E-Paper

ক্ষয়

সরকারি ব্যয় যদি নির্বাচনের ক্যালেন্ডারের সঙ্গে বাঁধা পড়ে— প্রকল্পের বরাদ্দ, কাজের গতি, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সম্প্রসারণ, সবই যদি ভোটের আগে ‘দেখানো’র জন্য থমকে থাকে— তবে উন্নয়নের স্বাভাবিক গতি বাধাপ্রাপ্ত হয়।

শেষ আপডেট: ০১ এপ্রিল ২০২৬ ০৬:০৫

গণতন্ত্রে রাষ্ট্র এবং নাগরিকের সম্পর্কের ভিত্তি হওয়ার কথা অধিকার। রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি দাবি করার অধিকার, নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রের নীতিগত দায়বদ্ধতার অধিকার, এবং ধারাবাহিক উন্নয়নের অধিকার। এই সম্পর্কের ভিত্তি সমতা— রাষ্ট্র এবং নাগরিক একই ব্যবস্থার দুই সমান অংশীদার। কিন্তু নির্বাচনের মুখে বিভিন্ন রাজ্যে যে বিপুল কল্যাণ-ব্যয়ের ঢল নামছে, তাতে স্পষ্ট যে, রাষ্ট্রের পরিচালকরা সচেতন ভাবে এই সম্পর্ককে অস্বীকার করতে চান। ভোটারকে নাগরিক হিসাবে নয়, ‘সুবিধাভোগী’ হিসাবে দেখার প্রবণতা ক্রমশ স্পষ্ট— তাঁদের চোখে এই সম্পর্কটি সমতার নয়, তা চরিত্রে ‘পেট্রন-ক্লায়েন্ট’ অর্থাৎ ‘পৃষ্ঠপোষক-অনুগৃহীত’-র সম্পর্ক। পাঁচটি রাজ্যে ভোটের আগে ৩৭ হাজার কোটিরও বেশি টাকার নতুন বা বর্ধিত প্রকল্প ঘোষণা, বরাদ্দ বা বিতরণ হয়েছে; গত এক মাসেই ২০ হাজার কোটির বেশি টাকা সরাসরি নগদ প্রত্যক্ষ হস্তান্তর হয়েছে। আদর্শ নির্বাচনী আচরণবিধি জারির ঠিক আগে এই হস্তান্তরের কৌশলগত কারণটি বুঝতে সমস্যা হয় না। ক্রমশ এই কল্যাণ-ব্যয়ের প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠছেন মহিলা-ভোটার। লক্ষ্মীর ভান্ডারের রাজনৈতিক উপযোগিতা গোটা দেশের রাজনীতিকে এই পথে চালিত করেছে। নারীর সামাজিক ও আর্থিক ক্ষমতায়নের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই; রাষ্ট্রের তা নিশ্চিত করাই কর্তব্য। কিন্তু সেই ক্ষমতায়নকে যদি ভোট কেনার ভাষ্যে নামিয়ে আনা হয়, তা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। মহিলাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে কেবল ভাতার অঙ্কে সীমাবদ্ধ ধরে নেওয়া শুধু অবমাননাকর নয়, তা গণতান্ত্রিক ভাবনাকেও সঙ্কুচিত করে। নারী-ভোটারও কর্মসংস্থান, মূল্যবৃদ্ধি, নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক মর্যাদা— এই সব প্রশ্নে সমান ভাবে চিন্তিত। তাঁদের রাজনৈতিক বিবেচনাকে ‘সর্বোচ্চ দাতা’ খোঁজার সহজ অঙ্কে নামিয়ে আনা বিপজ্জনক সরলীকরণ।

আরও একটি কথা ভেবে দেখার। সরকারি ব্যয় যদি নির্বাচনের ক্যালেন্ডারের সঙ্গে বাঁধা পড়ে— প্রকল্পের বরাদ্দ, কাজের গতি, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সম্প্রসারণ, সবই যদি ভোটের আগে ‘দেখানো’র জন্য থমকে থাকে— তবে উন্নয়নের স্বাভাবিক গতি বাধাপ্রাপ্ত হয়। রাস্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সেচ, সামাজিক অবকাঠামো, সব ক্ষেত্রেই ধারাবাহিক ব্যয়ের প্রয়োজন। সেখানে নির্বাচনের আগে আচমকা বিপুল অর্থসংস্থান এবং অন্য সময়ে ব্যয়-শ্লথতা উন্নয়নের মূল দর্শনকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। সরকারের প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত উন্নয়নকে ধারাবাহিক রাখা; ভোটের সুবিধা অনুযায়ী ব্যয় নির্ধারণ নয়। উন্নয়ন যদি রাজনৈতিক মুনাফার সময়সূচির সঙ্গে বাঁধা পড়ে, তবে নাগরিকের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যদি ব্যয়ের প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে ভোট-আচরণে তাৎক্ষণিক প্রভাব সৃষ্টি করা, তবে তা উন্নয়নের পক্ষে স্পষ্টতই প্রতিকূল।

কল্যাণমূলক প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা প্রশ্নাতীত। প্রশ্ন তার রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়ে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু নির্বাচনের অব্যবহিত আগে এই সব প্রকল্পকে ‘উপহার’, বা ‘সহায়তা’ হিসাবে তুলে ধরা হলে অধিকারকে ইচ্ছাকৃত ভাবে অনুগ্রহে রূপান্তরিত করা হয়। নাগরিক তখন আর অধিকার-সচেতন রাজনৈতিক সত্তা নন; তিনি হয়ে ওঠেন প্রাপক। সুবিধাভোগী। আর সেই প্রাপ্তির বিনিময়ে তাঁর ভোট যেন এক ধরনের প্রত্যাশিত প্রতিদান। এখানেই গণতন্ত্রের সবচেয়ে মারাত্মক ক্ষতি। কারণ সেখানে নাগরিক নিজের গণতান্ত্রিক মূল্যও হারান। তাঁর শক্তি প্রশ্ন করার ক্ষমতায়, জবাবদিহি দাবি করার অধিকারে। কিন্তু যখন তিনি নিজেকে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকের ‘ক্লায়েন্ট’ হিসেবে মেনে নেন, তখন সেই শক্তি হ্রাস পায়। ক্ষতিটা শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজেরই। কারণ সেখানে রাষ্ট্র আর জনগণের যৌথ প্রতিষ্ঠান থাকে না; তা পরিণত হয় নেতা-নির্ভর বণ্টন ব্যবস্থায়। সে ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত নাগরিকের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের অনুকূল হতে পারে না।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

West Bengal Assembly Election West Bengal government government projects

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy