চার দিকে একটা অস্থির ভাব। যেন স্বস্তিতে নেই কেউ। এই আমানতে সুদ কমছে, তো অন্য দিকে ধাক্কা দিচ্ছে শেয়ার বাজার। ঋণপত্র নির্ভর ফান্ডের রিটার্নেও শামুক গতি। সব মিলিয়ে প্রায় দিশেহারা লগ্নিকারীরা।

এত দিন তা-ও একটা আশা ছিল যে, অর্থনীতির চাকায় গতি ফিরলে, পরিস্থিতি দ্রুত শোধরাবে। কিন্তু দেশ এবং বিশ্ব অর্থনীতির পরিস্থিতি যে ভাবে ক্রমশ ঘোরালো হচ্ছে, তাতে সেই আশাও ক্ষীণ হচ্ছে ক্রমশ।

দেশের বাজারে চাহিদা তলানিতে। গাড়ি শিল্পে বিপুল ছাঁটাইয়ের চোখরাঙানি। উৎসবের মরসুমের মুখে দাঁড়িয়েও মুখ ব্যাজার ভোগ্যপণ্য শিল্পের। তার উপরে ‘বিষফোঁড়া’ চিন-মার্কিন শুল্ক-যুদ্ধ। সাধারণ মানুষ যান কোথায়? এত কষ্টে চারটি টাকা সঞ্চয়। শেয়ার বাজারে রাখলে, ধুয়ে যাওয়ার ভয়। উল্টো দিকে কম সুদের বাজারে গিলে খেতে হাঁ করে আছে মূল্যবৃদ্ধি।

মানছি, পরিস্থিতি দুশ্চিন্তার। কিন্তু না ঘাবড়ে বরং কোমর বাঁধুন। কী ভাবে? তা নিয়ে দু’-চার কথা না হয় আজ ছুটির দিনেই সেরে রাখি।

 

ঝুঁকির দাড়িপাল্লা

এই রকম টালমাটাল সময়ে এই দাঁড়িপাল্লায় ভারসাম্য কিন্তু একান্ত জরুরি। তাই আমার পরামর্শ—

• পুরো টাকা শেয়ার বা ফান্ডে না রেখে কিছুটা রাখুন নিরাপদ জায়গায়। তা সে মেয়াদি আমানত, ডেট ফান্ড হোক বা সোনা।

• সুদ যেহেতু কমতির দিকে, তাই পুরো টাকা সেখানে রেখেও লাভ নেই। কিছুটা ঝুঁকি নিয়েও ইকুইটি ফান্ডের মতো জায়গায় সঞ্চয়ের একটা অংশ রাখা জরুরি। নইলে মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে জুঝবেন কী ভাবে?

• এখনকার পরিস্থিতিতে ঝুঁকি একটু কম নেওয়াই ভাল। যেমন, একেবারে অচেনা ছোট সংস্থার শেয়ারে টাকা ঢালা এখন সুবিধার না-ও হতে পারে।

• যদি আপনার বয়স কম হয় বা সঞ্চয়ের কোনও দীর্ঘ মেয়াদি লক্ষ্য থাকে (হয়তো ১২-১৮ বছর পরে সন্তানের উচ্চশিক্ষার কথা ভেবে এসআইপি করছেন), তাহলে পড়তি বাজারেও লগ্নি চালিয়ে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। কিন্তু যদি এমন হয় যে, আর এক-দু’বছর পরেই অবসর কিংবা এত দিন ধরে যে টাকা জমিয়েছেন, তা কাজে লাগবে আর ছ’মাস-এক বছরের মধ্যেই, তাহলে কিন্তু ওই টাকা কোনও নিরাপদ জায়গায় (লিকুইড ফান্ড, সুদ নির্ভর প্রকল্প) সরিয়ে আনা ভাল। কারণ, এখন তা কমে গেলে, ফের ঘুরে দাঁড়ানোর সময় আপনার হাতে নেই।

 

সাবধানে শেয়ার

• হয়তো এত দিন শেয়ারকে দূরে রেখেছেন। অথচ এখন পড়তি সুদের জমানায় বুঝতে পারছেন যে, সেখানে পা রাখলে মন্দ হয় না। বিশেষত অনেক ভাল শেয়ারের দাম কমে আসায় তাকে মনে হচ্ছে নাগালে।

এ ক্ষেত্রে আমার পরামর্শ: কম দামে নামী সংস্থার ভাল শেয়ার অল্প করে অবশ্যই কিনে রাখতে পারেন। কিন্তু তার জন্য আগে সেই সংস্থা, শিল্প সম্পর্কে আর একটু খবর নিন। নিয়মিত বাজারের খোঁজ রাখতে পারবেন কি না, নিজেকে সেই প্রশ্ন করুন। ভেবে দেখুন, লম্বা সময়ের জন্য সেই লগ্নি ধরে রাখতে পারবেন কি না। এগুলি পারলে, শেয়ার-সমুদ্রে এই বাজারেও পা ডোবান। তবে নতুন তো, বেশি দূর না যাওয়াই ভাল।

• বাজারে যাঁরা সবে পা রেখেছেন, তাঁদের অনেকেই শেয়ারের দাম অল্প বাড়লেই উৎসাহী। আবার সামান্য পতনে হতাশ। ফলে এখন পড়তি বাজারে দিশেহারা। মনে রাখবেন, শেয়ার বাজার কিন্তু রাতারাতি ধনী হওয়ার জায়গা নয়। তাই হাতে ভাল সংস্থার শেয়ার থাকলে, দাম সামান্য পড়লেই চট করে বেচে দেওয়া কাজের কাজ নয়। অনেক সময় পরে পস্তাতে হতে পারে। কিন্তু তেমনই কোনও সংস্থার শেয়ার উল্কার গতিতে পড়তেই থাকলে, তার সম্পর্কে খোঁজ নিন। যদি সংস্থার নিজের কোনও সমস্যার জন্য (যেমন সত্যম কেলেঙ্কারি) তেমনটা ঘটে, তাহলে সাবধান হওয়া জরুরি। 

• পোড় খাওয়া লগ্নিকারী হলেও এই বাজারে সাবধানে পা ফেলুন। অযথা ঝুঁকি এড়িয়ে চলা ভাল।

 

সতর্ক থাকুন ডেট ফান্ডে

ঋণপত্রের বাজারও কিন্তু স্বস্তিতে নেই। আইএল অ্যান্ড এফএস এবং ডিএইচএফএল কাণ্ডের খবর ঋণপত্রের বাজারকেও নাড়িয়ে দিয়েছে। এই সব কারণেই বলব—

• এখন ডেট ফান্ডে লগ্নির আগে সতর্ক থাকুন। অবশ্যই দেখুন রেটিং।

• ফান্ডের পোর্টফোলিয়ো (সেটি কোথায় টাকা খাটাচ্ছে) খতিয়ে দেখুন।

• আগে থেকে ডেট ফান্ডে লগ্নি থাকলে, দেখুন সেগুলির অবস্থা কী। 

• যদি দেখা যায় ফান্ড ক্রমাগত খারাপ করছে, তা হলে প্রয়োজনে লগ্নি সরানোর কথাও ভাবতে পারেন।

 

চালু থাকুক এসআইপি

শেয়ার বাজারে ওঠাপড়া থাকবেই। অথচ আমাদের অনেকেরই প্রবণতা হল, সূচক পড়তে দেখলেই লগ্নি তুলে ফেলা। এটা ভুল। মনে রাখবেন—

• পড়তি বাজারেই বেশি ইউনিট কেনার সুযোগ মেলে। যা পরে বাজার ওঠার সময়ে আপনাকে মুনাফার মুখ দেখাবে। তাই বাজার পড়লেই ফান্ডে টাকা ঢালা বন্ধ করে দেবেন না।

• এসআইপি তো দীর্ঘ মেয়াদের জন্য করা। তার মধ্যে ওঠা-পড়া দুই আসলে, তবেই ভাল রিটার্ন মিলবে।

• তবে যদি ফান্ডের ন্যাভ নাগাড়ে তলিয়ে যেতে থাকে, তবে সে দিকে নজর দিন। তেমনটা শুধু ওই ফান্ডের ক্ষেত্রে হলে, তা বদলাতে হতে পারে।

• লক্ষ্য কাছে এসে গিয়ে থাকলে (যেমনটা আগেই বলেছি) প্রয়োজনে টাকা নিরাপদ জায়গায় সরান।

 

কম সুদেও খোঁজ

সুদ ক্রমশ কমছে ঠিকই। কিন্তু তবু ভেবে দেখতে পারেন—

• তারই মধ্যে তুলনায় একটু বেশি সুদ মিলছে কোথায়?

• বাড়ির কোনও প্রবীণের নামে আমানতে টাকা রাখা যায় কি? তা হলে সুদ একটু বেশি পাবেন।

• সুকন্যা সমৃদ্ধি, পিপিএফের মতো প্রকল্পের সুবিধা নিয়েছেন কি? 

 

জানতেই হবে

সঞ্চয়ের বিভিন্ন জায়গার কথা বললাম। এ ছাড়াও এমন অনিশ্চিত সময়ে টাকা রাখার আগে কিছু কথা মাথায় রাখা জরুরি। যেমন—

 

দেখা মানেই বিক্রি নয়

কোনও ফান্ডের ন্যাভ বা শেয়ারের দর পড়ছে। তাতে অবশ্যই নজর রাখুন। কিন্তু তার মানেই এই নয় যে, তা বিক্রি করতে হবে। যেমন, গত এক-দেড় বছর ধরে মিড ক্যাপ এবং স্মল ক্যাপ ফান্ডের দশা তেমন ভাল নয়। তা হলে কি সেগুলি সবই বেচে দেওয়া উচিত?

আমি বলব, সংশ্লিষ্ট সংস্থার আর্থিক হাল যদি খারাপ না-হয়, তা হলে লগ্নি চালানোই বুদ্ধিমানের কাজ।

শেয়ার, ফান্ডের ঝুঁকি মাপার জন্য ‘বিটা’ নামে একটি সূচক ব্যবহার হয়। বিটা ১-এর বেশি হওয়া মানে ফান্ডটি বেশি ঝুঁকির। কম হলে উল্টোটা। চাইলে বেশি বিটার ফান্ড থেকে লগ্নি সরিয়ে এনে কম বিটা বা কম ঝুঁকির ফান্ডে লগ্নি করতে পারেন।

বাস্তবের মাটিতে পা

বাজারে টাকা ঢাললেই, তা থেকে যে কোনও সময়ে বিপুল মুনাফা হবে, এমন ধারণা ভুল। তার জন্য সঠিক সময়ে বিক্রি করতে পারাও জরুরি। পড়তি বাজার সব সময় তার উপযুক্ত জায়গা না-ই হতে পারে। তিনটি উদাহরণই ধরুন—

• যদি লক্ষ্য হয় ১০% রিটার্ন, তা হলে মোটামুটি ধরে নিতে পারেন বাজারও ওই হারে এগোলে আপনি সেই রিটার্ন পাবেন। তেমনই বাজার ১০% পড়লে, তৈরি থাকতে হবে ১০% লোকসান বা রিটার্ন নেমে আসার জন্য। অর্থাৎ, লগ্নি থেকে প্রত্যাশার ভিত যেন বাস্তবের জমিতে থাকে। সব সময়েই মুনাফার মুখ দেখবেন ভেবে এগোলে পরে গিয়ে পস্তাতে হতে পারে। তখন কিছু ক্ষেত্রে উপায় দর বা ন্যাভ ফের ওঠার অপেক্ষা। কিছু ক্ষেত্রে করতে হতে পারে ক্ষতি স্বীকারও। লগ্নি ছড়িয়ে দেওয়া তো সেই জন্যই জরুরি।

• যদি দেখেন বাজার ১০% পড়লেও, আপনার শেয়ার বা ফান্ড ৫% পড়েছে, সে ক্ষেত্রে বলতে হবে বাজারের উতরাই থেকে বেঁচে গিয়েছেন।

• আর যদি বাজারের চেয়েও বেশি গতিতে আপনার বাছাই করা ফান্ড পড়ে, তা হলে দু’টি বিষয় হতে পারে:

(১) ফান্ডের চড়া বিটা পতনের জন্য দায়ী। সে ক্ষেত্রে ওই চড়া বিটা-ই কিন্তু পরে উত্থানের সময়ে ভাল রিটার্ন দিতে সাহায্য করতে পারে।

(২) যদি সত্যিই আপনার ফান্ডে পরিচালনার সমস্যা থাকে, তাহলে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে।

• কোনও সুদ নির্ভর প্রকল্পে আগে থেকে টাকা রাখা থাকলে, তা তোলার আগে খতিয়ে দেখুন যে, অন্যত্র নিট রিটার্ন তার থেকে বেশি পাচ্ছেন কি না। পেলেও তাতে ঝুঁকি কতটা।

 

আতঙ্কে ভুগবেন না

টাকা রাখার আগে তার লক্ষ্য এবং সম্ভাব্য রিটার্ন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি। হতেই পারে যে পোর্টফোলিয়োয় থাকা শেয়ার বা ফান্ডের মূল্য ১৫% পড়ে গেল। কিন্তু ধৈর্য ধরতে পারলে হয়তো দেখা যাবে তা ফের উত্থানের মুখ দেখছে। তাই আতঙ্কিত হওয়া ঠিক নয়। বাজার এবং ফান্ড কী ভাবে কাজ করে, তার মূল বিষয়টি জেনে রাখুন। জানতে হবে কী কী অনুপাত দেখে শেয়ার বাছাই করা যায়। আগেই বিটার কথা বলেছি। সে রকম আরও কিছু জরুরি অনুপাত সম্পর্কে জেনে রাখা ভাল। 

 

কম মানেই ভাল নয়

এটা ঠিক যে কিছু শেয়ার এই বাজারে বেশ আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে। ফলে তা কিনে রাখতে পারলে ভাল। কিন্তু তা-ও বলব ধৈর্য ধরুন। দাম পড়তে দেখলেই তাড়াহুড়ো করবেন না। প্রথমেই দুম করে কিনে ফেলার থেকে দু’দিন অপেক্ষা করা ভাল। কারণ—

• এতে উল্টে হাত পোড়ানোর সম্ভাবনা থাকে। হয়তো দেখা গেল বাজার আরও পড়ল। তখন সেই শেয়ারের দাম যেখানে গিয়ে দাঁড়াবে, তখন আফসোস হতে পারে।

• ছোট লগ্নিকারীদের বাজারে একটু সাবধানে পা ফেলা ভাল। যাতে অনেক টাকা গচ্চা না যায়।

 

ছড়িয়ে দিন লগ্নি 

ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা বুঝে তহবিলকে বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে দিন। যেমন, পুরো তহবিলই শেয়ার বা ফান্ডে না-রেখে, অন্তত ৫%-১০% থাকুক সোনা বা সরকারি ঋণপত্রের মতো তুলনায় নিশ্চিত সুরক্ষার প্রকল্পে। কিছুটা ব্যাঙ্ক, ডাকঘরের সুদ নির্ভর প্রকল্পে। 

ভেবে দেখুন, শেয়ার বাজারে অস্থিরতা বাড়লে, সাধারণত লগ্নির নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে সোনার কদর বাড়ে। কলকাতায় এই সপ্তাহেই প্রতি ১০ গ্রাম পাকা সোনার দর ছাড়িয়েছে ৩৮,০০০ টাকা। মাত্র সাড়ে তিন মাসেই তা বেড়ে গিয়েছে ৬,০০০ টাকারও বেশি। যদি আগে আরও কিছুটা বেশি সোনা কেনা থাকত?

অর্থাৎ, লগ্নি ছড়িয়ে করুন। যাতে এক তহবিল খারাপ করলেও, অন্যটি তা সামাল দিতে পারে।

 

একবারেই শেষ নয়

তহবিল গোছানো এক দিনের কাজ নয়। তেমনই এক বার করলেই তা শেষ ভেবে নেওয়াও ঠিক নয়। বরং নিয়মিত সঞ্চয়ের পর্যালোচনা জরুরি। কারণ হিসেবে ভেবে দেখুন —

• আমরা শেয়ার বাজার বা ফান্ডে দীর্ঘ মেয়াদে লগ্নির কথা বলি। কিন্তু তা বলে যে ফান্ড বা শেয়ার পরিস্থিতি অনুকূল থাকলেও খারাপ রিটার্ন দিচ্ছে, তাতে অনন্তকাল ধরে লগ্নি করে যাওয়া ঠিক নয়। সেই কারণে নির্দিষ্ট সময় অন্তর লগ্নি খতিয়ে দেখতে হবে। এমনকি স্থায়ী আমানত, বন্ডের মতো তুলনায় সুরক্ষিত প্রকল্পেও মেয়াদ শেষে ফের লগ্নি করার আগে দেখতে হবে সেখানে কেমন সুদ পাওয়া যাচ্ছে। কুপন রেট, বন্ডের দামেরই বা কী অবস্থা।

• আর্থিক পরিকল্পনা বদলালে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলাতে হবে লগ্নির ধরনও। যেমন, সংসারের দায়িত্ব নেওয়ার আগে যে ভাবে টাকা রাখব, দায়িত্ব ঘাড়ে এলে সেই একই ভাবে তা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

• বিশ্ব এবং দেশের বাজারের পরিস্থিতি যে ভাবে পাল্টাবে, সেই মতো সাজাতে হবে লগ্নি। এখন যেমন অর্থনীতি চাপে। মন্দার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না অনেকে। এই পরিস্থিতিতে লগ্নি ফিরে দেখা জরুরি।

 

লেখক বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞ

(মতামত ব্যক্তিগত)