বাংলা পত্রপত্রিকার ইতিহাস ও পরম্পরা বিচার্য বিষয় হলে সেই কর্ম কারও কারও কাছে অপকর্ম বলে মনে হতে পারে। এবং মনে হতে পারে, ইদানীং বাংলা সাময়িকপত্রে যে অজস্র প্রবন্ধ বা বিভিন্ন গদ্য রচনা ছাপা হচ্ছে, সে সবের ফলে বাংলা প্রবন্ধের মান বঙ্কিমী ভাষায় ‘উন্নত’ হয়নি। ভাবা যেতে পারে, এই সব প্রবন্ধ অধিকাংশ ক্ষেত্রে এক ধরনের চর্বিতচর্বণ, অবিরত লেখা হচ্ছে, অবিরত ছাপা হচ্ছে। এবংবিধ যুক্তির সাহায্যে এমন সিদ্ধান্তেও চলে আসা যায় যে, ‘অতি বড় প্রবন্ধকারও তাই পুজোয় নতুন প্রবন্ধ লেখেন না। অথবা বলা ভাল চর্বিত-চর্চিত প্রবন্ধটি আদতে নতুন কি না, তা যাচাই করেন না বা যাচাই করার সুযোগ পান না।’ (‘চর্বিতচর্বণ নয়...’, ইন্দ্রজিত্ রায়, আবাপ, ২৯-১০)
এমন সব সিদ্ধান্ত পাঠ করে সসম্ভ্রম ধারণা হয় যে, লেখক বিগত অন্তত পাঁচ বছর ধরে নির্মাণ করেছেন বাংলা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধ বিষয়ে একটি স্যাম্পল এবং সুনিশ্চিত ভাবে তাঁর এই লেখায় ‘ক্রিপ্টোলজি’র চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে, কেননা এই সব নিশ্চিত সিদ্ধান্তের পশ্চাতে ঠারেঠোরে যা বলা হয়েছে তা বুঝে নিতে হবে, ‘যেমন এ বছর এক ম্যাগাজিনের প্রাক্-শারদীয় সংখ্যা সাড়ে সাতশো পৃষ্ঠার’। এবং ‘‘নিন্দুকেরা বলবেন, প্রাবন্ধিকরা জেনে বুঝেই ‘পুঁথির নকল’ এবং ‘নকলের নকল’ করে যান। এভাবেই তোতা পাঠককে শিক্ষা দেওয়া হয়।’’ একটু ভাবলেই বোঝা যাবে ইঙ্গিতটি। কোনও এক পত্রিকা প্রাক্-শারদীয় ‘পুথি সংখ্যা’ প্রকাশ করেছিল, তা নিয়েই এই মন্তব্য। কিন্তু, কিমাশ্চর্যম্! পুথি তো কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস। সেটা নিয়ে চর্চা করা কি ‘রি-ইনভেন্টিং দ্য হুইল’ হল?
একটি প্রবন্ধে কেন সেই বিষয়ে লেখা আগের সব প্রবন্ধের তথ্যসূত্র দেওয়া হবে না, এ প্রশ্ন শুনে বলতে ইচ্ছে করে, বঙ্কিমচন্দ্র থেকে রবীন্দ্রনাথ ঘুরে আজ পর্যন্ত বহু লেখক প্রবন্ধ লিখেছেন। সেখানে লম্বা তথ্যসূত্র দেওয়া নেই। সেই সব প্রবন্ধের একটিও, কেউ কেউ ভাবতে পারেন, ‘সার্ভে আর্টিকল’ হয়ে ওঠেনি। আর, প্রবন্ধের গুণমান? এখনকার সময়ে বাংলা প্রবন্ধ লিখেছেন আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত বহু বাঙালি লেখক। চিন্তনের ক্ষেত্রে বাংলা প্রবন্ধ-সাহিত্যের যে বিকাশ, তা কলকাতা মফস্সল ও বাংলাদেশের অজস্র ছোট পত্রপত্রিকার পরম্পরা ও ঐতিহ্যের জন্যই সম্ভব হয়েছে। অবশ্যই সব প্রবন্ধই সমমানের হয় না, হতে পারে না। কোনও কোনও পত্রিকার ক্ষেত্রে এই সব প্রবন্ধ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে বা সদ্য-গবেষক বা সদ্য-নিযুক্ত শিক্ষকদের পদোন্নতির অভিলাষে ইন্ধনের কারণেও হতে পারে। কিন্তু এ সব ক্ষেত্রেও ভাল প্রবন্ধ একেবারেই লেখা হয় না, কী ভাবে বোঝা গেল? আবার তার বাইরেও বিভিন্ন বিষয়ে যে-সব অসাধারণ প্রবন্ধ আমরা পড়তে পারছি এবং সেই সব প্রবন্ধের পাঠকও যে বেড়েছে, তার বড় প্রমাণ, এখন দৈনিক সংবাদপত্রেও এক জন প্রবন্ধকারের একটি বিষয় নিয়ে প্রবন্ধ ধারাবাহিক ভাবে ছাপা হয়।
বস্তুত, শুধু মফস্সল নয়, ত্রিপুরা, বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন ছোট পত্রিকায় আজও যে গুণমানের লেখালিখি হয়, সেটা ঋদ্ধিমান পাঠকের কাছেও আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। এ অতি পুরনো ঐতিহ্য। ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় কখনও কখনও এমন সব পত্রিকার কথাও লেখা হয়েছে। সেখানে ছাপা ও বাঁধাই-এর অসামর্থ্যের কথার সঙ্গে রাজশাহি থেকে প্রকাশিত ‘জ্ঞানাঙ্কুর’ পত্রিকা সম্পর্কে বলা হয়েছিল— ‘জ্ঞানাঙ্কুর/সাহিত্য-দর্শন-ইতিহাস সম্বন্ধীয় মাসিক পত্র। রাজশাহী প্রেস।।’ —দেখা যাইতেছে যে লেখকেরা কৃতবিদ্য, চিন্তাশীল ও লিপিপটু। ভরসা করি পত্রিকাটি স্থায়ী হইবে।’ (বঙ্গদর্শন রচনা সংগ্রহ, পৃ: ১৯৮) এই প্রসঙ্গে এ কালের হিসেব কষতে বসলে যেমন নানা উদাহরণের কথা আসে, যেমন ‘প্রমা’ ও ‘বিভাব’, কিংবা সদ্য প্রয়াত সমীরণ মজুমদার সম্পাদিত ‘অমৃতলোক’ পত্রিকাটির কথাও বলা যায়। যাঁরা ছোট পত্রিকার সম্পাদকদের আত্মত্যাগ ও অবদানের কথা ভাবতেই পারেন না, তাঁদের কাছে এ সব নিরর্থক মনে হতেই পারে। কে এই সব ছোট পত্রিকার সম্পাদকদের মাথার দিব্যি দিয়েছিল, ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে? অথচ এ কথাই তো বলা হয়ে থাকে, এই সব ছোট পত্রিকাই নাকি বাংলা সাহিত্যের বীজতলা!
‘চর্বিতচর্বণ’ আর একটি শব্দ, যার ব্যাখ্যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দান্তের ইনফার্নো, পুরগাতোরিও ও ডিভিনা কমেডিয়া, শেক্সপিয়ার-এর নাটক বা রবীন্দ্ররচনাকে কি চর্বিতচর্বণ বলা যায়? বার বার পড়লে বা গাইলেও তা চর্বিতচর্বণ হয় না। কিন্তু এমন অনেক বিষয় আছে যা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে থাকে। যেমন অর্থনীতি, মাস কালচার, মিডিয়া স্টাডি ইত্যাদি। প্রতিনিয়ত নতুন তথ্যের সাহায্যে সে-সব বিষয় নিয়ে ভাবতে হয়। সাহিত্য সংস্কৃতি নিয়ে ভাবনাচিন্তাও তার বাইরে নয়। উমবের্তো একো তাঁর অ্যাপক্যালিপস্ পোস্টপোন্ড প্রবন্ধ সংগ্রহের একটি লেখায় এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তৃত ভাবে লিখেছেন। কোন লেখা পুনর্বিবেচনা ও সংস্করণ করা দরকার এবং কোন লেখার কেবল পুনর্মুদ্রণই যথেষ্ট, এ প্রসঙ্গে তিনি এক দিকে ধ্রুপদী সাহিত্যকে রেখেছেন, অন্য দিকে সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা ও অন্যান্য বিষয়। সংস্কৃতি ও সাহিত্য-বিষয়ক রচনা সর্বদাই সংস্করণযোগ্য বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন। সমাজ ও সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই সময়ের পাঠক যদি অনেক বেশি করে প্রবন্ধের প্রতি অনুরক্ত হয়ে থাকেন, যদি আবার একটা ‘এজ অব রিজন’-এর আবির্ভাব হয়, সেটা তো বাঙালির আবেগসর্বস্বতা থেকে মুক্তি এবং যুক্তি-বুদ্ধির উন্নতির অন্যতম প্রলক্ষণ!
সম্প্রতি ইতিহাসবিদ, শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দীপেশ চক্রবর্তী কথায় কথায় বলছিলেন, যে কোনও লেখক বা শিক্ষকের উচিত ব্যক্তিগত অভিমতের সঙ্গে সত্যকে একীভূত না করা। সব সময় এটাই বলা বা লেখাটা ঠিক যে, ‘এটি আমার মত, কিন্তু এই মতটি যে সত্য, সেটা নাও হতে পারে।’ দুঃখের বিষয়, অনেক শিক্ষক ও লেখক অধিকাংশ সময়ে নিজের মতকেই সত্যের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন।