যাত্রী-স্বাচ্ছন্দ্য বাড়াতে পূর্ব রেলের টালিগঞ্জ স্টেশনে সদ্য চালু হয়েছে নতুন প্ল্যাটফর্ম এবং ফুট ওভারব্রিজ। কিন্তু স্বাচ্ছন্দ্য বাড়া তো দূর, উল্টে তা ঘোর বিড়ম্বনা হয়ে দেখা দিয়েছে শিয়ালদহ-বজবজ শাখার কয়েক হাজার যাত্রীর কাছে।

বিশেষত বজবজ বা মাঝেরহাটের দিক থেকে আসা যাত্রীদের কাছে নতুন ওই প্ল্যাটফর্মে ট্রেন থেকে নেমে বাস বা মেট্রো ধরতে যাওয়ার সমস্যা বেড়ে গিয়েছে কয়েক গুণ। যাত্রীদের একটা বড় অংশের বক্তব্য, শিয়ালদহগামী ট্রেনের জন্য তৈরি এই নতুন প্ল্যাটফর্ম এবং সংলগ্ন ফুট ওভারব্রিজ তৈরিতে রেলের অদূরদর্শিতাই প্রকট হয়েছে। যে ভাবে ওই নির্মাণ করা হয়েছে, তাতে বজবজের দিক থেকে আসা লোকজনকে ট্রেন থেকে নেমে ওভারব্রিজে উঠতে গেলে প্রায় দু’টি প্ল্যাটফর্মের সমান দৈর্ঘ্যের পথ হাঁটতে হচ্ছে। ফলত, দ্রুত মেট্রো বা বাস ধরতে ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা এবং অফিসযাত্রীরা দলে দলে ট্রেন থেকে নেমে রেললাইন পারাপারের পথ বেছে নিচ্ছেন। প্রতি বার ট্রেনের আনাগোনার সময়ে কয়েকশো মানুযের লাইন পার হওয়ার জেরে এমন ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে, যে কোনও সময়ে বড় দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে। পাশাপাশি, ট্রেনের সময়ানুবর্তিতা উন্নত করতে যে উদ্দেশ্যে ওই প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়েছে, তা-ও ধাক্কা খাচ্ছে পদে পদে।

কেন এই দুর্ভোগ?

পূর্ব রেলের শিয়ালদহ ডিভিশন সূত্রের খবর, বছরখানেক আগে রবীন্দ্র সরোবর মেট্রো স্টেশন সংলগ্ন টালিগঞ্জ স্টেশনে শিয়ালদহগামী ট্রেনের জন্য দ্বিতীয় একটি প্ল্যাটফর্ম এবং ফুট ওভারব্রিজ তৈরির কাজ শুরু হয়। তার আগে বহু বছর ধরে ওই স্টেশনে আপ এবং ডাউন ট্রেনের জন্য একটিই প্ল্যাটফর্ম বরাদ্দ ছিল। রবীন্দ্র সরোবর মেট্রো স্টেশন সংলগ্ন ওই প্ল্যাটফর্ম থেকেই যাত্রীরা বজবজের ট্রেন ধরতেন। আবার বজবজ বা মাঝেরহাটের দিক থেকে আসা লোকজন মেট্রো বা বাস ধরার জন্য ওই প্ল্যাটফর্মেই নামতেন। মাসখানেক আগে নতুন প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়। সমস্যার শুরু তখন থেকেই।

শিয়ালদহ-বজবজ শাখার যাত্রীদের অভিযোগ, টালিগঞ্জ স্টেশনের নতুন প্ল্যাটফর্মটি বর্তমান প্ল্যাটফর্মের সোজাসুজি তৈরি করা হয়নি। বদলে সেটি লেক গার্ডেন্সের দিকে অনেকটা এগিয়ে তৈরি করা হয়েছে। কার্যত পুরনো প্ল্যাটফর্মের মাঝামাঝি জায়গা থেকে শুরু হয়েছে উল্টো দিকের নতুন প্ল্যাটফর্ম। সেটির একেবারে সামনের প্রান্তে রয়েছে ফুট ওভারব্রিজ। ফলে বজবজ বা মাঝেরহাটের যাত্রীদের ট্রেন থেকে নেমে প্রথমে নতুন প্ল্যাটফর্মের সামনের দিকে আসতে হচ্ছে। তার পরে সিঁড়ি দিয়ে ওভারব্রিজ পেরিয়ে আবার পুরনো প্ল্যাটফর্মের দৈর্ঘ্যের প্রায় সমান পথ হেঁটে স্টেশনের বাইরে আসতে হচ্ছে। ঘটনাচক্রে, বাস বা মেট্রো ধরার জন্য টালিগঞ্জের পুরনো প্ল্যাটফর্মের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তের পথটিই একমাত্র উপায়। ফলে ব্যস্ত সময়ে যাত্রীরা কেউই ওই দীর্ঘ পথ হাঁটার মানসিকতা দেখাচ্ছেন না। লোকাল ট্রেন ছাড়াও বন্দরের দিক থেকে আসা বহু মালগাড়ি এবং চক্র রেলের ট্রেন ওই পথ দিয়ে যাতায়াত করে। ফলে দলে দলে যাত্রীদের লাইন পেরোনোর ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার প্রভূত আশঙ্কা রয়ে যাচ্ছে।

তা হলে এমন পরিকল্পনাহীন ভাবে প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হল কেন?

রেল সূত্রের খবর, আগে আপ এবং ডাউন লাইনের জন্য একটিই প্ল্যাটফর্ম থাকায় ট্রেন চলাচলে অযথা দেরি হত। টালিগঞ্জ স্টেশনের পূর্ব প্রান্তের খুব কাছে, কয়েকশো মিটার ব্যধানে লেক গার্ডেন্স স্টেশন। ফলে প্রায়ই বিভিন্ন ট্রেনকে মাঝপথে দাঁড় করিয়ে রাখতে হত। সেই সমস্যা এড়াতেই তৈরি হয় নতুন প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু যে ভাবে সেটি তৈরি হয়েছে, তাতে যাত্রীদের বিড়ম্বনা বাড়ছে বই কমছে না। বজবজের একটি স্কুলের এক শিক্ষিকার কথায়, ‘‘যে ভাবে ওই প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েছে, তাতে স্টেশন থেকে বেরিয়ে আসতে অন্তত দশ মিনিট সময় বেশি লাগছে। আর লাইন টপকানোর ক্ষেত্রে পদে পদে দুর্ঘটনার আশঙ্কা তো আছেই। তা সত্ত্বেও বয়স্ক থেকে শুরু করে সন্তানসম্ভবা মহিলা, সকলেই ওই ভাবে লাইন পেরোতে বাধ্য হচ্ছেন।’’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শিয়ালদহ ডিভিশনের এক কর্তা বলেন, ‘‘স্থানাভাবে ওই স্টেশনে দীর্ঘদিন দ্বিতীয় প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা যায়নি। রেললাইনের পাশে জায়গা না থাকায় কিছুটা এগিয়ে নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হয়েছে। কী ভাবে এই সমস্যা সামলানো যায়, তা ভাবা হচ্ছে।’’