সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

শহর ও গ্রাম

Dengue Prevention

নগরের জীবন লইয়া বহু দীর্ঘশ্বাস কাব্যে ধ্বনিত হইয়াছে এবং গ্রামীণ জীবনকে মাথায় তুলিয়া নৃত্য করা হইয়াছে। নগর লইয়া অরণ্য ফিরাইয়া দিবার দাবি গাল ফুলাইয়া অনেকে এমন আকুল ভাবে করিয়াছেন, যেন সত্যই কেহ ধাঁ-চকচকে ১৪০০ স্কোঃ ফুঃ-র ফ্ল্যাটটি হইতে তুলিয়া সুন্দরবনের গহন শ্বাপদসংকুল অঞ্চলে তাঁহাদের নিক্ষেপ করিলে, তাঁহারা পুলকাকুল হইয়া মশা মারিবেন ও বাঘের তাড়া খাইবেন। প্রাতঃকালে উদ্বাহু হইয়া বলিবেন, অহো, খাঁটি মৎস্য মারিয়া কাঁচা খাইবার আরাম ফ্রিজে রক্ষিত সসেজ ভক্ষণের তুলনায় শত গুণ! এমনিতেই বিজ্ঞান নাকি মানুষের আবেগ কাড়িয়া তবে বেগ প্রদান করিয়াছে, তাহার সহিত নাগরিক জীবনযাপন তাহাকে করিয়া তুলিয়াছে আত্মকেন্দ্রিক এবং ক্ষুদ্র পরিবারে (সুতরাং ক্ষুদ্রতায়) বিশ্বাসী। বহু চলচ্চিত্র বা নাট্যেও দেখা যায়, নাগরিক চরিত্রগুলি স্বার্থপর, গ্রামের মানুষগুলি উদার, পরোপকারী। অনেকে নিজ ফ্ল্যাটে বসিয়া আক্ষেপ করেন, প্রতিবেশীর পরিচয় ইদানীং কেহই জানেন না, অথচ গ্রামে এক হাঁক দিলেই সাহায্য করিবার লোকের অভাব হয় না। বৈভবের দিক দিয়া উন্নত জীবনযাত্রা যে মানবিক দিক দিয়া মহা অবনত, তাহা বহুসমর্থিত প্রসঙ্গ। কিন্তু সম্প্রতি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও হংকং বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়া সমীক্ষা করিয়া জানাইল, স্বাস্থ্য ও হৃদয়, দুইটিই অধিক সুস্থ ও সুখী থাকে নাগরিক পরিবেশে। গ্রামীণ পরিবেশে অসুস্থতা ও বিমর্ষতা বাড়িবার সম্ভাবনা।

গ্রামের তুলনায় শহরে, একই পরিমাণ এলাকায়, গৃহের সংখ্যা অধিক, বসবাসকারী মানুষ অধিক, পথেঘাটে দোকানপাটে ক্রেতার সংখ্যাও অধিক। সমীক্ষাটি দেখাইয়াছে, শহরে সামাজিক জীবনযাপন, প্রচলিত ধারণার বিপরীতে গিয়া, অত্যন্ত নিবিড় ও নিয়মিত। ভাবিয়া দেখিলে ইহা সহজ মনে হয়। শহরে কেহ একা হাঁটিতে বাহির হইলেও, ভিড়ে মিশিয়া তাহার নিজেকে মনে হইবে বৃহৎ সমষ্টির অংশ। বারান্দায় দাঁড়াইয়া থাকিলেও সম্মুখে প্রবাহিত জীবন দেখা যাইবে, সেই দিকে তাকাইয়া সময় কাটাইবার পদ্ধতিটি বহুপরীক্ষিত ও বিমর্ষতাহারী। তাহা ব্যতীত শহরে রহিয়াছে বিনোদনের নানা উপায়: উন্নত মানের প্রেক্ষাগৃহ,  সুরা-নিলয়, ভিডিয়ো গেম বা গ্রন্থের বিপণি, শপিং মল। বহুতল বাড়িগুলি লইয়া গঠিত ‘কমপ্লেক্স’-এ সামাজিক অনুষ্ঠানগুলি একত্রে পালন করিবার চল রহিয়াছে। দুর্গাপূজা, বনভোজন, প্রাতঃকালে সহ-নাগরিকের সহিত গল্প করিতে করিতে জগিং, শিশুদের খেলার পার্কে লইয়া যাইয়া অভিভাবকগণের গল্পগাছা, সকলই চলিতেছে। তাহার উপর নগরে রহিয়াছে অধিক স্বাস্থ্য-সচেতনতার দস্তুর। জিম বা ডায়েটিং প্রায় প্রত্যেকেরই জীবনের অঙ্গ। চিকিৎসার উন্নত ব্যবস্থা শহরে অনেকের প্রাণ বাঁচাইতেছে, গ্রামে সেই রোগীকে রেফার করিয়া দিবার পর শহরে আনিতে  আনিতেই সময় পার হইয়া যাইতেছে।

তবে মনে রাখিতে হইবে, সমীক্ষাটি হইয়াছে ব্রিটেনের শহর ও গ্রাম লইয়া। তাই শহরের ও গ্রামের স্বাস্থ্যব্যবস্থার পার্থক্য সম্বন্ধে উপরোক্ত যুক্তি খাটিবে না। আবার সমীক্ষায় বলা হইয়াছে, শহরে যানবাহনের সংখ্যা অধিক হওয়ায় মানুষকে ট্রাফিক-জটে পড়িয়া অধিক হন্টন করিতে হয়, নিজ গাড়ি রাখিয়া বাসেট্রামে যাতায়াত করিতে হয়, ইহাতে শরীর সচল থাকে, আর গ্রামের দিকে সকলেই কেবল গাড়ি চালাইয়া যাতায়াত করেন, তাই তাঁহাদের ব্যায়াম কম হয়। ভারতের ক্ষেত্রে ঘটনা সম্পূর্ণ বিপরীত। শহুরে মানুষেরা অনেকে ট্রেডমিল ভিন্ন হাঁটেন না, আর গ্রামীণ মানুষেরা কায়িক শ্রম করেন পেশার কারণে এবং যানবাহনের অভাবে। তাহার উপর শহরে দূষণ অধিক, গ্রামে প্রকৃতি প্রসারিত। সেই দিক থেকে, গ্রামে মানুষের স্বাস্থ্য ভাল হইবার সম্ভাবনা। বিনোদনের যুক্তিটিও প্রাচীনপন্থী। মোবাইল আসিয়া, সকল প্রেক্ষাগৃহ বা জলসা-স্থান প্রত্যেকের মুঠিতেই রহিয়াছে, রাস্তা খুঁজিয়া টিকিট কাটিয়া কোথাও যাইবার প্রয়োজন নাই। গ্রামের লোকও টিভি এবং ইউটিউবে তাহাই দেখিতেছেন, যাহা শহরের মানুষকে তৃপ্তি দিতেছে। মানুষের নিত্য সামাজিক আদানপ্রদান গ্রামে না শহরে অধিক হয়, সেই তর্কেরও আর তাৎপর্য নাই, কারণ সমাজ আজ ফেসবুকে অবস্থান করে। গ্রাম বনাম শহরের সরল বিপরীত চিত্র আঁকিয়া একটিকে উত্তম দাগিয়া দিবার প্রবণতা এমনিই হাস্যকর, বর্তমান প্রযুক্তি আসিয়া তাহাকে অধিক অবান্তর করিয়াছে। ডেঙ্গির মশা উভয় ক্ষেত্রেই সমান দংশন করিতে তৎপর।

যৎকিঞ্চিৎ

সব বড় বড় শহরই পেট্রোল, ডিজেলের গাড়ি তুলে দিতে চাইছে। লন্ডন নাকি বলছে ২০২০ থেকে ও-সব গাড়ি নিয়ে শহরের কেন্দ্রে ঢুকলেই এত টাকা গচ্চা, প্যারিস নাকি বলছে ২০৩০-এর মধ্যে বাতিল। ইলেকট্রিকের গাড়ি এলে খুবই ভাল, দূষণ নেই, ইঞ্জিনের জায়গাটাতেও ডিকি: বহু জিনিস আঁটবে। কিন্তু চার্জ করতে ভুললে মাঝপথে গাড়ি থুম্বো, চার্জার নিতে ভুললে পুরী অবধি লং ড্রাইভের দফা গয়া, আর মোবাইলের সঙ্গে ফের একটা নতুন চার্জার হারানোর দৈনিক লীলা!

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন