• জয়দীপ বিশ্বাস
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

অধিকার কাড়ার পাকা ব্যবস্থা

অসম দেখাচ্ছে, সহ-নাগরিকদের প্রতি কতটা নির্মম হওয়া যায়

NRC

দীর্ঘ ছ’বছরের রক্তক্ষয়ী বিদেশি বিতাড়ন আন্দোলনের পরিসমাপ্তি ঘটেছিল অসম চুক্তিতে। ১৯৮৫’র ১৪ অগস্ট মধ্য যামিনীতে স্বাক্ষরিত সেই শান্তিচুক্তি রাজ্যে স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে এনেছিল বটে, কিন্তু তাতেই স্পষ্ট ছিল ভবিষ্যৎ বিভাজনের ইঙ্গিত।

আন্দোলনের দাবি ছিল, ১৯৫১ সালকে ভিত্তিবর্ষ ধরে অসমে নাগরিকত্ব স্থির হবে। তবে সারা অসম ছাত্র সংস্থা (আসু)-র পক্ষে তখন বাড়তি দরদামের ক্ষমতা ছিল না। ফলে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গাঁধীর উপস্থিতিতে প্রফুল্ল কুমার মহন্ত ও ভৃগু ফুকনরা ১৯৭১-এর ২৪ মার্চ মাঝরাতকেই বিদেশি চিহ্নিতকরণের ভিত্তি হিসেবে মেনে নেন।

সেই সময়কার বিজয়-উল্লাসের মাঝে ভারতীয় গণতন্ত্র লক্ষই করেনি যে, অসম চুক্তিকে জড়িয়ে রাজ্যে তৈরি হওয়া সাধারণ ইচ্ছাপত্রে বাঙালিদের কোনও প্রতিনিধিত্ব রাখা হয়নি। অথচ, সরকারি ভাবে বিদেশি বিতাড়ন হলেও অসম আন্দোলন কার্যত বাঙালি-বিরোধিতার চেহারা নেয়। অমলেন্দু গুহ এবং হীরেন গোঁহাইয়েরা তাঁদের লেখাপত্রে এই আপাত গণজাগরণের মধ্যে উগ্র জাত্যভিমানের স্পষ্ট উপস্থিতি টের পান। লোকসভায় তখন গিজগিজ করছেন চারশোর বেশি কংগ্রেসি সাংসদ। দলের অবিসংবাদী নেতা সদ্য মাতৃহারা রাজীব। সেই সময়ের প্রায় বিরোধী-হীন ভারতীয় রাজনীতিতে অসমের ভাষিক সংখ্যালঘুদের স্তিমিত ও ত্রস্ত স্বর শোনার মতো উদার, সংবেদনশীল পরিসর কোথায়!

সেই ঘটনার সাড়ে তিন দশক পর আবারও দেশের রাজনীতিতে অস্তমিত বিরোধী শক্তি এবং অস্ফুট বিরুদ্ধ স্বর। বিপুল জনাদেশে দেশ শাসন করছে বিজেপি। সংখ্যাগুরুবাদের এই রমরমার দিনেই গত বছর জুলাই মাসের মাঝামাঝি কেন্দ্রীয় সরকার চোদ্দো সদস্যের এক উচ্চ পর্যায়ের কমিটি তৈরি করে দেয়। উদ্দেশ্য, অসম চুক্তির ৬ নম্বর ধারা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রদান করা। কমিটির শীর্ষে আসীন গুয়াহাটি উচ্চ আদালতের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিপ্লব কুমার শর্মা।

অসম চুক্তির ৬ নম্বর ধারায় ছিল, অসমিয়াদের সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও ভাষিক আত্মপরিচয় এবং ঐতিহ্যের সংরক্ষণ ও প্রসারে সাংবিধানিক, বিধিবদ্ধ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বেশ বোঝা যায় যে, এই সব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হলে রাজ্যের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চেহারা এবং বহুভাষিক চরিত্রটি অক্ষুণ্ণ থাকবে না। দ্বিতীয়ত, এই কমিটি গঠনের মধ্যেই গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের অভাব রয়েছে। গোড়া থেকেই অভিযোগ যে, কমিটিতে বাঙালি এবং অন্যান্য অ-অসমিয়া গোষ্ঠীর কোনও প্রতিনিধি রাখা হয়নি। অর্থাৎ, মূল চুক্তি প্রণয়নের বেলায় যা ঘটেছিল, এ বারও তার কোনও ব্যত্যয় হয়নি। এই রাজ্যের রাজনীতিতে এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার বণ্টনে নিয়ামক শক্তি হিসেবে ভাষিক সংখ্যালঘুরা ভূমিকাহীন। যদিও অসম চুক্তিটি কংগ্রেস দলের কপিরাইট, ওই বৈষম্যমূলক ৬ নম্বর ধারাটি নিয়ে রাজীব গাঁ  ধীর উত্তরসূরিরা কখনও নাড়াচাড়া করতে চাননি। রাজ্যে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও জাতীয়তার মধ্যে ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতার স্বার্থেই সম্ভবত কংগ্রেস কখনও অসমিয়াদের জন্য সংরক্ষণের দিকে যায়নি।

বিজেপি ক্ষমতায় এসে এনআরসি এবং পরে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন পাশ করে সেই সামাজিক ভারসাম্যটি নাড়িয়ে দিয়েছে। এনআরসি-ছুট হিন্দু বাঙালিদের আইন সংশোধন করে নাগরিকত্ব-সহ রাজ্যে স্থায়ী বসবাসের সুযোগ করে দেওয়া হবে, এমন ঘোষণায় প্রত্যাশিত ভাবেই অসমিয়া জাতীয়তাবাদী শিবির রুষ্ট হয়। অথচ হিন্দু ও অসমিয়া জাতীয়তাবাদের ফলেই অসমে বিজেপির বাড়বাড়ন্ত। অসমিয়া জাতীয়তাবাদের যন্ত্রণা প্রশমনে তাই প্রলেপ হিসেবেই অসম চুক্তির ছ’নম্বর ধারা পীড়া-নিবারক নিদান।

ছ’নম্বর ধারার অধীনে ঢালাও সুরক্ষা ও সংরক্ষণ বিতরণের জন্য প্রথম যা জরুরি, তা হল সুবিধাপ্রাপক অর্থাৎ অসমিয়া কারা, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বার করা। বিগত কংগ্রেস সরকারের শাসনকালের শেষের দিকে বিধানসভার অধ্যক্ষ প্রণব কুমার গগৈ ১৯৫১ সালকে ভিত্তিবর্ষ ধরে অসমিয়া জাতিকে চিহ্নিত করেন। প্রণব কুমার গগৈ’র সেই অত্যুৎসাহে জল ঢেলে দেন তরুণ গগৈ। ২০১৫ সালের ৩১ মার্চ বিধানসভায় কংগ্রেস দল প্রণববাবুর প্রস্তাব বাতিল করে দেয়। ছ’জন বিধায়ক নিয়ে বিজেপি সে দিন অধ্যক্ষকে সমর্থন করে, আর কিছু করার ক্ষমতা তাঁদের ছিল না।

তবে এ বার বিজেপি সরকারের নিয়োগ করা উচ্চ পর্যায়ের কমিটি বিনা দ্বিধায় ১৯৫১-কেই ভিত্তিবর্ষ হিসেবে গ্রহণ করে নেয়। গত ফেব্রুয়ারিতে  কমিটির প্রতিবেদন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। আজ অবধি সরকারি ভাবে প্রতিবেদনটি খোলসা হয়নি। কিন্তু আসু গত ১১ অগস্ট সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে রিপোর্ট ফাঁস করে দেয়। মাত্র ছ’মাস অপেক্ষা করতে না পেরে অধৈর্য হয়ে আসু এমনটা করেছে, তা বলা যায় না। প্রসঙ্গত মনে রাখি, আগামী বছরে বিধানসভা নির্বাচন।   

ফাঁস হওয়া প্রতিবেদনের নির্যাস এটাই যে, অসমিয়া এবং আদি বাসিন্দা বা ‘খিলঞ্জিয়া’ না হলে অসমে কোনও ভারতীয় নাগরিকের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক অধিকারই থাকছে না।

গত ডিসেম্বরে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে যখন উত্তাল অসম, তখন প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন, শর্মা কমিটির প্রতিবেদন হুবহু রূপায়িত হবে। প্রতিশ্রুতি শুনিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও। এই প্রতিবেদন তাই কেন্দ্রীয় সরকার গ্রহণ করতেই পারে। এতে আছে, অসমে বিধানসভা এবং লোকসভা আসনের ৮০-১০০ শতাংশই অসমিয়াদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। বিধান পরিষদ গঠন হলে সেখানে ১০০ শতাংশ আসনে শুধু অসমিয়ারাই বসবেন।  

কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্য সরকারের তৃতীয় ও চতুর্থ বর্গের চাকরির বেলায়ও ওই একই সংরক্ষণ। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যদি পিপিপি আদলে রাজ্য সরকারের সমঝোতা হয়ও, তাতে নিয়োগের বেলায় সত্তর থেকে একশো শতাংশ সংরক্ষণ থাকবে অসমিয়াদের জন্য। জমির মালিকানায় নিরঙ্কুশ আধিপত্য থাকবে অসমিয়াদের। এই সমস্ত ব্যবস্থাপত্রে সাংবিধানিক অনুমোদনও থাকবে। 

হ্যাঁ, সাংবিধানিকতার প্রশ্ন তো অনিবার্য ভাবেই উঠবে। একটি রাজ্যের সংখ্যাগুরুদের সংরক্ষণ দেওয়া হলে নিশ্চিত ভাবেই ১৫(৪) এবং ১৬(৪) অনুচ্ছেদ লঙ্ঘিত হওয়ার কথা। তা ছাড়া, প্রশ্ন দাঁড়াবে, একটি জাতি বা গোষ্ঠী হিসেবে অসমিয়ারা যে সরকারি চাকরিবাকরি, প্রতিনিধিত্ব, জমির মালিকানা, ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদিতে পিছিয়ে পড়ছেন, এর প্রমাণ কোথায়? অসমিয়া ভাষা, সংস্কৃতি যে বিপন্ন, সেই প্রমাণই বা কোথায়?

সমস্যা রয়েছে নাগরিকত্ব প্রশ্নেও। এনআরসি যদি শেষে কার্যকর হয়, তা হলে তো ১৯৭১-এর ২৫ মার্চের আগে যাঁরা এই রাজ্যের বাসিন্দা ছিলেন, তাঁরা সবাই নাগরিকত্বের হকদার হবেন। অর্থাৎ, অসম চুক্তি মতেই নাগরিকত্বের শংসাপত্র দেওয়া হবে। সমস্ত রাজনৈতিক দল-সহ আসু-র মতো জাতীয়তাবাদী সংগঠনেরও এতে আপত্তি হবে না।

কিন্তু কী আশ্চর্য! ওই অসম চুক্তিরই অন্য একটি ধারার কবলে গিয়ে এক অতি-নাগরিক বা সুপার সিটিজ়েন শ্রেণির জন্ম হবে। যাঁরা ১৯৫১-র ১ জানুয়ারিতে অসমে থাকার প্রমাণ দিতে পারবেন, তাঁরা রাজ্যের যাবতীয় সম্পদের এবং রাজনৈতিক অধিকারের মালিক হবেন। বাকিদের হাতে থাকবে পেনসিল, থুড়ি ভোটদানের অধিকার শুধু। এবং এই ব্যবস্থাতেও আসু-র সম্পূর্ণ সায়! আমরা তা হলে দেখছি, অসম চুক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গিয়েছে সেই অসম চুক্তি! রাজ্যে থাকবে দুই শ্রেণির নাগরিক।

আইন নয়, এখানে ঢের বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে নৈতিকতা। নানা ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, সংস্কৃতি ও নৃতত্ত্বের মিলনভূমি এই অসমে সম্পদ ও অধিকার বাটোয়ারার সময় কেউ কি অতটা নির্মম হতে পারেন যে, সহ-নাগরিকদের ন্যূনতম সম্ভ্রম ও সুরক্ষার কথা বেমালুম ভুলে গেলেন! রাজ্যের অন্যূন এক কোটি বাসিন্দা যে এই প্রতিবেদন গৃহীত হলে ভাতে মরবেন, তা কি উচ্চ আদালতের এক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির কমিটি মনে রাখবে না! আকাশে বাতাসে কান পাতলে এখনও শোনা যায় ভূপেন হাজরিকা আর হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গলায় হারাধন-রংমন গাইছে: ‘‘তুমি নাচো বিহুনাচ আমি দিব তালি/ ঐকতানে মিলে যাব বিহুভাটিয়ালি’’।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন