লোকসান কিছুটা কমলেও, তা অনেকটা বেড়েছে ইউনাইটেড ব্যাঙ্কের। এর আগে মুনাফায় ফেরার খবর জানিয়েছিল স্টেট ব্যাঙ্ক। অর্থাৎ, সব মিলিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির ফল মিশ্র।

(মতামত ব্যক্তিগত)