অতি-আইনকেন্দ্রিক সমাজের ধারণাটি বিপজ্জনক। যে আইনগুলি পূর্বেই ছিল, তাহা যদি কোনও একটি বিশেষ অপরাধকে ঠেকাইতে কার্যকর না হয়, তবে তাহা কেন হয় না, গোড়ায় সেই প্রশ্নটি করা বিধেয়। গণনিগ্রহের ক্ষেত্রেই যেমন। যূথবদ্ধ ভাবে কোনও এক জনকে পিটাইয়া মারিলে তাহার শাস্তির ব্যবস্থা ভারতীয় দণ্ডবিধিতে আছে। খুন, অসৎ উদ্দেশ্যে জমায়েত হওয়া, হত্যায় উস্কানি দেওয়া— সবই ভারতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাহা হইলে গণনিগ্রহে যুক্তদের এই ধারাগুলিতে শাস্তি হয় না কেন? তাহার প্রথম এবং প্রধান কারণ প্রশাসনিক অনীহা। বহু ক্ষেত্রে পুলিশ যথেষ্ট উদ্যোগী হয় না; বহু ক্ষেত্রে রাজনীতি আসিয়া পুলিশের হাত বাঁধিয়া দেয়। সর্বোপরি, দেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবেশ এমনই যে গণনিগ্রহের ঘটনাগুলি কার্যত বৈধ হইয়া উঠিয়াছে। এই ব্যাধিগুলির সম্যক চিকিৎসা ব্যতিরেকে নূতন গণনিগ্রহ বিরোধী আইন প্রণয়ন করিলেই কি এই বীভৎস প্রবণতাটি কমিবে? শীর্ষ আদালতের প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা বজায় রাখিয়াও এই প্রশ্নটি করা বিধেয়। 

পৃথক আইনের পক্ষে যদি একটি অকাট্য যুক্তি থাকে, তবে তাহা এই রূপ— গণনিগ্রহ কোনও সাধারণ অপরাধ নহে। তাহা শুধু লাঞ্ছিত ব্যক্তির শারীরিক বা মানসিক হেনস্থা নহে, প্রাণহানি নহে— ব্যক্তি এই অপরাধের আপাত-শিকার মাত্র, এই ঘৃণার মূল লক্ষ্য গোষ্ঠী। পশ্চিমবঙ্গের গণনিগ্রহ বিরোধী বিলে বলা হইয়াছে: ধর্ম, বর্ণ, জাত, লিঙ্গ, জন্মস্থান, ভাষা, খাদ্যাভ্যাস, যৌনতা, রাজনৈতিক মত ইত্যাদি পরিচিতিকে কেন্দ্র করিয়া যে গণ-হিংস্রতা ঘটে, তাহাই লিঞ্চিং বা গণনিগ্রহ। অর্থাৎ, এই অপরাধ কোনও বিশেষ জনগোষ্ঠীর বিপক্ষে। ‘ছেলেধরা’-নিগ্রহের ন্যায় আপাত-গোষ্ঠীনিরপেক্ষ হিংস্রতার ঘটনাতেও সামান্য ভাবিলেই এই গোষ্ঠীর সন্ধান মিলিবে— প্রায় সর্ব ক্ষেত্রেই ‘ছেলেধরা’ চিহ্নিত হয় কোনও না কোনও পরিচিতির ভিত্তিতে। কাজেই, গণনিগ্রহ প্রকৃত প্রস্তাবে গোষ্ঠীবিশেষের প্রতি সুতীব্র বৈষম্যমূলক আচরণ, যাহা ভারতীয় সংবিধানের পরিপন্থী। অথচ, এই বৈষম্যমূলক আচরণকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গণ্য করিবার মতো আইন বলিতে আছে কেবলমাত্র ১৯৫৫ সালের সিভিল রাইটস অ্যাক্ট— যাহাতে নিগৃহীতকে প্রমাণ করিতে হয় যে তাঁহার বিরুদ্ধে ঘটা অপরাধটির মূলে আছে অস্পৃশ্যতা। ভারতের বর্তমান পরিস্থিতিতে এই আইনটি সম্ভবত যথেষ্ট জোরালো নহে। ফলে, এমন একটি আইনের প্রয়োজন ছিল, যাহা গণনিগ্রহকে আইন-শৃঙ্খলার প্রশ্ন হিসাবে নহে, সংবিধানের বিরুদ্ধে অপরাধ হিসাবে দেখিবে। এই যুক্তিতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকাটি অতি জরুরি। বিশেষত এই সময়ে, যখন কেন্দ্রীয় শাসকরা গণনিগ্রহ প্রতিরোধে দৃশ্যত ততখানি আগ্রহী নহেন।

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর অতি দ্রুত আইন প্রণয়ন করায় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সাধুবাদ প্রাপ্য। বামপন্থীরা এই বিলটিকে সমর্থন করিয়াছেন, কংগ্রেসও। এই রাজনৈতিক ঐকমত্যও গণতন্ত্রের পক্ষে সুসংবাদ। বিজেপি বিরোধিতা করিয়াছে। কেন, সেই কারণটি অনুমান করা চলে। দুইটি প্রশ্ন অবশ্য থাকিয়া যায়। এক, এই রাজ্যে পুলিশ-প্রশাসন যে ভাবে রাজনৈতিক চাপের নিকট আত্মসমর্পণ করিয়া আছে, এই নূতন আইনও কি কার্যকর হইতে পারিবে? এই গৌণ প্রশ্নটির উত্তর রাজ্যের শাসকদেরই খুঁজিতে হইবে। মুখ্য প্রশ্ন হইল, আইনটি কঠোর হওয়া অতি জরুরি, কিন্তু প্রাণদণ্ডই কি সেই কঠোরতার মাপকাঠি? গণনিগ্রহ অতি নৃশংস অপরাধ, সন্দেহ নাই। কিন্তু ভারতীয় বিচারব্যবস্থার দর্শন বলে, শুধুমাত্র বিরলের মধ্যে বিরলতম অপরাধের ক্ষেত্রেই প্রাণদণ্ড বিধেয়। আইন রূপায়ণের অত্যুৎসাহে এই নৈতিক অবস্থানটি লঙ্ঘিত হইল কি না, ভাবা প্রয়োজন।