দেবীপক্ষের গোড়ায় কলকাতায় নাগরিক পঞ্জি নিয়ে সভা করতে এসে অমিত শাহ একটি সত্য প্রকাশ করে ফেলেছেন। যাতে জানা গেল, বিজেপি এখন ফাঁপরে। সোজা কথায়, যাকে তারা তুরুপের তাস করার কথা ভেবেছিল, সেটা কত বড় বাঁশ হয়ে উঠেছে, অসমে এনআরসি চালু করতে গিয়ে বিজেপি তা হাড়ে-হাড়ে বুঝতে পারছে। সেই উপলব্ধি থেকেই এই রাজ্যেও বিজেপির ভোট-ব্যাঙ্কের হিসেব তালগোল পাকিয়ে যেতে পারে বলে ভয় পাচ্ছে তারা। 

সাবধানী অমিত শাহকে তাই এখানকার দলীয় নেতাদের বোঝাতে হল, এখন এনআরসি নিয়ে বেশি কথা না-বলে আগে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের (সিএবি) প্রচারে জোর দিতে হবে। মানুষকে বলতে হবে, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন চালু হওয়ার আগে এনআরসি হবে না।

কেউ ভাবতে পারেন, শারদোৎসবের সময় রাজ্যে এসে শাহ বঙ্গবাসীদের ‘চিন্তামুক্ত’ করে গিয়েছেন! কিন্তু সত্যিই কি তা-ই? নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের টোপ দিয়ে নাগরিক পঞ্জির (এনআরসি) আতঙ্ক থেকে আদৌ মুক্তি মিলতে পারে কি? না কি এটা শাক দিয়ে মাছ ঢাকার আর এক কৌশল? মূল প্রশ্ন সেখানেই।

লোকসভা ভোটের আগে বিজেপি কেন এনআরসির চাল চেলেছিল, সেটা এত দিনে সবাই বুঝে গিয়েছেন। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, অসম, ত্রিপুরার মতো সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলিতে মুসলিমদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি সহজে পুষ্টি পাবে ধরে নিয়েই 

এনআরসি-কে অন্যতম হাতিয়ার করে সঙ্ঘ-শিবির। 

তাদের দিক থেকে পরিকল্পনায় খুব ভুল ছিল, তা বলা যাবে না। ‘মুসলিম বিতাড়ন’-এর সেই আহ্বান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলাতেও ছাপ ফেলেছিল। মমতার এনআরসি-বিরোধিতাকে তখন কার্যত ‘অনুপ্রবেশকারী-তোষণ’এর জায়গায় নিয়ে যেতে অনেকটাই সফল হয়েছিল বিজেপি। 

তাই দেখা গেল, নির্বাচনের আগে বিজেপি-শাসিত অসমের খসড়া নাগরিক পঞ্জিতে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সেখানকার সাবেক বাসিন্দা লক্ষ লক্ষ বঙ্গভাষীর নাম বাদ পড়ার পরেও তাঁর নিজের 

রাজ্যে বাঙালি-ভোট এককাট্টা করতে বিজেপির বিরুদ্ধে মমতার ‘বাঙালি-বিদ্বেষী’ বলে প্রচার বিশেষ কাজে আসেনি। 

কারণ বিজেপি তখন সবাইকে বোঝাতে পেরেছিল, অসমের তালিকাটি খসড়া। চূড়ান্ত তালিকায় ‘বেছে বেছে’ মুসলিম-বিতাড়নের কাজটি সেরে ফেলা হবে! এবং পরের লক্ষ্যই হবে বাংলা। সেই হাওয়ায় সাম্প্রদায়িক বিভাজন এই রাজ্যেও ভোটে একটি বড় বিষয় হয়ে দাঁড়াল। যার ফলে প্রত্যক্ষ ভাবে ‘লাভবান’ হল বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি। নইলে তেমন মজবুত সংগঠন ছাড়াই শুধু তৃণমূলের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস আর দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তারা এখানে ১৮টি আসন পেত না।

একই ভাবে সন্দেহ নেই যে, অসমে এনআরসির চূড়ান্ত তালিকা বিজেপির প্রত্যাশিত ‘স্বপ্নপূরণ’-এ সহায়ক হলে আজ অমিত শাহকে এনআরসি নিয়ে ঢোক গিলে ভিন্ন সুরে কথা বলতে হত না। ওই তালিকা প্রকাশের আগে তাঁরা যে ভাবে বাংলায় এনআরসি করার হুমকি দিতেন, পরিস্থিতি ‘অনুকূল’ হলে তা চার গুণ বেড়ে যেত! এনআরসি নিয়ে ‘ধীরে’ চলার কৌশল লাগত না।

অসমের চূড়ান্ত নাগরিক পঞ্জি বিজেপির সযত্নলালিত হিন্দু ভোটব্যাঙ্কের ভিত নড়িয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। তারা কি আগে ভাবতে পেরেছিল, চূড়ান্ত নাগরিক পঞ্জিতে যাঁদের নাম বাদ গেল তাঁদের একটি বড় অংশই হিন্দু! তা হলে বিজেপির ‘লাভ’ কী হল? যে লক্ষ্য সামনে রেখে এনআরসি চালু করার এত তোড়জোড় সেটাই তো বুমেরাং! 

তৃণমূল শাসিত পশ্চিমবঙ্গের কথা ভিন্ন। বিরোধী রাজ্য, গোড়া থেকেই এনআরসির বিরুদ্ধে সরব, এখনও তা-ই। বস্তুত এনআরসি প্রক্রিয়ায় রাজ্যের তরফে কোনও রকম সহায়তা করা হবে না বলে ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। অন্য দিকে অসমে নাগরিক পঞ্জির হাল 

দেখার পরে বিজেপির হাতে থাকা আর এক 

পড়শি রাজ্য ত্রিপুরাতেও বাসিন্দাদের উদ্বেগ বেড়ে গিয়েছে। এর বিরুদ্ধে জনমত ক্রমে দানা বাঁধছে সেখানেও। ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেব নিজে এ ভাবে নাগরিক পঞ্জি করার বাস্তবতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।

এমন এক পরিস্থিতিতে কলকাতার সভায় নাগরিক পঞ্জি নিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ যা বলেছেন, তা কতটা যুক্তিসঙ্গত সেটি ভাবার। তিনি বলেছেন, নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল (সিএবি) পাশ হয়ে আইন কার্যকর করার আগে এনআরসি করা হবে না। আপাত ভাবে মনে হতে পারে, এ এক বিরাট আশার বাণী। 

প্রকৃতপক্ষে কি তা-ই?

সবাই জানেন, ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনে কিছু সংশোধন করতে চেয়ে ২০১৬ সালে নতুন বিল আনা হয়েছে। সেই বিল অনুযায়ী, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে চলে আসা হিন্দু-শিখ-বৌদ্ধ-জৈন প্রভৃতি অ-মুসলিম ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা এ দেশে ‘অনুপ্রবেশকারী’ নন। তাঁরা শরণার্থী। 

এখনকার আইন অনুযায়ী বিদেশ থেকে চলে আসা ব্যক্তিরা ভারতে ১১ বছর বাস করার পরেই নাগরিকত্বের জন্য বিধিসম্মত ভাবে আবেদন করতে পারেন। সংশোধনী বিলে ১১ বছরের সময়সীমা কমিয়ে ৬ বছর করার কথা বলা হয়েছে। এবং তা শুধুমাত্র অ-মুসলিমদের জন্য। অর্থাৎ, সংশোধনী কার্যকর হলে ওই সব দেশ থেকে আসা হিন্দু এবং অন্য অ-মুসলিমরা আরও কম সময়ের মধ্যে ভারতের নাগরিক হয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। সে-দিন কলকাতার সভায় খুব নাটকীয় কায়দায় অমিত শাহ বলেছেন, ‘‘এমন দিন আসতে চলেছে, যখন এক জন শরণার্থীও ভবিষ্যতে এই দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন।’’

এ পর্যন্ত না-হয়, বোঝা গেল। কিন্তু এর সঙ্গে এনআরসির সম্পর্ক কোথায় এবং কী ভাবে? নাগরিকত্ব আইন হল অন্য কয়েকটি দেশ থেকে চলে আসা অ-মুসলিমদের ভারতের নাগরিক হওয়ার বিষয়। কিন্তু এনআরসি? সেখানে তো এ দেশের নাগরিককেই নিজের ‘ভারতীয়ত্ব’ কাগজপত্র দিয়ে প্রমাণ করতে হবে। আর বংশপরম্পরার সেই সব নথি দাখিল করতে না-পারলে বা দাখিল করা 

কাগজ রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের কাছে গ্রহণযোগ্য না হলে আপনি আমি কেউ আর ভারতবাসী না-ও থাকতে পারি!

অসমে তো ঠিক এটাই ঘটেছে। আমরা যারা বংশানুক্রমে এই দেশে বাংলা, অসম, ত্রিপুরা বা অন্যত্র বসবাস করি, ভোট দিই, আয়কর দিই, ভারতীয় পাসপোর্ট আছে, চাকরি অথবা ব্যবসা করি, এনআরসি হলে আমাদের ফের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে হবে নথি দিয়ে! মুসলিমদের বেলায় চাপ আরও বেশি।

এ বার ধরা যাক, আপনার নথি নেই বা তা গ্রহণযোগ্য হল না। তা হলে? সেখানেই সিএবি-কে সামনে আনা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, এনআরসি-তে নাম বাদ গেলেও ‘চিন্তা নেই’। হাতে আছে সিএবি। 

সে ক্ষেত্রে ‘মাত্র’ ৬ বছর অপেক্ষা করলেই যাতে ভারতীয় নাগরিক হওয়ার জন্য আবেদন করা যায়, ‘জনদরদি’ বিজেপি সরকার সেই দরজা খুলে দিতে চায়! কিন্তু মধ্যবর্তী এই ৬ বছর? আপনার অবস্থান কোথায়? আপনি তো তখন না ভারতের, না ‘অনুপ্রবেশকারী’! নাগরিক অধিকার, বাড়ি, সম্পত্তি, চাকরি, ব্যবসা যাঁর যা আছে সব অনিশ্চিতের গহ্বরে। তার পরে কত দিনে সেই ‘নাগরিকত্ব’ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে, সেটাই বা কে বলতে পারে! বস্তুত অসমে নাগরিক পঞ্জি থেকে বাদ যাওয়াদের ভবিতব্য কোথায় দাঁড়িয়ে, সে উত্তর এখনও সরকার দিয়ে উঠতে পারেনি।

সেই উত্তর যত দিন না আসে, তত দিন সিএবি, এনআরসি সব আলোচনাই অর্থহীন। এ সব ভাবের ঘরে চুরি কোনও সমাধান নয়।