E-Paper

যুদ্ধে সন্ত্রস্ত শেয়ার বাজার, পড়তি সূচক দিচ্ছে বিনিয়োগের ভাল সুযোগ

বিশ্বের নানা অঞ্চলে অশান্তি চললেও, এখনও পর্যন্ত দেশের অর্থনীতি কিন্তু বেশ ভাল জায়গাতেই দাঁড়িয়ে। ফেব্রুয়ারিতে জিএসটি সংগ্রহ ৮.১% বেড়ে পৌঁছছে ১.৮৩ লক্ষ কোটি টাকায়। চার চাকার গাড়ি বিক্রি বেড়েছে ২৬%। দু’চাকার ২৫% এবং তিন চাকার ২৪%।

অমিতাভ গুহ সরকার

শেষ আপডেট: ০৯ মার্চ ২০২৬ ০৭:২৪

—প্রতীকী চিত্র।

একটা বড় যুদ্ধ যে লাগতে চলেছে তার আঁচ কিছুদিন আগে থেকেই পাওয়া যাচ্ছিল। বিভিন্ন দেশের উপর চড়া শুল্ক চাপানোর পাশাপাশি ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ইরান অভিমুখে যুদ্ধ জাহাজ পাঠাতে শুরু করেছিল। মাঝে মধ্যে আক্রমণের হুমকিও দিচ্ছিলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। এই ব্যাপারে সক্রিয় ভাবে হাত মিলিয়েছে ইজ়রায়েল। এই পরিস্থিতিতে আগে থেকেই সতর্ক হয়ে গিয়েছিলেন অনেক লগ্নিকারী। তাঁরা নতুন করে লগ্নি করার আগে দেখতে চাইছিলেন জল কোন দিকে গড়ায়। অবশেষে যুদ্ধ লেগেই গেল। ভারত তা থেকে অনেক দূরে থাকলেও যুদ্ধের প্রতিকূল হাওয়া আমাদের তটেও আছড়ে পড়ছে। বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেল ব্রেন্ট ক্রুডের ব্যারেল পিছু দাম এরই মধ্যে ৯৩ ডলারে পৌঁছেছে। মাত্র কিছুদিন আগেও যা ৬৭ ডলারের আশপাশে ছিল। ভারতে গত শুক্রবার বাড়ানো হয়েছে রান্নার গ্যাসের দাম। ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করায় দেশে তেল এবং গ্যাস সরাবরাহ প্রায় বন্ধ। পাশাপাশি, বাড়ছে টাকায় ডলারের দাম। অর্থাৎ তেল এবং গ্যাস কেনার খরচ এরই মধ্যে অনেকটা বেড়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সমস্যা অনেক গুরুতর আকার নিতে পারে।

বিশ্বের নানা অঞ্চলে অশান্তি চললেও, এখনও পর্যন্ত দেশের অর্থনীতি কিন্তু বেশ ভাল জায়গাতেই দাঁড়িয়ে। ফেব্রুয়ারিতে জিএসটি সংগ্রহ ৮.১% বেড়ে পৌঁছছে ১.৮৩ লক্ষ কোটি টাকায়। চার চাকার গাড়ি বিক্রি বেড়েছে ২৬%। দু’চাকার ২৫% এবং তিন চাকার ২৪%। এ সব তথ্য যত আকর্ষণীয়ই হোক না কেন, তাতে বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজার মোটেও উল্লসিত হবে না। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের জেরে শুক্রবার সেনসেক্স খুইয়েছে ১০৯৭ পয়েন্ট (১.৩৭%)। সূচকটি নেমে এসেছে ৭৮,৯১৯ অঙ্কে। শুধু তেল এবং গ্যাস নিয়েই নয়, যুদ্ধ চললে চিন্তা আছে আরও বেশি কিছু বিষয় নিয়ে। মূল যুদ্ধ ইরান-আমেরিকা-ইজ়রায়েলের মধ্যে হলেও প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ভাবে তাতে জড়িয়ে পড়েছে ডজন খানেক দেশ। ফলে সেই সব দেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য এক রকম বন্ধ। চা, চাল, চর্মপণ্য, গাড়ি, ভারী যন্ত্র এবং যন্ত্রাংশ, অলঙ্কার-সহ নানা ধরনের বহু মূল্যের জিনিসপত্র এ দেশ থেকে পশ্চিম এশিয়ায় রফতানি করা হয়। সেই সমস্ত রফতানি মার খেলে বেশ সমস্যায় পড়বে সংশ্লিষ্ট শিল্প। পাশাপাশি, যুদ্ধের জেরে মার খাচ্ছে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানিও। জ্বালানি ছাড়াও প্রভাব পড়তে পারে সার, পেট্রোপণ্যে। আবার তেল এবং গ্যাসের দাম বাড়লে দেশের বাজারে মাথা তুলবে মূল্যবৃদ্ধির হার। ফলে উধাও হবে সুদ কমার সম্ভাবনা।

আগামী কিছু দিন বাজার কী রকম ব্যবহার করবে, তা নির্ভর করবে যুদ্ধের গতি প্রকৃতির উপর। অর্থাৎ সূচক আর কতটা পড়তে পারে, সেটা এখনই বলা যাচ্ছে না। সেনসেক্স আরও ৫% মত পড়লে বাছাই করে শেয়ার কেনা শুরু করা যেতে পারে। যে সব ভাল শেয়ার যুদ্ধজনিত ক্ষতির কারণে নয়, বরং বাজার নামার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নামছে, তাদের উপরে লক্ষ রাখতে হবে। সূচকের বড় পতনে সে সমস্ত শেয়ার একটু একটু করে তুলে রাখা যায়। যাঁদের পোর্টাফোলিয়োর আকার বড়, অর্থাৎ অনেক শেয়ার রয়েছে এবং বেশি টাকা এতে ঢালা রয়েছে, আশু প্রয়োজন না থাকলে তাঁদের যুদ্ধ থামার জন্যে অপেক্ষা করাই ভাল। আবার কেউ যদি অতীতে কোনও শেয়ার অত্যাধিক বেশি দামে কিনে থাকেন, তা হলে তলিয়ে যাওয়া দামে তা আরও কিছু পরিমাণ কিনে গড় দামকে নামিয়ে আনার পথেও হাঁটতে পারেন।

গত সাড়ে তিন দশকে বিভিন্ন কারণে বাজার বেশ কয়েকবার বড় আকারের পতন দেখেছে। তবে প্রতিবারই সঙ্কট কাটার পর সূচক ফের উঠেছে এবং নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। বাজারের চরম দুঃসময়ে যাঁরা সাহস করে বাছাই করা শেয়ার তুলেছেন, পরে তাঁরা সাফল্যের শিখরে উঠেছেন। ঝুঁকির বাজারে লগ্নিতে অনেক সময়ে ভাল ফল পাওয়া যায়। সূচক কবে তলানিতে ঠেকবে, তা বোঝা এক রকম অসম্ভব। তাই ভাল শেয়ার তুলতে হবে প্রতিটি বড় পতনে। ঝুঁকি যাঁদের পছন্দ, তাঁরা এই পতনকে সুযোগ হিসেবে দেখতে পারেন। যাঁদের তা ধাতে সয় না, তাঁদের লগ্নির ঠিকানা হবে ব্যাঙ্ক এবং ডাকঘর। নামমাত্র ঝুঁকিতে ছোট মেয়াদে টাকা রাখা যায় লিকুইড ফান্ড অথবা শর্ট টার্ম ফান্ডে। গত কয়েক মাসের মধ্যে যাঁরা শেয়ার ভিত্তিক ফান্ডে লগ্নি করেছেন, তাঁদের অনেকে এখন লোকসান দেখতে পাবেন ঠিকই। তবে এতে আতঙ্কিত না হয়ে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে। অনেক কিছু নির্ভর করবে ট্রাম্পের মর্জি এবং ভারতের কূটনৈতিক
পারদর্শিতার উপরে।

মনে রাখবেন যুদ্ধ এক দিন থামবে এবং তার পরই শুরু হবে পর্যায়ক্রমে সূচকের উত্থান। কিন্তু সেই সময়ে পোর্টফোলিয়ো কতটা মাথা তুলবে, সেটা নির্ভর করবে এখন কতটা পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে তার উপরেই।

(মতামত ব্যক্তিগত)

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Share Market investments Economy

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy