বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নে ভ্রাম্যমাণ নাগরিকের সংখ্যা এক কোটি সত্তর লক্ষ। ভ্রাম্যমাণ, অর্থাৎ যাঁহারা স্বদেশের পরিবর্তে ইউরোপের অপর কোনও দেশে বাস করেন। ব্রিটেনের ৩৭ লক্ষ ভ্রাম্যমাণকে বাদ রাখিলেও হিসেব বলিবে, গত এক দশকে সংখ্যাটি দ্বিগুণ হইয়াছে, এবং কর্মরত জনতার চার শতাংশ এই রূপ। ভূরাজনীতি নূতন অবয়ব পাইবার কারণ এক দশক যাবৎ অবাধ চলাচল। ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলির বহু নাগরিকই বিষয়টিকে সরল করিয়া লইয়াছেন— অনায়াসে বাড়ি বদলাইতেছেন, কিন্তু নিজেকে বারংবার নূতন দেশে নথিভুক্ত করাইতেছেন না। অনীহার পশ্চাতে প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতাও একটি কারণ। ইহাতে সঙ্কটও উপস্থিত। সরকারি বইয়ে হিসাব না থাকিবার ফলে বিপুলসংখ্যক জনতাকে ধারণ করিবার প্রশাসনিক ব্যবস্থা নাই। অতএব, সংখ্যায় বহু হইয়াও ইঁহাদের রাজনৈতিক স্বর বস্তুত অনুপস্থিত। স্মরণে রাখা ভাল, ভ্রাম্যমাণ জনসংখ্যা নেদারল্যান্ডস কিংবা বেলজিয়ামের সমগ্র জনসংখ্যা অপেক্ষা অধিক। প্রতিনিধিত্বের সুযোগ থাকিলে ২৬ জন সদস্যকে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে প্রেরণ করা সম্ভব হইত।

চার শতাংশ আপাতদৃষ্টিতে বেশি কিছু নহে। কিন্তু ইউরোপের ইতিহাসে তাহাকে কম বলা চলে না। কারণ শ্বেতাঙ্গদের আদি মহাদেশে আপন দেশের গর্বে উদ্ধত হওয়াই দস্তুর। সেই স্থলে প্রাত্যহিক কুড়ি লক্ষ নাগরিকের সীমান্ত পার করিবার প্রবণতা নূতন বইকি। নূতনত্বের কারণ কী? প্রথমত, চাকুরির অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক সঙ্কট। সেই কারণেই প্রতি দিন কয়েক লক্ষ স্বল্প বেতনের কর্মচারী সীমান্ত পার হন। তাঁহারা নিয়মিত চাকুরি বদলাইতে থাকেন। দ্বিতীয়ত, অবাধ গতিবিধি ও মুক্ত সীমান্ত। উদাহরণ: স্পেনীয় ড্রাইভিং লাইসেন্স লইয়া বেলজিয়ামে কর্মরত রোমানীয় উব্‌র চালক, ইটালীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি লইয়া জার্মানিতে কর্মরত গ্রিক চিকিৎসক, কিংবা ব্রিটেনে পৌঁছাইয়া মলডোভানকে বিবাহ করা বুলগেরীয় ফলবিক্রেতা। উদাহরণগুলি প্রমাণ করে, এক নূতন ধরনের ইউরোপীয় সমাজ তৈয়ারি হইতেছে, যাহার অবয়ব পূর্বে কেহ দেখে নাই।

তবু, ২৮টি দেশের এই বিপুল জনসংখ্যা আজও সেই সকল দেশেরই হইয়া আছে, মহাদেশের হইতে পারে নাই। যাঁহারা মনে-প্রাণে-রক্ত-মাংসে সর্বাধিক ‘ইউরোপীয়’, তাঁহাদের স্বীকৃতিই নাই। খেদের বিষয়, ইহার উল্টাই হইবার কথা ছিল। আন্তর্জাল আপন মায়ায় সমগ্র দুনিয়া বাঁধিয়াছে। যন্ত্রের কল্যাণে বহু মানুষ আজ বিশ্ব নাগরিক। কিন্তু একটি মহাদেশ বাস্তবে তাহা করিয়া দেখাইবার পরেও সেই ইউরো-নাগরিকদের মঞ্চ মিলিতেছে না। যাহা সাংস্কৃতিক বিনিময় তথা উদারমনস্কতার উপযুক্ত বিজ্ঞাপন হইতে পারিত, তাহা কেবল কতকগুলি দেশের সমষ্টিতে পর্যবসিত হইয়াছে। এই নাগরিকদের অভিযোগ, ইউরোপীয় পার্লামেন্ট এক একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সঙ্কটের আলাপের মিলনস্থল হইয়াছে, অথচ ইহার রাজনৈতিক ভাষ্যটি সমগ্র মহাদেশের হওয়া বিধেয়। বৃহত্তর প্রশ্নটি হইল, এই রূপ গোষ্ঠীর উপস্থিতি সত্ত্বেও একটিমাত্র দেশে বাস করা নাগরিক তথা রাজনীতিবিদদের কেন সমগ্র ইউরোপের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করিবার দায়িত্ব অর্পণ করা হইতেছে? ইহা কি ছক ভাঙিবার অনীহা? প্রশ্নের উত্তর খুঁজিতে হইবে মহাদেশের নাগরিকদেরই।