নিউ মেক্সিকোর ট্রিনিটিতে আমেরিকার পারমাণবিক বিস্ফোরণ পরীক্ষা বা ‘ট্রিনিটি টেস্ট’-এর আশি বছর উপলক্ষে শিকাগোয় নোবেলজয়ী ও পরমাণু বিজ্ঞানীদের এক সম্মেলন হয়ে গেল গত ১৪-১৬ জুলাই। এই পরীক্ষার পর পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীদের যা অভিজ্ঞতা হয়েছিল, তা স্মরণ করে আরও এক বার এই বিস্ফোরণের বীভৎস পরিণতির কথা বলে পারমাণবিক যুদ্ধ বন্ধ করার পক্ষে একগুচ্ছ কর্মপদ্ধতির তালিকা প্রকাশ করা হয়। এই পরীক্ষা নিয়ে একাধিক বই লেখা হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায়, যা পড়ে চমকে গেছেন সাধারণ মানুষ। সেই ভয়াবহতার কিছুটা প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা হয়েছে ক্রিস্টোফার নোলানের ওপেনহাইমার ছবিতেও। ১৯৪৫-এর ১৬ জুলাই পরীক্ষার পর ৬ ও ৯ অগস্ট যথাক্রমে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে বোমা ফেলা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির ঘণ্টাও বেজে যায়।
বোমা বিস্ফোরণের পর যে পরিমাণ তাপ তৈরি হয়েছিল, তাতে সেই মুহূর্তে হিরোশিমায় সত্তর হাজার ও নাগাসাকিতে চল্লিশ হাজার মানুষ মারা যান। এক বছরের মধ্যে আহত ও তেজস্ক্রিয় বিকিরণের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় এই দুই জায়গায় যথাক্রমে ১,৪০,০০০ ও ৭৪,০০০ লোকের মৃত্যু হয়। এর পরেও যারা বেঁচে রইলেন তাঁদের অনেকেরই দীর্ঘকালীন স্বাস্থ্য-অবনতি ঘটে। কর্কট, লিউকেমিয়া ও অন্যান্য রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। তেজস্ক্রিয়তার বিষক্রিয়া জীবিতদের পরবর্তী প্রজন্মে বাহিত হয়ে নব্য শিশুরা শারীরিক ও মানসিক পঙ্গুত্বের কবলে পড়ে, বিকৃত অপূর্ণ সন্তান প্রসব হয়।
এই সংখ্যা অগণিত। যুদ্ধের ইতিহাসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রাণহানি, স্থাবর সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াও মানবিক অবমাননার চরম নিদর্শন হয়ে থেকে গেছে। সমীক্ষামতে, যুদ্ধ ও আনুষঙ্গিক কারণে ২৫০ লক্ষ সামরিক ও ৮৫০ লক্ষ অসামরিক লোকের মৃত্যু হয়। কয়েক বছরের যুদ্ধে প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ে হুহু করে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ১ কোটি সামরিক ও ৮০ লক্ষ অসামরিক লোক মারা যায়, ২০ লক্ষ ব্রিটিশ সেনা নানা শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে দেশে ফেরে, এদের মধ্যে ৪০ হাজার সেনার অঙ্গ প্রতিস্থাপনের জরুরি দরকার পড়েছিল।
আধুনিক মানুষের সঙ্গে প্রাক্মানব নিয়েনডারথালের সংঘর্ষেরও নিদর্শন মেলে। উষ্ণযুগ শুরুর পর থেকে প্রত্নতাত্ত্বিক খননে একাধিক জায়গায় গণকবর পাওয়া গেছে, মৃতের কঙ্কালে গভীর আঘাতের চিহ্নও। অনুমান, গত আট হাজার বছরে বিশ্ব জুড়ে যুদ্ধ-সংঘর্ষে একশো কোটি লোক হয় মারা গেছে, নয়তো বড় রকম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এটা নির্ভর করে কী ধরনের অস্ত্র কী ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে তার উপর। উইলিয়াম একহার্টের গবেষণামতে, খ্রিস্টপূর্ব তিন হাজার বছর থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত সংগৃহীত সব যুদ্ধের নথি অনুসারে ১৫১০ লক্ষ লোকের মৃত্যু হয়েছে। তবে সব স্থানীয় ও আঞ্চলিক যুদ্ধ বা সংঘর্ষের নথি পাওয়া সম্ভব নয়, এও স্বীকৃত। অন্য এক সমীক্ষা বলছে, ইতিহাস জুড়ে বিশ্বের জনসংখ্যার ১ শতাংশ লোক যুদ্ধে মারা গেছে। প্রাগিতিহাস-যুগে ও প্রাচীন সম্রাটদের রাজত্বকালে সম্ভবত ১০ শতাংশ ও ৫ শতাংশ লোকের প্রাণনাশ হয়েছে।
যুদ্ধ মানুষের নানা প্রতিবন্ধকতার জন্য দায়ী, শারীরিক-মানসিক উভয় ক্ষেত্রেই। যুদ্ধের ফলে বিশেষ ভাবে সক্ষম ব্যক্তিরা আরও প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়, এ ছাড়াও নতুন অক্ষমতা নিয়ে হাজির হয় অসংখ্য মানুষ। প্রত্যক্ষ যুদ্ধে ও আনুষঙ্গিক কারণে মানুষ প্রতিবন্ধী হয়ে পড়ে; মেরুদণ্ড-সহ শরীরের অন্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ও বাদ পড়া তো বটেই, মস্তিষ্কের ক্ষতিও হতে পারে। রাসায়নিক ও তেজস্ক্রিয় অস্ত্র ব্যবহারে দীর্ঘকালীন অসুস্থতা বা পঙ্গুত্বের আশঙ্কা থাকে। যুদ্ধে মানসিক আঘাতে অবসাদ, উদ্বেগ, অন্য মানসিক অসুস্থতার শিকার হওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে।
শিক্ষাবিদ জসবীর কৌর পুয়ার তাঁর দ্য রাইট টু মেইম: ডেবিলিটি, ক্যাপাসিটি, ডিজ়এবিলিটি বইয়ের সূচনায় লেখেন, পৃথিবীতে যুদ্ধের কারণেই তৈরি হয় অধিকাংশ প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষ। তা ছাড়া সামাজিক ও রাজনৈতিক হিংসা, রাষ্ট্রীয় অসাম্যও এদের সংখ্যা বৃদ্ধিতে ইন্ধন জোগায়। পৃথিবী জুড়ে যুদ্ধ ও অসাম্যের অবসান হলেই এই মানুষদের সংখ্যা কমবে। এই মুহূর্তে এশিয়া ও ইউরোপে দীর্ঘদিন ধরে দুটো আন্তর্দেশীয় যুদ্ধ চলছে, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে চলছে গৃহযুদ্ধ, গণহত্যা। মারা যাচ্ছে অসংখ্য লোক, পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে তারও বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবমতে, সিরিয়ায় প্রতি মাসে ৩০ হাজার লোক প্রতিবন্ধকতার শিকার। গাজ়ায় তিন লক্ষ লোক যুদ্ধে প্রতিবন্ধী হয়েছে, ইউক্রেনে ৩৯ লক্ষ মানুষ মাঝারি থেকে প্রবল ভাবে মানসিক অসুস্থ।
সংঘর্ষের সময় বেশির ভাগ প্রতিবন্ধযুক্ত ব্যক্তি নিজেকে বাঁচাতে বা পালাতে পারে না। দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নামা, বাঙ্কারে আশ্রয় নেওয়া ইত্যাদিও সম্ভব হয় না। শ্রবণশক্তি না থাকায় সাইরেনের আওয়াজ শুনতে না পাওয়া, দৃষ্টিহীনদের চলাচলে বাধা, এমন আরও নানা সমস্যায় পড়ে জীবন বিপন্ন হয়। এ ক্ষেত্রেও নারী ও শিশুরা ক্ষতিগ্রস্ত হয় বেশি সংখ্যায়। সংঘর্ষের সময় ও তার পরেও বিশেষ ভাবে সক্ষম ব্যক্তিরা মানবাধিকার ও মৌলিক সুযোগ-সুবিধা যেমন জল খাদ্য পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হয়। গাজ়ায় খাদ্য বিতরণের সময় ইজ়রায়েলি হামলায় অনেক শিশু মারা যাচ্ছে, অনেকে আহত হয়ে পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে। কোনও প্রতিবন্ধতাযুক্ত শিশুই খাবার সংগ্রহের জন্য যেতে পারছে না।
ইউনিসেফ-এর তথ্য বলছে, ২৪০০ লক্ষ শিশু প্রতিবন্ধকতাযুক্ত, যুদ্ধ ও নানা সংঘর্ষে সংখ্যাটা ক্রমে বাড়ছে। ওষুধ, খাদ্য ও জলের অভাবে প্রতিবন্ধকতা দীর্ঘস্থায়ী হয়। গাজ়ায় একের পর এক হাসপাতাল ও শিশু চিকিৎসাকেন্দ্র বোমায় গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ইউনিসেফ প্যালেস্টাইনে শ্রবণযন্ত্র, প্রস্থেটিক্স, হুইলচেয়ার ইত্যাদি সরবরাহ করছে, ইউক্রেনে তাদের ভ্রাম্যমাণ দল শিশুদের মানসিক সহায়তা করছে, সিরিয়ায় যুদ্ধ ও সংঘর্ষে জোগাচ্ছে অর্থকরী সাহায্য। প্রয়োজনের তুলনায় সেও খুব কম।
এই মুহূর্তে যুদ্ধাস্ত্র সবচেয়ে সচল ও লাভজনক ব্যবসা। প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, যুদ্ধাস্ত্রও উন্নততর, নিখুঁত হয়ে উঠেছে। ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে বহু দূরেও অব্যর্থ লক্ষ্যভেদ সম্ভব। সাম্প্রতিক দুই যুদ্ধেই ড্রোনের যথেচ্ছ ব্যবহার তার প্রমাণ। যুদ্ধে এখন সামরিক সেনার মৃত্যুর সংখ্যা কমলেও, অসামরিক নিরপরাধ ব্যক্তিরা কেবল সে দেশে জন্মানোর ‘অপরাধ’-এ মূল্য চোকাচ্ছে— মৃত্যু বরণ করে বা আমৃত্যু পঙ্গু হয়ে। সভ্যতার এই অমানবিক রূপ দেখেও ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলির ভ্রুক্ষেপ নেই। কিসের ভয়ে বা প্রলোভনে সমগ্র বিশ্ব নির্বিকার, উত্তর মেলে না। মৃতদের নাহয় সৎকার হয়ে গেল, কিন্তু যারা প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়ে বেঁচে রইল তাদের সামাজিক অবস্থান কোন অতলে তলিয়ে যাচ্ছে সে কথা ভাবার লোক আর অবশিষ্ট নেই।
মানুষ যত দিন এই পৃথিবীতে আছে, যুদ্ধও থাকবে। যুদ্ধে হতাহতের সংখ্যাও ক্রমে বাড়বে। বৃদ্ধি পাবে বিশেষ ভাবে সক্ষম মানুষের সংখ্যা। পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করাটা এখন কোনও এক রাষ্ট্রনায়কের মুহূর্তের সিদ্ধান্ত-নির্ভর, যিনি বোতাম টিপেই খালাস। ও-দিকে বেড়ে যাবে মৃত্যুর সংখ্যা আর জীবিতদের পঙ্গুত্ব।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)