ক্ষমতায় আসার পর বহু বৎসর টানা জয়লাভ করিয়াছে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিচেপ তায়িপ এর্দোয়ানের দল একেপি। ক্ষমতা যত বৃদ্ধি পাইয়াছে, ততই একনায়ক হইয়া উঠিয়াছেন প্রেসিডেন্ট। এমনকি, গত বৎসর সংবিধান সংশোধন করিয়া প্রধানমন্ত্রী পদের অবলুপ্তি ঘটাইয়া রাষ্ট্রের সকল দায়িত্ব আপনার করায়ত্ত করিয়াছেন তিনি। ইহার পর মিডিয়া হইতে সরকারি প্রতিষ্ঠান, সর্বত্র আপন অঙ্গুলিহেলনকেই বিধেয় করিয়াছেন। তবে সময় বহিয়া ভাগ্যচক্র বিপরীত অভিমুখে আবর্তিত হইল। স্থানীয় নগর ও গ্রামাঞ্চলের নির্বাচনে আঙ্কারা, ইস্তানবুল, ইজমিরের ন্যায় বৃহত্তম শহরগুলিতে জয় হাসিল করিল প্রধান বিরোধী দল সিএইচপি। যদিও, এর্দোয়ান ও শাসকগোষ্ঠী ফলাফলকে তাহাদের নীতি বিরুদ্ধে রায় বলিয়া দেখিতে ব্যর্থ হইয়াছেন। এর্দোয়ানের আমলে তুরস্কের অর্থনীতিতে ধস নামিয়াছে। বেকারত্ব ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাইয়াছে। বিপরীতে, উচ্চগ্রামে সাম্প্রদায়িক প্রচার করিয়াছেন এর্দোয়ান। আন্তর্জাতিক স্তরে আপত্তি উঠিবার পরেও বিরামহীন ভাবে ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে বন্দুকবাজের হামলার চিত্রকে নির্বাচনী হাতিয়ার করিয়াছেন। এবং লিরার দাম পতনের পরেও অর্থনীতি মেরামতের চেষ্টা না করিয়া তাহাতে ধর্মীয় রং লাগাইয়াছেন প্রেসিডেন্ট। স্বভাবতই, ফলাফল স্বীকার না করিয়া একেপি-র অভিযোগ করিয়াছে, ব্যালট পেপারে কারচুপি হইয়াছে। সেই স্বরের অনুরণন ঘটিয়াছে রাষ্ট্র-অনুগত সংবাদমাধ্যমেও। উপরন্তু, কিঞ্চিৎ প্রবোধ দিবার উদ্দেশ্যেই, সমগ্র দেশে তাহাদের পক্ষে ৫০ শতাংশ ভোট পড়িবার তথ্য তুলিয়া ধরিতেছে একেপি।

তবু নিন্দুকে বলিবে, বিবিধ শহরের নির্বাচনে পরাজয়ের পর উহাকে চ্যালেঞ্জ জানাইবার পদক্ষেপেই বুঝা যায়, দক্ষিণপন্থী ও জনপ্রিয়তাবাদী নেতা এর্দোয়ান টলিয়াছেন। তাঁহার দুই দশকের রাজনৈতিক উত্থানে ইহা সর্ববৃহৎ ধাক্কা। এই পরাজয়ের তাৎপর্য ত্রিবিধ। প্রথমত, রাজনৈতিক ও প্রতীকী অর্থে, ইস্তানবুলে পরাজয় একটি বড় ক্ষত। ইস্তানবুলের মেয়র হইয়া পাদপ্রদীপের আলোয় আসিয়াছিলেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট। আঙ্কারা ও ইস্তানবুলের ন্যায় বৃহৎ শহরগুলির ক্ষমতা করতলগত করিয়াছিল তাঁহার দল একেপি। দ্বিতীয়ত, এই নির্বাচন এর্দোয়ানের একাধিপত্যের উপর গণভোট হিসাবেই চিহ্নিত হইয়াছিল। তিনি প্রতি দিন আটটি করিয়া জনসভা করিয়াছেন এবং স্বহস্তে প্রার্থী বাছিয়াছেন। তৃতীয়ত, এর্দোয়ান অপরাজেয় বলিয়া যে মিথ তৈয়ারি হইয়াছিল, তাহা না ভাঙিলেও, নিশ্চিত মচকাইল। বিরোধী দলগুলির জোটবদ্ধ প্রচারে ফল মিলিল। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক বদলের প্রতিশ্রুতি দিয়াছিল সিএইচপি। কুর্দিশ সংখ্যালঘুদের দলও তাহাদের সমর্থন করিয়াছিল। জোট যদি টিকিয়া যায়, তাহা হইলে ২০২৩ সাধারণ নির্বাচন লইয়া আর নিশ্চিন্ত থাকিতে পারিবে না একেপি। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী, সংবাদমাধ্যম ও আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে যে দমননীতি লইয়াছেন এর্দোয়ান, তাহার ফলে অবাধ নির্বাচন আরও কঠিন (বস্তুত অসম্ভব) হইয়া উঠিতে পারে। তবু, আপাতত জনতার রায় জানাইল, যে জনপ্রিয়তাবাদের দোহাই দিয়া গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে অবহেলা করিতেছিলেন প্রেসিডেন্ট, সেই জনপ্রিয়তাবাদই আর জনপ্রিয় নহে। গণতন্ত্রকে অবহেলা করিলে গণতন্ত্রই বুমেরাং হইয়া ফিরিয়া আঘাত করে। তুরস্ক দৃষ্টান্ত হইয়া থাকিল।