অর্ধেক রাজত্ব আর রাজকন্যা নিয়ে সুখে থাকার মধ্যেই রূপকথার গল্পের সমাপ্তি। রাজার সংখ্যা বাড়লে, রাজ্যটাকে ভেঙে ফেলা একটা সমাধান নিশ্চয়ই। দেশ-ভাঙা, রাজ্য-ভাঙা অবশ্য বাস্তবেও ঘটে। তেলের শিশির মতোই। তবু আইন-আদালত আছে, থাকে বিধি-নিষেধ। রাজনীতি তাই খুঁজে নেয় সিংহাসনের দখলদারি নিয়ে সমস্যা সমাধানের নতুন পথ। তৈরি হয় রাজত্বের সময়কালটুকু ভাগ করে পর্যায়ক্রমে সিংহাসনে বসার চুক্তি।

শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘প্রাগ্‌জ্যোতিষ’ গল্পের বন্ধুযুগল, প্রদ্যুম্ন আর মঘবা, রাজ্যস্থাপন করে যৌথ বাহুবলে। চুক্তি হয়, রাজা হবে এক জন, আর অন্য জন সেনাপতি। পর্যায়ক্রমে। এক-এক জনের রাজত্বকাল এক চন্দ্রগ্রহণ থেকে পরের চন্দ্রগ্রহণ পর্যন্ত। শরদিন্দুর গল্পে কিন্তু উভয়েই অন্য জনকে রাজা করতে ব্যগ্র। আজকের উত্তর-জ্যোতিষ যুগে তেমনটা আশা করাই অন্যায়।

আজকের গণতন্ত্রে ইভিএম-উত্তর রাজনীতির জটিল আবর্তে জনগণেশের কোনও ভূমিকা অবশ্য নেই এ সব ক্ষেত্রে। মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সি নিয়ে তিন দশকের শরিক বিজেপি আর শিবসেনার বিস্তর তরজা দেখে ফেলেছে ভারতবর্ষ। দু’দলের মধ্যে আড়াই বছর করে কুর্সি দখলদারির প্রাক্-নির্বাচনী কোনও সমঝোতা ছিল কি না, সাধারণ জনতার তা জানার উপায় নেই। জানলেও করার নেই কিছুই।

অতীতে কুর্সি ভাগাভাগির খেলায় অন্তত দু’বার বিজেপির শরিকরা প্রথমে ব্যাট করে মাঝপথে খেলা ভন্ডুল করে দিয়েছে। ১৯৯৬ সালে ৪২৫ আসনের উত্তরপ্রদেশ বিধানসভায় বিজেপি পায় ১৭৪টি আসন। আর কংগ্রেসের সঙ্গে প্রাক্-নির্বাচনী জোট বেঁধে বিএসপি পায় ৬৭টি। বিজেপি কিন্তু নির্বাচনোত্তর জোট বাঁধে মায়াবতীর সঙ্গে। আজকের মহারাষ্ট্রে শিবসেনার এনসিপি-র সঙ্গে ইভিএম-উত্তর আলোচনা চালানোর রাজনৈতিক প্রেক্ষিতটা কি তাই ১৯৯৬-এর উত্তরপ্রদেশেই দানা বেঁধেছিল? সে বার ছ’মাস করে পর্যায়ক্রমিক মুখ্যমন্ত্রিত্বের রফা হয়। পাণ্ডবরা বনবাস এবং অজ্ঞাতবাস সেরে ফিরলে চুক্তিমতো তাঁদের রাজ্য ফিরিয়ে দিতে আগ্রহী ছিলেন না দুর্যোধন। সেই ট্র্যাডিশন চলছে আজকের মহাভারতেও। মায়াবতীর মেয়াদের শেষে মুখ্যমন্ত্রী হন কল্যাণ সিংহ। চার সপ্তাহ পরেই সমর্থন প্রত্যাহার করেন মায়াবতী। জোট রাজনীতি আর কুর্সি ভাগাভাগি তাই নিঃসন্দেহে নতুন করে সংজ্ঞায়িত হয় ১৯৯৬-৯৭-এর উত্তরপ্রদেশে।

পরের ঘটনা কর্নাটকে। ২০০৬ সালে কুমারস্বামীর সঙ্গে পর্যায়ক্রমিক মুখ্যমন্ত্রিত্বের চুক্তিতে যায় বিজেপি। প্রথমে মুখ্যমন্ত্রী হন কুমারস্বামী। ২০০৭-এর নভেম্বরে ইয়েদুরাপ্পার পালা আসার সাত দিনের মধ্যেই চুক্তি-টুক্তি ভেঙে বেরিয়ে যান কুমারস্বামী। কুর্সি ভাগাভাগিতে বিজেপির তাই ঐতিহাসিক অস্বস্তি থাকাটাই স্বাভাবিক, যদিও কুর্সি ভাগাভাগিটা ইতিমধ্যে ঢুকে গিয়েছে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে।

রাজত্বকাল ভাগাভাগি হয় বিদেশেও। ২০১৬-র নেপালের সঙ্গে যেমন আজকের মহারাষ্ট্রের অনেক মিল। প্রধানমন্ত্রী অলি-র সঙ্গে মাওবাদী নেতা প্রচণ্ডের নাকি ‘ভদ্রলোকের চুক্তি’ ছিল, বাজেটের পরে প্রচণ্ডকে প্রধানমন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেবেন অলি। সময়কালে অলি অবশ্য বলেন, এমন কোনও চুক্তি ছিল না। চিড় ধরে সম্পর্কে। মাওবাদীরা সরকার গড়ে নেপালি কংগ্রেসের সঙ্গে একজোটে। চুক্তি হয়— ন’মাস প্রধানমন্ত্রী থাকবেন প্রচণ্ড, তার পর তিনি কুর্সি ছেড়ে দেবেন শের বাহাদুর দেউবা-কে। কিস্‌সা তাই কুর্সিরই, প্রশাসন কিংবা সুশাসনের ততটা হয়তো নয়।

ইজ়রায়েলের মতো আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব, জটিল ধর্মীয়-সামাজিক বিন্যাস, এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রে জোট-গঠন সব সময়ই সুচারু শিল্প। নেতানিয়াহু-র লিকুদ পার্টি আর বেনি গ্যান্টস্‌-এর ব্লু অ্যান্ড হোয়াইট পার্টির মধ্যে সম্ভাব্য জোট নিয়ে সাম্প্রতিক দড়ি-টানাটানিতেও বার বার উঠেছে কুর্সি ভাগাভাগির প্রস্তাব।

আসলে পর্যায়ক্রমে প্রধানমন্ত্রিত্বের ‘সফল’ ইতিহাস আছে ইজ়রায়েলের। ১৯৮৪-৮৮ সালে। প্রথম দু’বছর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন লেবার নেতা সাইমন পেরেজ়, আর পরের দু’বছর লিকুদ নেতা ইৎজ়াক শামির। পেরেজ় জানতেন, জোট ভেঙে কট্টর ইহুদি দলগুলির সমর্থনে সরকার গড়া তাঁর লেবার পার্টির পক্ষে তখন অসম্ভব। ও দিকে লিকুদ পার্টির নেতৃত্ব নিয়ে এরিয়েল শ্যারন আর ডেভিড লেভি-র চ্যালেঞ্জকে রুখতে শামিরকে তখন সরকারে থাকতেই হত। তাই ইজ়রায়েলের পেরেজ়-শামির কুর্সি ভাগাভাগির শাসনকাল চার বছর ধরে চলল ‘ভদ্রলোকের চুক্তি’র দায়বদ্ধতায়, না কি রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতায়, সে তর্ক চলতেই পারে।

মালয়েশিয়ার ‘সাবা’ প্রদেশের গল্পটা আবার অন্য। সে রাজ্যে তিনটি প্রধান জনগোষ্ঠী। মুসলিম, অমুসলিম ‘ভূমিপুত্র’, এবং চিনা। ১৯৯৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মহাথির মহম্মদের আমলে নিয়ম হয়, তিন জনগোষ্ঠী থেকে পর্যায়ক্রমে মুখ্যমন্ত্রী হবেন, দু’বছরের মেয়াদে। পরবর্তী দশ বছরে সাত জন মুখ্যমন্ত্রী পায় রাজ্যটি। ২০০৪ সালে অবশ্য উঠে যায় এই ‘একুশে আইন’। ভারতেও কিন্তু ২০১১ সালে অন্ধ্রপ্রদেশের বিভাজন রুখতে তেলঙ্গানা এবং সীমান্ধ্রর নেতাদের যথাক্রমে দুই আর তিন বছর করে মুখ্যমন্ত্রিত্ব দেওয়া নিয়ে চর্চা হয়েছে।

আচ্ছা, রাজ্যপাট নিয়ে দাঁড়িপাল্লা-সহযোগে দেশে-বিদেশে এই সব দরাদরির মধ্যে জনগণেশের ভূমিকাটা ঠিক কোথায়? আসলে ভারতের মতো দেশের গণতন্ত্রের পরিষ্কার দুটো ভাগ। একটার দৌড় ইভিএম পর্যন্ত। জনগণের গুরুত্ব সেখানে স্বাভাবিক নিয়মে। তার পর শুরু হয় ইভিএম-উত্তর রাজনীতি (ইভিএম নিয়ে রাজনৈতিক তরজাটা এ-আলোচনার বাইরে)। ধোঁয়াশায় ভরা সেই জগতের যেটুকু প্রকাশ পায়, তাতে দল-ভাঙাভাঙি, বিধায়ক কিংবা সাংসদ কেনাবেচা নিয়ে বিস্তর চাপানউতোর, নব-নব রূপে রিসর্ট-রাজনীতির প্রকাশ এবং বিকাশ, জটিল এবং আপাত-অবাস্তব নির্বাচনোত্তর জোট-গঠনের প্রয়াস, রাজ্যপাল বা রাষ্ট্রপতি কাকে সরকার গড়তে ডাকবেন সে নিয়ে অস্পষ্টতা, জল্পনা, সামঞ্জস্যহীনতা, উপ-মুখ্যমন্ত্রীদের সংখ্যা বৃদ্ধি, এবং অবশ্যই পর্যায়ক্রমে কুর্সি ভাগাভাগির রফা, রাজত্ব-প্রত্যাবর্তনে দুর্যোধনের অনীহা, কী নেই! নির্বাচনোত্তর জোটের কাছে ‘ন্যূনতম অভিন্ন কর্মসূচি’ নামক গসাগু-র প্রত্যাশাও আজকের জনগণের আছে বলে মনে হয় না।

রিসর্ট-রাজনীতি থেকে কুর্সি ভাগাভাগি—রাজনৈতিক তৎপরতার এই সন্ধিক্ষণগুলিতে জনগণ কিন্তু একেবারেই ব্রাত্য। গণতন্ত্রের নিয়মেই। জনগণেশের দায়িত্ব এবং অধিকার উভয়ই ইভিএম-এ বোতাম টেপার সঙ্গে শেষ হয়েছে। কে জানে, এটা দেশ-বিদেশের গণতান্ত্রিক পরিকাঠামো কিংবা তার প্রয়োগের দুর্বলতা কি না।

ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট, কলকাতার রাশিবিজ্ঞানের অধ্যাপক। মতামত ব্যক্তিগত