Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

১৮ মে ২০২২ ই-পেপার

URL Copied
Something isn't right! Please refresh.

বাঁচতে হলে বিদ্যুৎই ভরসা

কলকাতায় প্রতি দিন ৫০০০ ডিজ়েল বাস রাস্তায় নামে— সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে।

তুষার যশ
২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ০৫:০৪
Save
Something isn't right! Please refresh.
Popup Close

মাসকয়েক আগে লন্ডনে একটি ন’বছর বয়সি মেয়ে প্রবল শ্বাসকষ্টে মারা গেল। তার ডেথ সার্টিফিকেটে মৃত্যুর কারণ লেখা হয়েছে ‘বায়ুদূষণ’। সারা বিশ্বে এই প্রথম কারও মৃত্যুর কারণ হিসেবে সরাসরি বায়ুদূষণকে দায়ী করা হল। বিশ্বের বেশির ভাগ মানুষ এখন এমন জায়গায় বাস করছেন, যেখানে বায়ুদূষণের মাত্রা সহনসীমার অনেক উপরে। বিশেষ করে কলকাতা, দিল্লি, মুম্বইয়ের মতো শহরে।
শহরাঞ্চলে যানবাহনজনিত বায়ুদূষণ কমানোর মূলত তিনটি উপায় আছে— ১) গণপরিবহণ ব্যবস্থা বাড়ানো; ২) ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমানো; এবং ৩) পেট্রল ও ডিজ়েল গাড়ির সংখ্যা কমিয়ে ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বহুগুণ বাড়ানো। শেষের বিকল্পটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে ৮০% যাত্রী সড়ক পরিবহণে যাতায়াত করেন। এর মধ্যে বড় গাড়ি যেমন আছে, তেমনই ব্যক্তিগত গাড়ি, ট্যাক্সিতে যাতায়াত করা মানুষের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। বায়ুদূষণকে নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে পেট্রল বা ডিজ়েলচালিত গাড়ির ব্যবহার কমাতেই হবে।
পেট্রল বা ডিজ়েল গাড়ি চলে ইন্টারনাল কমবাসচন ইঞ্জিন দ্বারা। এই ইঞ্জিনে তেল বা গ্যাস দহন করে শক্তি উৎপন্ন করা হয়, যার সাহায্যে গাড়িটি চলে। এর ফলে যে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উৎপন্ন হয়, তা ধোঁয়ার আকারে নির্গত হয়ে বাতাসে মেশে। এতে কঠিন ভাসমান কণা, তরল ড্রপলেট ও কিছু দূষিত গ্যাস থাকে, যেগুলো বায়ুদূষণ ঘটায়। অন্য দিকে, বৈদ্যুতিক গাড়ি চলে মোটরের সাহায্যে, এই মোটর বিদ্যুৎশক্তি পায় রিচার্জেবল ব্যাটারি থেকে। তাই বৈদ্যুতিক গাড়ি বায়ুদূষণ করে না।


ভারতে এখন বাণিজ্যিক ভাবে তিন রকমের বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরি হচ্ছে— চার চাকার গাড়ি, যেমন বাস; তিন চাকার অটো বা ই-রিকশা; এবং দু’চাকা স্কুটার। পুণে, মুম্বই বা শিমলার মতো কলকাতা শহরেও বৈদ্যুতিক বাস পরীক্ষামূলক ভাবে চলছে। গত দু’বছর ধরে ৮০টি বৈদ্যুতিক বাস কলকাতার বিভিন্ন রুটে চালানো হচ্ছে। সামনে থেকে এই বাস দেখলে সাধারণ বাসের সঙ্গে কোনও তফাত নেই। কিন্তু পিছন থেকে দেখলে অবাক হতে হয়— বাস চলছে, অথচ কালো ধোঁয়া বেরোচ্ছে না। এই শহরের মানুষের কাছে এটা নতুন অভিজ্ঞতা।


কলকাতায় প্রতি দিন ৫০০০ ডিজ়েল বাস রাস্তায় নামে— সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে। ৮০টি বৈদ্যুতিক বাস সেই তুলনায় খুবই নগণ্য। তবু নিঃসন্দেহে শুভ সূচনা। আগামী পাঁচ বছরে বৈদ্যুতিক বাসের সংখ্যা দ্রুত বাড়িয়ে অন্তত ২৫০০ করা, এবং ডিজ়েল বাসের সংখ্যা ২৫০০-য় নামিয়ে আনার পরিকল্পনা হওয়া উচিত। এবং, এই বদলের প্রক্রিয়াটা চালিয়ে যেতে হবে, যত দিন না রাস্তায় সব বাসই বৈদ্যুতিক হয়। কাজটা খুব কঠিন নয়। ২০০৭-০৮ সালে যে ভাবে টু-স্ট্রোক অটো বন্ধ করে কলকাতায় ফোর-স্ট্রোক অটো চালু করা হয়েছিল, সেই পদ্ধতিতেই করা যেতে পারে। একই সঙ্গে শহরের বিভিন্ন স্থানে বৈদ্যুতিক বাসের ব্যাটারি রিচার্জ করার পরিকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

Advertisement


বৈদ্যুতিক বাসের ক্রয়মূল্য সাধারণ বাসের তুলনায় কিছুটা বেশি। তবে এই বাসের জ্বালানি-কুশলতা ডিজ়েল বাসের তুলনায় অনেক বেশি, এবং যে হেতু এক ইউনিট বিদ্যুতের দাম এক লিটার ডিজ়েলে চেয়ে অনেকটাই কম, তাই বৈদ্যুতিক বাস চালানোর দৈনন্দিন খরচও কম ডিজ়েল বাসের তুলনায়। বিশ্ব ব্যাঙ্কের রিপোর্ট অনুযায়ী, কলকাতায় বৈদ্যুতিক বাস চালানোর খরচ কিলোমিটার প্রতি ১৪ টাকা, সেখানে ডিজ়েল বাস চালানোর খরচ কিলোমিটারে ৩৫ টাকা। কম সুদে ব্যাঙ্ক ঋণের ব্যবস্থা করে বেসরকারি বাস মালিকদের বৈদ্যুতিক বাস কেনায় উৎসাহ দেওয়া যেতে পারে।


তিনচাকা বৈদ্যুতিক গাড়ির কথা বললে প্রথমেই টোটো-র কথা মনে হয়। আমাদের দেশে ই-রিকশা বলে যে গাড়ি এখন চলছে, সেগুলি ছোট শহরে যাত্রী পরিবহণে খুবই উপযোগী এবং বায়ুদূষণ মুক্ত। কিন্তু কলকাতার মতো বড় শহরে চলার উপযোগী নয়। মূল সমস্যা হল, এই গাড়ির সর্বাধিক গতিবেগ ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার মাত্র। এটা দেখা গিয়েছে যে, কোনও ব্যস্ত রাস্তায় অন্যান্য গাড়ির সঙ্গে যদি একটি কম গতিবেগসম্পন্ন গাড়িকে চলতে দেওয়া হয়, তা হলে রাস্তায় যান চলাচলের গতি সামগ্রিক ভাবেই কমে যায়। তাই ধীরগতির টোটোকে পেট্রল বা ডিজ়েলচালিত বাস, ট্যাক্সি বা প্রাইভেট গাড়ির সঙ্গে একই রাস্তায় এক সঙ্গে চলতে দিলে পেট্রল বা ডিজ়েল গাড়ি থেকে বায়ুদূষণের হার এখনকার তুলনায় আরও বাড়বে। তা ছাড়া, এই রিকশাগুলির কারিগরিও মজবুত নয়। কিন্তু কলকাতার মতো ঘন জনবহুল শহরে যেখানে অটো একটি গুরুত্বপূর্ণ যান, সেখানে বায়ুদূষণ কমাতে গেলে চলতি এলপিজি অটো বাতিল করে বৈদ্যুতিক অটো আনতেই হবে। এ জন্য আরও বেশি গতিসম্পন্ন ব্যাটারিচালিত অটো দরকার, যার সর্বাধিক গতিবেগ ঘণ্টায় অন্তত ৫০ কিলোমিটার হবে।


দূষণের মাত্রা কমাতে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যাও কমানো দরকার। তবে এটা নির্ভর করছে ব্যক্তিগত সচেতনতা এবং সরকারের উদ্যোগের উপর। উল্টে আমাদের দেশে ব্যক্তিগত গাড়ি কেনাকে উৎসাহ দেওয়া হয় কম সুদে ব্যাঙ্ক ঋণ দিয়ে। এটা অবিলম্বে বদলানো দরকার। সরকার পেট্রল ও ডিজ়েল গাড়ির উপর অতিরিক্ত ‘দূষণ ট্যাক্স’ বসিয়ে সেই টাকায় বৈদ্যুতিক গাড়িতে ভর্তুকি দিতে পারে।

এনার্জি সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়



Something isn't right! Please refresh.

আরও পড়ুন

Advertisement