দরজায় কড়া নাড়ছে নতুন বছর। কিন্তু সেই বছরেও বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন সূর্য ওঠার আশা সে ভাবে করছেন না আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডারের (আইএমএফ) কর্ণধার ক্রিস্টিন ল্যাগার্দে। বরং তাঁর মতে, ২০১৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতির চাকা গড়াবে ঢিমেতালেই। বৃদ্ধির হার হবে হতাশাজনক। এমনকী মাঝারি মেয়াদেও তা পুরোদস্তুর ছন্দে ফিরবে কি না, সে বিষয়ে সন্দিহান তিনি। উল্লেখ্য, অক্টোবরে আইএমএফের পূর্বাভাস ছিল, ২০১৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে বৃদ্ধি হবে ৩.৬%।
সম্প্রতি একটি জার্মান সংবাদপত্রে নিজের এক লেখায় এই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ল্যাগার্দে। তিনি মনে করছেন, ইতিমধ্যেই চৌকাঠে এসে দাঁড়ানো নতুন বছরে বিশ্ব অর্থনীতির পুরোদস্তুর ঘুরে দাঁড়ানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে মূলত দু’টি বিষয়— (১) মার্কিন শীর্ষ ব্যাঙ্ক ফেডারেল রিজার্ভের সুদ বৃদ্ধি। (২) চিনা অর্থনীতির নড়বড়ে দশা।
২০০৮ সালের ভয়াল মন্দার কোপ থেকে ঘুরে দাঁড়াতে দীর্ঘ দিন মার্কিন মুলুকে সুদ শূন্যের কাছাকাছি বেঁধে রেখেছিল ফেড রিজার্ভ। কিন্তু হালে কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে বারাক ওবামার দেশের অর্থনীতি। বেকারত্বের হারও নেমেছে অনেক নীচে। ফলে এ বার কম সুদের জমানা থেকে ধাপে ধাপে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে আমেরিকার শীর্ষ ব্যাঙ্ক। ডিসেম্বরেই সুদ ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়েছে তারা। সম্ভাবনা আগামী বছরে ধীরে ধীরে তা আরও বৃদ্ধির।
আর ঠিক এখানেই সিঁদুরে মেঘ দেখছেন আই এম এফের ম্যানেজিং ডিরেক্টর। তিনি মানছেন যে, এই সুদ বৃদ্ধি স্বাভাবিক এবং প্রত্যাশিত। তার ধাক্কা সামলাতে আগের তুলনায় অনেক বেশি তৈরি উন্নয়নশীল দেশগুলি। কিন্তু তা সত্ত্বেও মার্কিন মুলুকে সুদ বৃদ্ধি বহু দেশ ও সংস্থাকে বিপদে ফেলবে বলে তাঁর আশঙ্কা।
ল্যাগার্দের মতে, আমেরিকায় সুদ শূন্যের কাছাকাছি থাকাকালীন সেখানকার আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলি থেকে ধার নিয়েছে বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা। এ বার সুদ বৃদ্ধির ফলে বাড়তি অর্থ গুনতে হবে তাদের। সেই ফাঁস আরও শক্ত হয়ে চেপে বসবে, যদি ক্রমাগত বাড়তে থাকে ডলারের দাম।
এক দিকে মার্কিন অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত। অন্য দিকে, ফেড রিজার্ভের সুদ বৃদ্ধির সম্ভাবনা। এই জোড়া কারণে টাকা-সহ প্রায় সব মুদ্রার সাপেক্ষে ডলারের দাম বাড়ছে বেশ কিছু দিন ধরেই। এই প্রবণতা বজায় থাকলে, আগামী দিনে আরও চড়তে পারে ডলারের দর। ল্যাগার্দের আশঙ্কা, তখন আক্ষরিক অর্থেই হাঁসফাঁস দশা হবে বিভিন্ন দেশ এবং সংস্থার। কারণ, একে তো সুদ বাড়বে। তার উপর ডলার দামি হওয়ায় ধার শোধার জন্য গুনতে হবে আরও বেশি অর্থ। ফলে তখন ধার শোধ করতে খাবি খাবে অনেক সংস্থা। এমনকী দেউলিয়া হতে পারে অনেকে। ঋণ শুধতে একই সমস্যায় পড়তে পারে অনেক দেশও। ফলে আগামী দিনে ফেড রিজার্ভের সুদ আরও বাড়ানোর ধাক্কা বিশ্ব অর্থনীতি কী ভাবে সামাল দেবে, সে বিষয়ে উদ্বিগ্ন তিনি।
ল্যাগার্দেকে উদ্বেগে রেখেছে ঝিমিয়ে পড়া চিনা অর্থনীতিও। আজ অনেক দিনই চিনের অর্থনীতি রফতানি নির্ভর। কিন্তু ইউরোপ-সহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এখনও বহাল আর্থিক সঙ্কট। পুরোপুরি চাঙ্গা হয়নি মার্কিন মুলুক। তেলের দামে ধসের কারণে ভাটা পশ্চিম এশিয়ার চাহিদাতেও। ফলে মার খাচ্ছে রফতানি। শ্লথ হয়েছে চিনা অর্থনীতির গতিও। আইএমএফ কর্ণধারের মতে, হয়তো এই সমস্যা এখন ঘরের দিকে তাকাতে বাধ্য করছে বেজিংকে। দেশীয় অর্থনীতিতে চাহিদা বাড়ানোর উপায় খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে তারা। এতে যে দীর্ঘ মেয়াদে লাভ হবে, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এখন স্বল্প বা মাঝারি মেয়াদে নড়বড়ে চিনা অর্থনীতির বিরূপ প্রভাব পড়বে বিশ্ব অর্থনীতির আঙিনাতেও।
এর উপর রয়েছে বিশ্ব জুড়ে উৎপাদনশীলতা সে ভাবে না-বাড়া, বয়স্ক মানুষের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধির মতো নানা সমস্যা। এই কঠিন সময়ে ভেসে থাকতে সব দেশকে অনাবশ্যক খরচে রাশ টানার পরামর্শ দিচ্ছেন ল্যাগার্দে। তাঁর দাওয়াই সংস্কারের পথে অটল থাকারও।