সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

লকডাউন একসূত্রে বেঁধেছে সহস্র মনকে

সব মন্দের একটা ভাল দিক থাকে। পারস্পরিক নানান অনৈক্যে আমাদের দেশ তথা জাতির সংহতির বাঁধনটা অনেকটাই শিথিল হয়ে পড়েছিল। সঙ্কটাপন্ন দেশবাসীর মন এই প্রথম একই দুর্ভাবনাসূত্রে একসঙ্গে গাঁথা পড়েছে। মারণ ভাইরাসের সঙ্গে লড়াইয়ে সবাই এক। লিখছেন কাজী নুদরত হোসেন

Lockdown

মার্চের ৪ তারিখ। অসহনীয় এক দুঃসময়ের আবর্তে আটকা পড়েছি আমরা। আচমকা এক অচেনা ঝড় আছড়ে পড়েছে বিশ্বমানুষের সমাজে। তার অবিচ্ছিন্ন অংশ হিসেবে আমরাও বিপন্ন। সভ্যতার মদগর্ব আজ ঘুরে-ফিরে মানুষকেই উপহাস করছে। অত্যাধুনিক মারণাস্ত্রে সজ্জিত একুশ শতকের মানবকুল জীবনের নিরাপত্তাহীনতায় কাঁপছে। ঘরে বাইরে,দেশ দুনিয়ার সর্বত্র। নিজেদেরই মজুত করা পারমানবিক বোমায় নিমেষে বিনাশ হওয়ার ভ্রূকুটি আজকের বিশ্বমানবকে কখনো বিচলিত করেনি। মহাজাগতিক উল্কাপাতের সম্ভাব্য আঘাত থেকেও বিশ্বকে বাঁচিয়ে দেবেন বিজ্ঞানীরা, এই আত্মবিশ্বাসে মানুষ নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছে। আজ হঠাৎ কোনো দুঃস্বপ্নে যেন ঘুম গেছে ছুটে। আতঙ্ক তাড়া করে বেড়াচ্ছে কমবেশি দুশোটি রাষ্ট্রের সাড়ে সাতশো কোটিরও বেশি মানুষকে।

বিশ্ব পরিবেশের অন্যায় দখলদারিত্বের অহমিকায় অন্ধ হয়ে থেকেছে মানব প্রজাতি। কিন্তু প্রকৃতিতে তার সুস্থিতির ভিত্তিটা যে কত নড়বড়ে, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে আণুবীক্ষণিক এক ভাইরাস প্রজাতি। দেশে দেশে অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রের সম্ভার সংশ্লিষ্ট দেশবাসীর আত্মরক্ষা বা আসন্ন বিপদ প্রতিহত করার কোনো কাজেই লাগছে না। আন্তর্জাতিক বিশ্বে অর্থ আর অস্ত্রের জোরে অন্যায় প্রভুত্ব খাটানোয় ওস্তাদ রাষ্ট্রনেতারা পরিস্থিতির হাল ধরে রাখতে বেসামাল হচ্ছেন। বিগত শতাব্দীর দু-দুটি বিশ্বযুদ্ধ সমসাময়িক কালগণ্ডীর সবচেয়ে আলোড়িত ঘটনা ছিল। সন্দেহ নেই চলতি শতকের এই বিশ্বদুর্বিপাকও ভবিষ্যতে তাদের সঙ্গে আলোচিত হওয়ার সমান দাবিদার হয়ে উঠবে। পার্থক্যটা এখানেই যে, বিশ্বযুদ্ধ ছিল রাষ্ট্রিক ঘেরাটোপে বিভক্ত মানুষের ভৌগোলিক ভূখণ্ডে দখলদারিত্বের লড়াই। সেখানে জলে স্থলে আকাশে, মানুষের প্রতিপক্ষ ছিল মানুষ। এই প্রথম গোটা বিশ্বের মানুষকেই, 'না-মানুষ' প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামতে হয়েছে। যাদের আবার খালি চোখে দেখায় যায় না। করোনা ভাইরাসের এক অচেনা প্রজাতির একতরফা আক্রমনের মুখে গোটা পৃথিবীর মানবসমাজ তাই হতচকিত, উদভ্রান্ত এবং কিংকর্তব্যবিমূঢ়।

আক্রমনটা এতটাই আকস্মিক ও বেহিসেবি যে, প্রতিরোধ-পরিকল্পনার তেমন সময় থাকেনি হাতে । বিশ্বব্যাপী তার ভয়াবহতা এতটাই  তীব্র যে, গ্লোবাল-ইকনমির তাত্ত্বিক হিসেব-নিকেশের থই খুঁজতে বিশ্বের তাবড় তাবড় অর্থনীতিবিদের রাতের ঘুম হারিয়ে যাচ্ছে। চৌপাট হয়ে গিয়েছে আর্থিক বিকাশের পূর্বপরিকল্পিত লক্ষ্যমাত্রা।  ভাইরাস-সুনামির এই আকস্মিক অভিঘাত আগামী বিশ্বের জনজীবনের উপর যে কতটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে, তার অনুমান করেই শিহরিত হচ্ছেন অনেকে। এমনকি, আপাত-শক্ত অর্থনৈতিক ভিতে দাঁড়িয়ে থাকা দেশের অর্থমন্ত্রীকেও মানসিক অবসাদের শিকার হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হচ্ছে। সামনের সারির উজ্জ্বল অভিজাত দেশের প্রধানমন্ত্রীকেও হতাশ দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে করুণা ভিক্ষা করতে হচ্ছে। আমজনতা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রনেতা, রাজপুত্র রাজকন্যারাও এই আক্রমণ থেকে রেহাই পাচ্ছে না।

বিশ্ব অর্থনীতি এমনিতেই মন্দার আবহে খোঁড়াচ্ছিল। তার উপর ভাইরাস আতঙ্কে দেশে দেশে ঘোষিত হয়েছে দীর্ঘকালীন 'লকডাউন'। এর অনিবার্য ফলশ্রুতির বাস্তব রূপ কী দাঁড়াবে তা আগাম অনুমান করা কঠিন। চুলচেরা হিসেব-নিকেশ আরও কঠিন। কারণ, একযোগে গোটা বিশ্বের অর্থব্যবস্থা এমন প্রতিকূল পরিস্থিতির অথৈ ঘোলাজলে আগে পড়েনি। বিশ্বজুড়ে ধারাবাহিক ভাবে এত শ্রমদিবস নষ্ট হওয়া নজিরবিহীন ঘটনা। ফলে অনিশ্চয়তার আবর্তে ভবিষ্যতের অর্থনীতি যে ঘুরপাক খাবে অনির্দিষ্টকাল, সেটি অনুমান করার জন্য অর্থনীতির ছাত্র হওয়ার দরকার পড়ে না।

'ঘরে বাইরে' উপন্যাসে 'বিমলার আত্মকথা'য় রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন--'..প্রলয়ের বীজ যতক্ষণ মাটির নীচে থাকে ততক্ষণ অনেক সময় নেয়। সে এত সময় যে,ভয়ের বুঝি কোনও কারণ নেই। কিন্তু মাটির উপর একবার যেই এতটুকু অঙ্কুর দেখা দেয় অমনি দেখতে দেখতে বেড়ে ওঠে। তখন তাকে কোনোমতে আঁচল দিয়ে, বুক দিয়ে চাপা দেওয়ার আর সময় পাওয়া যায় না।’ মানুষের নিশ্চিন্তির জীবন যাপনে আঘাত কোনও না কোনও সময় যে এসে পড়বে তা নিয়ে উদ্বিগ্নতা ছিলই। বিশ্বপ্রকৃতির উপর মানুষের যথেচ্ছাচারের সীমা লঙ্ঘিত হয়েছে দিনে দিনে। পরিবেশ মানুষের কাছে তার সতর্কবার্তা নানাভাবে পৌঁছে দিচ্ছে। বিশ্ব-উষ্ণায়ণের প্রভাবে জলবায়ুর পরিবর্তন, মেরুপ্রদেশে বরফ গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘন ঘন ঘূর্ণাবর্ত জনিত ঝড়ঝঞ্ঝা, এসবই প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট হওয়ার সংকেত। বায়ুদূষণের মাত্রা মানুষ ও মনুষ্যেতর প্রাণির সহনশীলতার গণ্ডিকে ছাড়িয়েছে অনেক আগেই। পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলে জলবায়ু বিষাক্ত হয়েছে। সামুদ্রিক জীব ও বন্যপ্রাণের জীবনধারণও কষ্টকর হয়ে উঠছে ক্রমেই। জীববৈচিত্র্যের দফারফা হয়েছে। বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে এবং এখনও হচ্ছে একের পর এক জীবপ্রজাতি। ভূগর্ভের ভাঁড়ারেও জলের টানাটানি।

পরের বিশ্বযুদ্ধটা তৃষ্ণা মেটানোর জল নিয়েই হতে পারে বলে পরিবেশবিদদের অনেকে যখন সতর্ক করে রেখেছেন, তখনই প্রকৃতির প্রত্যাঘাতটা এল অন্যরূপ ধরে। ভৌগোলিক অঞ্চলবিশেষে ‘ইবোলা', 'নিপা'র মতো ভাইরাসরা মহামারির পরিস্থিতি আগেও তৈরি করেছে। তবে মানুষ থেকে মানুষে সহজে সংক্রমিত হওয়ার ক্ষমতা নিয়ে কোনও ভাইরাস এমন আচমকা আত্মপ্রকাশ করবে এবং তার সংক্রমণ সামলাতে গোটা বিশ্বব্যবস্থা এহেন বিপর্যস্ত হয়ে উঠবে তার অনুমান কেউ করেননি।

আসলে, পরিবেশ নিয়ে আশংকা থাকলেও মানবসভ্যতার সঞ্চালকেরা সেদিকে যথেষ্ট মনোযোগ দেননি। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা আভ্যন্তরীণ রাজনীতি আর যুদ্ধাস্ত্রের বিকিকিনিতে বেশি মনোনিবেশ করে থেকেছেন। দেশে দেশে সমরসজ্জার বহর বেড়েছে। এমনকি, প্রথাগত সমরাস্ত্রের বদলে জীবানু কিংবা বিষাক্ত গ্যাসকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের জল্পনাও দানা বেঁধেছে। যুদ্ধের জুজু দেখিয়ে সাধারণ দেশবাসীকে তাতিয়ে ও মাতিয়ে শাসনক্ষমতা দখলে রাখার প্রবণতাও দিনে দিনে বেড়েছে। এই পটভূমিতে দাঁড়িয়ে এখন সবার সব হিসেব-নিকেশ গুলিয়ে যাচ্ছে। যেমন করে হোক, এই দুর্যোগের ঘনঘটা থেকে আপাতত দেশবাসীকে বের করে আনার মরিয়া প্রচেষ্টা চলছে দেশে দেশে।

আসন্ন বিপর্যয় থেকে বাঁচতে অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও ঘোষিত হয়েছে 'লকডাউন'। মানুষের সঙ্গে মানুষের সংস্পর্শ আটকাতে এছাড়া আর অন্য উপায়ও ছিলনা। বাসগৃহের সীমাবদ্ধ ঘেরাটোপে আটক হয়ে জীবনযাপন করার এই অভিজ্ঞতা আমজনতার কোনওকালেই ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে বড় বড় শহরের আলো নিভিয়ে 'ব্ল্যাক আউট' করে রাখার কথা প্রবীণদের স্মৃতিতে থাকলেও থাকতে পারে।

প্রাচ্যের দেশগুলো থেকে যাতে প্লেগরোগ ইউরোপে না ছড়ায়, সেজন্য জলজাহাজের যাতায়াতে কড়াকড়ি চলত সেকালে। প্রয়োজনে জাহাজকেও 'কাঁরাটীন (Quarantine)'-এ রাখা হত। ১৮৯৯ সালে স্বামীজি দ্বিতীয়বারের পাশ্চাত্যযাত্রায় এরূপ বিধিনিষেধে মিশরের সুয়েজ বন্দরের বাইরে আটকে ছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার কথা তাঁর 'বিলাতযাত্রীর পত্রে' আছে।  এখনকার পরিস্থিতি কিন্তু আলাদা। এশিয়া ইউরোপ আমেরিকায় ভেদ নেই। সর্বনাশী ভাইরাসের ঘেরাটোপে গোটা বিশ্ব। কে কাকে সামলায় !

তবে, সব মন্দের একটা ভাল দিক থাকে। পারস্পরিক নানান অনৈক্যে আমাদের দেশ তথা জাতির সংহতির বাঁধনটা অনেকটাই শিথিল হয়ে পড়েছিল। সঙ্কটাপন্ন দেশবাসীর মন এই প্রথম একই দুর্ভাবনাসূত্রে একসঙ্গে গাঁথা পড়েছে। সকলেই সমান বিপন্নতাবোধে দুঃসহনীয় জীবনযাপনের অভিজ্ঞতা লাভ করেছে। রবি ঠাকুরই বলেছিলেন-'মৃত্যুর সম্মুখে যাহারা একত্রিত হয় তাহারা পরস্পরের অনৈক্যকে বড় করিয়া দেখিতে পারে না' (ভারতবর্ষে ইতিহাসের ধারা)। এক্ষেত্রেও তাই হচ্ছে। ঘরবন্দি অবস্থায় গোটা দেশের মানুষ বিছিন্ন হয়ে থাকলেও একই ভাবনার ঐক্যে পুনর্গঠিত হচ্ছে তাদের চেতনা। সঙ্কটের আঁধার থেকে বেরিয়ে আসা নাগরিকসমাজ সংহতিবোধের নতুন কোনও আলোকে জেগে উঠতে পারে কিনা, সেটা সময়ই বলবে।

 

লেখক স্কুল শিক্ষক ও সাহিত্যকর্মী, মতামত নিজস্ব

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন