আশঙ্কা ছিলই। সে আশঙ্কা সত্যি করেই কালীপুজোর রাতে বাতাসে দূষণের পরিমাণ অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেল। সৌজন্যে শহর জুড়ে শব্দবাজি ও আতসবাজির দাপট! রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ বলছে, সহনশীল মাত্রার থেকে সেই দূষণের পরিমাণ ছিল প্রায় ছ’গুণ বেশি। 

পর্ষদের ব্যাখ্যা, আবহাওয়া মেঘলা থাকার কারণেই বাতাসে ভাসমান ধূলিকণার উপস্থিতি বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ, আলিপুর আবহাওয়া দফতর সূত্রের খবর, বায়ুর গতি প্রায় শূন্য থাকায় ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়তে পারেনি। তবে বুধবার দিনভর যে কুয়াশাচ্ছন্ন চেহারা ছিল শহরের, তার পিছনে বাজির ধোঁয়ারও ‘অবদান’ রয়েছে বলে জানাচ্ছেন পরিবেশবিদ তথা গবেষকদের একাংশ।

রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের চেয়ারম্যান কল্যাণ রুদ্র বলেন, ‘‘এমনিতেই মেঘ করে রয়েছে। তাই বাজি পোড়ানোর ধোঁয়াটা বেরোতে না পেরে রয়ে গিয়েছে। ফলে বাতাসে ভাসমান ধূলিকণার (পিএম ১০) পরিমাণটাও বেশি দেখা যাচ্ছে।’’  বুধবার রাতে ওই ধোঁয়াশার সঙ্গেই যুক্ত হয় দীপাবলিতে বাজি পোড়ানোর আর এক প্রস্ত দূষণ। যার ফলে এ দিন রাত ১০টায় রবীন্দ্রভারতী এলাকায় পিএম ১০-এর পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৪৭০ মাইক্রোগ্রামে এবং পিএম ২.৫-এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৩২৭.৭৭-এ। আর ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল চত্বরে পিএম ১০-এর পরিমাণ দাঁড়ায় ২৪৬.৬৩-তে ও পিএম ২.৫-এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১৭৪.৩১-এ।

প্রসঙ্গত, গত বছর বৃষ্টি হওয়ায় কালীপুজোর পরদিন শহরের বাতাসে পিএম ১০-এর পরিমাণ ছিল ৮৬.৩৩। আর কালীপুজোর গভীর রাতে, অর্থাৎ রাত ১২টায়, বিটি রোডের রবীন্দ্রভারতী এলাকায় পিএম ১০-এর পরিমাণ ছিল প্রতি ঘন মিটারে ৩১৭.৯৫ মাইক্রোগ্রাম।

এক বছর পরে ছবিটা কী দাঁড়িয়েছে? দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ সূত্রের খবর, মঙ্গলবার রাত ১০টায় বিটি রোডের রবীন্দ্রভারতী এলাকায় পিএম ১০-এর পরিমাণ ছিল প্রতি ঘনমিটারে ৭৩৫ মাইক্রোগ্রাম। রাত ১১টায় তা বেড়ে হয় ৭৯১ মাইক্রোগ্রাম। ওই এলাকাতেই রাত ১০টায় অতি সূক্ষ্ম ভাসমান ধূলিকণার (পিএম ২.৫) পরিমাণ ছিল ৬৫৬.৭২ ও রাত ১১টায় ৭২০.৪১। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল সংলগ্ন চত্বরে রাত ১০টায় পিএম ১০-এর পরিমাণ ছিল ৩৮৪.৪১ ও রাত ১১টায় তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৯৫.৪২। রাত ১০টা এবং রাত ১১টায় পিএম ২.৫-এর পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৩০২.১৮ এবং ৫২৩.৬২। 

পর্ষদ সূত্রের খবর, রাত ১২টায় ওই লেখচিত্র আচমকাই ঊধর্বমুখী হয়। মঙ্গলবার রাত ১২টায় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল চত্বরে বাতাসে ভাসমান ধূলিকণার (পিএম ১০) পরিমাণ দাঁড়ায় প্রতি ঘনমিটারে ৬০৯.৮৬ মাইক্রোগ্রাম! অতি সূক্ষ্ম ধূলিকণার (পিএম ২.৫) পরিমাণ দাঁড়ায় ৫৩৯.০৭। যেখানে কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের উল্লিখিত মাপকাঠি অনুযায়ী, ওই ভাসমান ধূলিকণার সহনশীল মাত্রা হল প্রতি ঘনমিটারে ১০০ মাইক্রোগ্রাম। ওই নির্দিষ্ট মাত্রা ছাড়ালেই শ্বাসকষ্টের রোগীদের শ্বাসের সমস্যা ধীরে ধীরে শুরু হয়। ওই মাত্রা যথাক্রমে ২০০, ৩০০ ও ৪০০ মাইক্রোগ্রাম হলে পরিস্থিতি ‘খারাপ’, ‘খুব খারাপ’ ও ‘বিপজ্জনক’ হিসেবে পরিগণিত হয়।

অর্থাৎ, বাজি পোড়ানোর ফলে বাতাসে ভাসমান ধূলিকণার পরিমাণ সহনশীল মাত্রার থেকে প্রায় ছ’গুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। বক্ষরোগ চিকিৎসক পার্থসারথি ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘যাঁরা সুস্থ তাঁদের হয়তো শুধু কাশি হবে। কিন্তু যাঁরা ইতিমধ্যেই অসুস্থ, তাঁদের খুব কষ্ট হয় এই সময়ে। এই দূষণ সকলের স্বাস্থ্যের পক্ষেই ভীষণ ক্ষতিকারক।’’ বক্ষরোগ চিকিৎসক রাজা ধরের কথায়, ‘‘শ্বাসকষ্টের রোগীদের খুবই দুর্দশা হয় এই সময়ে। কারণ, ফুসফুসের ক্ষমতা কমে যাওয়ায় সামান্য ধোঁয়াতেও তাঁদের খুব অসুবিধা হয়।’’

কল্যাণবাবু বলেন, ‘‘এ বছরও বৃষ্টি হোক, আমরা প্রবল ভাবে চাইছি। কারণ, এত প্রচার করা সত্ত্বেও নাগরিকদের একাংশের কোনও সচেতনতাই নেই! পরবর্তী প্রজন্মের শ্বাস নেওয়ার জন্য কী বাতাস রেখে যাচ্ছি, তা আমরা ভাবছি না।’’

পর্ষদ সূত্রের খবর, বুধবার বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। সকাল ৬টায় বিটি রোডের রবীন্দ্রভারতী চত্বরে পিএম ১০-এর পরিমাণ ছিল প্রতি ঘনমিটারে ৩৬৭ মাইক্রোগ্রাম, বিকেল ৪টেয় তা নেমে দাঁড়ায় ১৭০.১৪-এ। আবার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল এলাকায় সকাল ৬টায় তার পরিমাণ ছিল ২১৩.৪ ও বিকেল ৪টেয় তা হয় ১৬৮.২৪ মাইক্রোগ্রাম। এ দিন দক্ষিণ কলকাতার একাংশে অল্প বৃষ্টি হওয়ায় এলাকাভিত্তিক দূষণের পরিমাণ কিছুটা কমেছে বলে জানাচ্ছেন পর্ষদ কর্তারা।

কলকাতা পুরসভা সূত্রের খবর, এ দিন সকাল ৮টা থেকে ১২টার মধ্যে শহরে সর্বাধিক বৃষ্টি হয়েছিল কামডহরিতে, ১১ মিলিমিটার (মিমি)। দ্বিতীয় স্থানে ছিল বালিগঞ্জ। সকাল ৯টা থেকে ১০টা, বালিগঞ্জে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল ৭ মিমি। আলিপুর আবহাওয়া দফতরের অধিকর্তা গণেশকুমার দাস বলেন, ‘‘বৃষ্টি হলে দূষণের পরিমাণ কিছুটা তো কমেই। বাতাস অনেকটা শুদ্ধ হয়।’’

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাটমস্ফেরিক সায়েন্স বিভাগ সূত্রে খবর, এ দিন বালিগঞ্জ এলাকায় বাজও পড়েছে। বজ্রনিরোধক যন্ত্র (লাইটনিং ডিটেক্টর) জানাচ্ছে, সকাল ৭টা থেকে সাড়ে ৮টার মধ্যে দু’টি বাজ পড়ে, যার একটি ছিল বিপজ্জনক। যদিও তাতে ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। বিভাগের অধ্যাপক সুব্রতকুমার মিদ্যা বলেন, ‘‘কালীপুজো, দীপাবলির দূষণের তথ্য সংগ্রহ করা হবে। তা করতে একটু সময় লাগবে। তার পরে বাজ পড়ার সঙ্গে ওই দূষণের সম্পর্ক পরীক্ষা করে দেখা হবে।’’