E-Paper

বাঙালি আত্মপরিচয়ের পরীক্ষা

বাঙালির মনের গহনে লোকায়ত, বৌদ্ধ, বৈষ্ণব-শাক্ত, মুসলিম, দলিত, ঔপনিবেশিক— সব ধরনের সংস্কৃতিই জারিত ও লালিত হয়েছে, তাই এমন বহুরসসিঞ্চিত মনের ‘নিজ নিকেতন’ বা ‘মনোরথের ঠিকানা’টিকে চিহ্নিত করা কষ্টসাধ্য কাজ নিঃসন্দেহে।

জয়ন্ত সেনগুপ্ত

শেষ আপডেট: ১১ এপ্রিল ২০২৬ ০৫:১৪

‘বাঙালির মন’ বড় সহজ ব্যাপার নয়, এক পরিব্যাপ্ত ইতিহাসের বহুবর্ণ ক্যানভাসে প্রোথিত সেই মন এক চঞ্চলমতি শশক বা কাঠবিড়ালির মতোই ক্ষিপ্র ও চঞ্চল, প্রায়শ অনির্দেশ্য। কে বাঙালি? কেমনধারা বাঙালি, কবেকার? কোথায় পাই তার মনের হদিস? সময়ের সঙ্গে, অভিজাত, মধ্যবর্তী, বা প্রান্তিক, বিভিন্ন স্তরে অবস্থানের সঙ্গে, কী ভাবে বদলায় সেই মনের চলন? বাঙালি অভিধাটিও খানিক তেঁতুলপাতা সদৃশ— সেখানে ভিড় করে থাকে পুরুষ ও নারী, নায়ক ও প্রান্তিক, নাগরিক ও মফস্‌সলি, শিক্ষাজীবী ও বণিক, সন্ন্যাসী ও সম্ভোগী, উদ্বাস্তু ও দলিত, প্রত্যেকেরই আছে তাঁদের স্বকীয় বিবর্তনের ধারা, আমাদের জ্ঞাত ইতিহাসের বিভিন্ন স্পর্শবিন্দুর মধ্যে দিয়ে সেই ধারাগুলির যাতায়াত ও পারস্পরিক নিষেক। বাঙালির মনের গহনে লোকায়ত, বৌদ্ধ, বৈষ্ণব-শাক্ত, মুসলিম, দলিত, ঔপনিবেশিক— সব ধরনের সংস্কৃতিই জারিত ও লালিত হয়েছে, তাই এমন বহুরসসিঞ্চিত মনের ‘নিজ নিকেতন’ বা ‘মনোরথের ঠিকানা’টিকে চিহ্নিত করা কষ্টসাধ্য কাজ নিঃসন্দেহে।

সেই অন্বেষণ অবশ্য অনেকে করেছেন, এখনও নিরন্তর করে চলেছেন— বিনয় ঘোষ, কাজী আবদুল ওদুদ, নীহাররঞ্জন রায়, নীরদচন্দ্র চৌধুরী থেকে আশিস নন্দী, পার্থ চট্টোপাধ্যায়, দীপেশ চক্রবর্তী-সহ আরও বহু বিদ্বজ্জন। তবু বলতে হয়, বহুধা-বিভক্ত, বহু কালান্তরের সাক্ষী বাঙালির বহুবর্গীয় মননের অনুসন্ধান এক বৃহৎ ক্যানভাসে, অথচ তুলনামূলক ভাবে সংক্ষিপ্ত পরিসরে, সে ভাবে কেউই করেননি। অনালোচিত এই পরিসর নিয়েই আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই বই— যেখানে ইতিহাস, সমাজ ও সাহিত্যের আলোকে আত্মমগ্ন ও আত্মতুষ্ট বাঙালিকে নিজের সীমাবদ্ধতা ও ভ্রান্তির মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়। বইটি যে চিন্তাসূত্র ধরে শুরু হয়, তা লেখকের যুক্তিবিন্যাসের এক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। আলাপন বলেন, সাহিত্যকে শুধু আবেগ দিয়ে নয়, সমাজ ও ইতিহাসের প্রেক্ষাপটেও বুঝতে হয়। তিনি বেছে নেন বাংলা সাহিত্যের তিন ‘নায়ক’ চরিত্র— শরৎচন্দ্রের দেবদাস, বিভূতিভূষণের অপু ও তারাশঙ্করের দেবু পণ্ডিত৷ তাঁর মতে দেবদাস শুধু ব্যর্থ প্রেমিক নন, ভারতীয় জীবনে ঔপনিবেশিক সমাজসৃষ্ট বিভ্রান্তি ও বিচ্ছিন্নতার প্রতীক। অপুর জীবনেও ‘মুক্তি’ আসে এক মৃত্যুমিছিলের মধ্যে দিয়েই। ‘অপরাজিত’ নামকরণের অন্তর্নিহিত ব্যাজস্তুতির সাহায্যে অপুর অন্তর্লীন ‘পরাজয়’কে উন্মোচন করেন আলাপন, তার একক যাত্রাকে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলার এক অ-নায়কসুলভ অক্ষমতা হিসাবে উপস্থাপন করেন। পথের দেবতা যতই বলুন ‘চল এগিয়ে যাই’, অপুও তো আদতে ঔপনিবেশিক সামাজিক-অর্থনৈতিক অচলায়তনেরই শিকার। আবার দেবু পণ্ডিতের মধ্যে আলাপন আবিষ্কার করেন ‘আধুনিক ভারতীয় বঙ্গজ গ্রামীণ দেশপ্রেমী রাজনীতির’ কিছু সাধারণ ঐতিহাসিক সূত্র, যা শুধুই নগরকেন্দ্রিক অভিজ্ঞতা-সঞ্জাত নয়, উচ্চমার্গের রাজনীতির ‘অধমর্ণ এবং অনুচর’ নয়, যা দেশাত্মবোধক ‘কর্মের প্রেরণা’ এবং ‘আত্মপ্রাধান্যের আকাঙ্ক্ষা’-কে একই আধারে স্থান দিতে পারে।

আলাপনের এই সিদ্ধান্ত যে শুধু প্রচলিত ইতিহাসচর্চার নিরিখে ব্যতিক্রমী, তা-ই নয়, তাঁর ‘মেথড’ও বিশিষ্ট। তাঁর কথায় ‘সাহিত্যে ইতিহাসের প্রভাব আবিষ্কার করা যত সহজ, ইতিহাসের সূত্র সন্ধান করা ততটাই কঠিন’। অথচ ঠিক সেই দুঃসাধ্য কাজটিই তিনি করেছেন। তাঁর লেখার চমকপ্রদ বৈশিষ্ট্য হল এই যে, ইতিহাসের এক পরিব্যাপ্ত সময়ে, নানান ও ভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বাঙালির মনের চলনের অসংখ্য গতিমুখ, গতিসূত্র ও অভিঘাতকে তিনি বোঝেন, ধরেন ও বোঝান ইতিহাস ও সাহিত্যের ধরতাই ও সওয়াল-জবাবে গড়ে-ওঠা এক সার্বিক ও পরস্পর-অন্বিষ্ট বোধের নিরিখে। সেই ক্যানভাসে এই দুইয়ের আলাদা অস্তিত্ব নেই, দুই-ই যেন এক ‘ডাবল হেলিক্স’-এর মতো অন্বয়ে ও অবিচ্ছেদ্যতায় বাঙালির মন ও মননকে বুঝতে সাহায্য করে। সাহিত্যকে ইতিহাসবিদের ইতস্তত উপাদান হিসাবে না দেখে তাকে মন ও মননের ইতিহাসচর্চার এক নির্বিকল্প আর্কাইভ হিসাবে ব্যবহার করা লেখকের চর্চাকে স্বতন্ত্র করে।

বাঙালির মন নিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের যে ইমারত আলাপন তৈরি করেছেন, তাকে তাঁর একান্ত স্বকীয় এক মনসিজ প্রাসাদ বা ‘মেমরি প্যালেস’, বা অনন্য এক ভাবনার রেখাচিত্র (গ্রিড অব আইডিয়াজ়) বলে ভাবা যেতে পারে। বিশেষ করে ‘ভদ্রলোকের সংকট’ শীর্ষক অনবদ্য প্রবন্ধটিতে তিনি এমন বহু গবেষণাকর্ম এবং তথ্যসূত্র ব্যবহার করেছেন, যেগুলি প্রায় সবই বিভিন্ন সময়ে পড়েছি, আলাদা আলাদা লেখায় ব্যবহারও করেছি, কিন্তু ভাবনার ঊর্ণতন্তুজালের মধ্য দিয়ে সেগুলি যে এক বৃহৎ ইতিহাসের সমগ্রদর্শনে পরস্পর সন্নিবদ্ধ হয়ে ডার্করুমের তরল থেকে উঠে-আসা ফোটোগ্রাফিক প্লেটের মতো ফুটে উঠবে, তা আগে আন্দাজ করতে পারিনি। ভারত তথা বাংলায় ঔপনিবেশিক শাসনের অভিঘাত সম্পর্কে বিস্তর গবেষণা হয়েছে, তত্ত্বের কচকচিও কম নয়। কিন্তু আলাপন ভারতে ঔপনিবেশিক শাসনকে দেখেন ইউরোপের সমাজবিবর্তনের বিপ্রতীপে, এক অসম্পূর্ণ নগরায়ণের স্বার্থান্বেষী রূপকার হিসাবে, যে অসম্পূর্ণতা— এবং তৎসঞ্জাত আশাভঙ্গ আর নৈরাশ্য— বাঙালিকে ‘স্মৃতির দিকে, গৃহের দিকে, গ্রামের দিকে, বাল্যের দিকে’ বার বার ফিরে ফিরে ডাকে। এই পিছুটান, বৃত্তপথ ধরে এই প্রত্যাবর্তনের তাগিদ, এই ‘ক্লান্ত গৃহকাতরতা’ আলাপনের মতে বাঙালির সন্ধ্যাসঙ্গীতের এক নির্ভুল ‘সিগনেচার টিউন’, যে তন্ত্রীতে বোঝা যায় যে আঠারো ও উনিশ শতকের রৌদ্রোজ্জ্বল রোমাঞ্চ, উদ্দামতা, মহানন্দময়, অনন্ত সম্ভাবনাময় বহির্মুখিনতা উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে আর বিংশ শতকের প্রথমার্ধে অবসন্ন শরীর এলিয়ে দিয়েছে এক আশাহত ও গ্লানিময় অন্তিমশয্যায়। তাই এক কালের অভিযাত্রিকরা ক্রমাগত ফিরতে থাকে, গ্রামের দিকে বা পূর্বসাধনায়। লেখকের চমকপ্রদ সিদ্ধান্ত, এই প্রত্যাবর্তন-পরায়ণতাই বাঙালির প্রধান ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার, আবার এ-ই ‘আত্মখণ্ডিত বাঙালির দেশভাগদীর্ণ উত্তর-ঔপনিবেশিক ট্র্যাজেডিরও পূর্বাভাস বটে’।

বাঙালির মন,

আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়,

৪০০.০০

দে’জ়

বস্তুতই, আলাপন দেখান, দেশভাগ শুধু ভূখণ্ডের নয়, বিভাজন ঘটায় মানুষের স্মৃতি ও পরিচয়েরও। ‘উদ্বাস্তুর মন’ প্রবন্ধে আলাপন হাংরি আন্দোলন, নকশাল আন্দোলনের ‘পিতৃমাতৃঘাতী ক্রোধ’, ওই সময়কার সর্বব্যাপী ভাঙনের নেশা আর আত্মার মৃত্যুবোধকেও দেশভাগের ট্রমার সুদূরপ্রসারী অভিঘাত বলে চিহ্নিত করেছেন। একই রকমের অপ্রত্যাশিত বা ‘কাউন্টার-ইনটুইটিভ’ বিশ্লেষণ বা অন্তর্দৃষ্টি আমরা পাই ‘সন্ন্যাসীর মন’, ‘দলিতের মন’, ‘নারীর মন’-এর মতো গ্রন্থাংশের প্রবন্ধগুলিতেও।

বইয়ের ভাষা তীক্ষ্ণ, লেখকের নজর তির্যক, পরিবেশনের পন্থায় আখ্যানলালিত্যের বদলে বংশপঞ্জিকার মতো স্পষ্ট ভাবে ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার কার্যকারণসূত্রের এক ধারণা-মানচিত্র বা ‘কনসেপ্ট ম্যাপ’ উপস্থাপনের প্রয়াস স্পষ্ট। তবু, নির্মোহ শল্যচিকিৎসকের দক্ষতায় ব্যবচ্ছেদ ও বিশ্লেষণের বহিরঙ্গের নীচে, আলাপনের অননুকরণীয় ভাষার জঠরে এক অন্য কম্পাঙ্কও অনুভূত হয়, যেখানে সঙ্গোপনে মিশে থাকে বিষাদ, অনুকম্পা, সহমর্মিতা, খানিকটা বা আশার এক প্রকম্পিত দীপশিখাও। বাঁধা গতের ইতিহাস-গবেষণার বই নয়তো বলেই হয়তো মাঝে মাঝেই ধাক্কা লাগতে পারে। কিন্তু সেই প্রকম্পন আজকের বাঙালির পক্ষে অপরিহার্য।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, বাঙালির মন শুধু এক জাতির ক্লান্তিহীন ও অসহায় আত্মরতিরই খতিয়ান নয়, তার শেষে রয়েছে এক চমকপ্রদ পুনরুদ্ধারেরও ইঙ্গিত, যেখানে লেখক বাঙালিকে তার দীর্ঘ দিনের উচ্চম্মন্য আত্মমগ্নতার কন্দর থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান, পেশ করেন যে সেই ক্ষুদ্রবৃত্তের বাইরে থাকা, সচরাচর ‘অপরায়িত’ নারী, মুসলমান, দলিত, আদিবাসী এবং অবাঙালিদের সাগ্রহে, সসম্মানে আপন করে নিয়ে নিজেদের আত্মপরিচয়কে প্রকৃত অর্থেই ‘সার্বজনিক’ করে তোলা ছাড়া এই সঙ্কটকালে বাঙালির পক্ষে সংস্কৃতি রক্ষা অসম্ভব। সন্দেহ নেই, এ এক প্রকৃত গণতান্ত্রিক আহ্বান, ভবিষ্যতের এক সম্ভাবনাময় পথনির্দেশ। বাঙালির মনের এই দোলাচল-সঙ্কুল সময়ে পক্ষকাল পরের গণতান্ত্রিক মহাপরীক্ষা তার আত্মপরিচয়ের পুনর্নির্মাণের এক উৎসুক সুযোগও বটে। সে পরীক্ষায় বাঙালি উতরোবে কি?

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

book review Alapan Bandyopadhyay

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy