ইউ আর আন্ডার সিসিটিভি সার্ভেল্যান্স’। আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ যান্ত্রিক চোখে লক্ষ করছে ব্যবস্থা: কখনও তার নাম রাষ্ট্র, কখনও কর্পোরেট,সঙ্ঘ বা দোকান-মালিক। মিশেল ফুকো ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিশ গ্রন্থে বেনথামের সূত্রে শুনিয়েছিলেন ‘প্যান অপটিকন’ নামক সর্বগ্রাসী এক কয়েদখানার প্রসঙ্গ। তার কেন্দ্রে এক জানলা বসানো মিনার থেকে চলে কয়েদিদের উপর অবিরাম নজরদারি। তার চাপে কয়েদিও ক্রমশ নিজেই নিজের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে। যা কিছু স্বাভাবিক নিয়মনিষ্ঠ আইনস্বীকৃত— সেটাই করতে থাকে। তার মনের গভীরে কাজ করে ক্ষমতার অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ।
মনে পড়ে রক্তকরবী নাটকের ‘নাট্যপরিচয়’ অংশ, “রাজমহলের বাহির দেয়ালে একটি জালের জানলা আছে। সেই জালের আড়াল থেকে মকররাজ তার ইচ্ছামত পরিমাণে মানুষের দেখাশোনা করে থাকেন।” নাটক শুরুর আগে: “এখানকার রাজা একটা অত্যন্ত জটিল আবরণের আড়ালে বাস করে। প্রাসাদের সেই জালের আবরণ এই নাটকের একটি মাত্র দৃশ্য।” আবার, রবীন্দ্রভবনে রক্ষিত ‘প্রস্তাবনা’র এক খসড়ায় আছে, “অদ্ভুত এই জানলা, জালের তৈরি। এর ভিতরকার রহস্য ও বাইরের লোক কিছুই জানে না।” ক্ষমতার সর্বময় নজরদারিতে দমবন্ধ যক্ষপুরীর কাহিনি শোনাচ্ছেন কবি। তার কেন্দ্রে রাজা ও তার অনুচর তথা মাতব্বরবৃন্দ; বড়, মেজো, ছোট সর্দার, মোড়ল। এই ব্যবস্থা একমুখী এক সর্বেক্ষণ প্রক্রিয়ায় মগ্ন, জালের জানলা যেন ক্ষমতার যন্ত্র-অক্ষি। গ্রন্থাকারে প্রকাশের একশো বছর পরেও এ নাটক নতুন বিশ্ব, তার যুক্তি ও প্রযুক্তির দম্ভ, নিয়ন্ত্রণ— সব সাম্প্রতিকের সঙ্গেই কালে-কালান্তরে সংলাপ চালাচ্ছে। গ্রন্থাকারে এ নাটকের প্রকাশ বিশ্বভারতীর গ্রন্থালয় থেকে ২৭ ডিসেম্বর ১৯২৬।
রক্তকরবী নাটকটি ‘সময়’ নিয়ে নিজেও আলোড়িত। প্রথমে পৌষের গানের পরিপ্রেক্ষিতে রাজার হুঙ্কার, ‘আমার সময় নেই, একটুও না’ আর ‘সময় নেই’; মধ্য পর্বে বিশুর উপস্থিতিতে, ‘এখনও সময় হয়নি’। শেষ পর্বে সময়ের প্রতিমা হয়ে দেখা দেয় নন্দিনী, তার হাতেই নির্ধারিত হয় সময়ের অভিমুখ: ‘রাজা, এইবার সময় হল।... আমার সমস্ত শক্তি দিয়ে তোমার লড়াই।’ রাজার জাল ও জালের জানলা ছিঁড়ে-ভেঙে নতুন কালের ইশারা। সময় আর বিজ্ঞানভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা তথা ধনতন্ত্রের বিরুদ্ধেও এ নাটকে তৈরি করা হয়েছে এক বিকল্প। বিপুল উৎপাদন ও সঞ্চয়ের কর্মযজ্ঞ, অন্তহীন বৈভব-লোভ-অত্যাচার-বঞ্চনার কাঠামো প্রকৃতপক্ষে ধরে থাকে কাল বা সময়ের রৈখিক চলন।
প্রথম আবির্ভাবেই কিশোর রক্তকরবী পৌঁছে দিয়ে যায় ‘সময় চুরি’ করে। বিশু সময়ের রৈখিক গড়ন আর উৎপাদন/সঞ্চয়ের চক্রকে পরিষ্কার করে, “পাঁজিতে তো দিনের শেষ লেখে না। এক দিনের পর দু’দিন, দু’দিনের পর তিন দিন। সুড়ঙ্গ কেটেই চলেছি— এক হাতের পর দু’হাত, দু’হাতের পর তিন হাত। তাল তাল সোনা তুলে আনছি— এক তালের পর দু’তাল, দু’তালের পর তিন তাল... ওদের কাছে আমরা মানুষ নই, কেবল সংখ্যা।” ধনতন্ত্র তথা শিল্পবিপ্লব-উত্তর পৃথিবীর এমনই দস্তুর। এই শ্বাসরুদ্ধ উৎপাদন চক্রের দিনানুদিনের বিরোধিতা করবে যে নাটক, রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন সেই ব্যবস্থার মৌল ‘দর্শন’ ভেঙেচুরে দিতে। তালগোল পাকিয়ে দিলেন কালানুক্রমেও। যে যুক্তি ও প্রযুক্তি দিয়ে যন্ত্রসভ্যতার উৎপাদন ব্যবস্থা এগোয়, তার বিপরীতে এল সময়ের ভিন্ন এক চেহারা। কাজের দিন আর ছুটির দিন মিলেমিশে এক ধরনের অনিবার্যতার কালক্রান্তিতে নিয়ে গেল নাটককে। নাটক জুড়ে, কালানুসারী ধনসম্পদ নির্মাণের বাস্তবতা চুরমার করার পটভূমি হিসাবে বহমান থাকে সময়ের এই ‘সমন্বয়ী’ প্রবাহ। হয়তো এ জন্যই ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান থেকে, ভিন্ন ভিন্ন মুহূর্তের মোকাবিলায় এ নাটক একশো বছর ধরে আবির্ভূত হয়। নানা রাজনৈতিক সামাজিক বাস্তবতায় তার সংলাপ নতুন মাত্রায় চলতে থাকে সমকাল-ভাবী কালের সঙ্গে। অতীতের সঙ্গেও।
শম্ভু মিত্র যখন ১৯৫৪-য় এ নাটকের মঞ্চায়ন ঘটান, তখন হয়তো নজর ছিল উগ্র জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা, এক-ঢালা শাসক স্বর আর সাম্যবাদের স্বপ্নের দিকে। আবার উৎপল দত্তের জপেনদা এ নাটক পড়তে চান নকশালবাড়ি আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে। বাদল সরকার পাঠ করতে চাইছেন সমকালীন আদর্শহীনতা ও অসাড় নগরজীবন মাথায় রেখে। আবার কৃষিজমি অধিগ্রহণের জোর-জবরদস্তির প্রেক্ষিতে ২০০৭-১০ কালপর্বে এবং পরেও এ নাটকের পাঠ-অভিনয় মঞ্চস্থ। শুভাশিস গঙ্গোপাধ্যায় এখনও ঘুরছেন গ্রাম মফস্সলের মাঠে-ঘাটে, দৃষ্টিহীন প্রান্তিক মানুষদের রক্তকরবী প্রযোজনা নিয়ে।
“এই যক্ষপুরে সর্দার আছে, মোড়ল আছে, খোদাইকর আছে, আমার মতো পণ্ডিত আছে— কোতোয়াল আছে, জল্লাদ আছে, মুর্দফরাশ আছে— সব বেশ মিলমিশ খেয়ে গেছে।” এ আমাদের চেনা সমসাময়িক পৃথিবী। সর্দার, মেজো সর্দার, ছোট সর্দার অনুবাদে হয়ে ওঠে ‘গভর্নর’ ‘ডেপুটি গভর্নর’ বা ‘অ্যাসিস্ট্যান্ট গভর্নর’; পৌরাণিক, লোকায়ত অনুষঙ্গ ভেঙে বর্তমানের রাষ্ট্ররূপ ‘ব্যবস্থা’ আর ‘যন্ত্র’ শব্দগুলি জরুরি হয়ে দেখা দেয়। অ্যান্ড্রুজ়কে লেখা চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ আমেরিকার ভয়াবহ নিপীড়ন ও বস্তুগ্রাসকে তুলনীয় করে দেখেছিলেন এ দেশে দেশপ্রেমের নামে মানবশোষণের নিরিখে। দেশ-কাল ভেঙে সে জন্যই রক্তকরবী নাটক উড়ে বেড়াতে পারে সময় থেকে সময়ান্তরে, রাষ্ট্রীয় নজরদারির যুগে; সাঁজোয়া বাহিনীর হত্যালীলা, জাতিদাঙ্গা, দেশদখল বা দলতন্ত্র কায়েমের বাস্তবতায়।
প্রায় ১১টি খসড়ায় এ নাটককে গড়ে তুলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। শুরু শিলং শহরে ১৯২৩-এর গ্রীষ্মে। খসড়ার পর খসড়া পেরিয়ে প্রথমে প্রবাসী-তে (১৯২৪) প্রকাশিত হয়। ওই বছরই ইংরেজি অনুবাদ রেড ওলিয়েন্ডারস বেরোয় বিশ্বভারতী কোয়ার্টার্লি (সেপ্টেম্বর, ১৯২৪) পত্রিকায়। ইংরেজি অনুবাদটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত ইংল্যান্ডে ১৯২৫-এ, বাংলায় নাট্যগ্রন্থ হিসাবে ১৯২৬-এ। রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় এক বারই মঞ্চায়িত হয়েছে নাটক রক্তকরবী, ৬ এপ্রিল ১৯৩৪-এ। তবে পরে নানা সময়ে খ্যাতকীর্তি মানুষেরা এ নাটকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। তৃপ্তি মিত্র পরিচালনা করেছেন এই নাটক, মহলা দিয়েছেন রামকিঙ্কর, অভিনয় করেছেন কোনও মঞ্চায়নে দেবব্রত বিশ্বাস ও উমা চট্টোপাধ্যায়, আবার অন্য প্রযোজনায় অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, কম্বিনেশন নাইট-এ অভিনয় করেছেন সন্তোষ দত্ত। ২০০৬-এ এ পরিচালনা করেছেন ‘তৃতীয় সূত্র’-এর পক্ষে সুমন মুখোপাধ্যায়।
নাটকের সবচেয়ে চমকপ্রদ ও অনন্য মোচড়, অধস্তন ক্ষমতাধারীদের হাতে রাজার প্রতারণা। যুগে যুগে ক্ষমতার উচ্চতম শৃঙ্গটিকে নানা প্রবঞ্চনায় বিদীর্ণ করার চক্রান্ত চালায় ক্ষমতালোভী কিছু প্রধান পদাধিকারী। ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ এই শঠতার কাহিনিতে রবীন্দ্রনাথ পুরো নাটকটিকে বিপ্লবের চিরাচরিত ভাষ্য বা অবয়বের বাইরে নিয়ে যান। প্রথমে গজ্জু পালোয়ান সে দিকে ইঙ্গিত করেছিল, তার পর নাটকের অন্তিমে সর্দার, মেজো সর্দার এবং মোড়লের যোগসাজশে রাজাকে ঠকানোর ষড়যন্ত্র তৈরি হতে থাকে। সর্দার বলে, “রাজার প্রতি কর্তব্যের অনুরোধেই রাজাকে ঠকাতে হয়, রাজাকে ঠেকাতেও হয়।” সেই প্রক্রিয়াতেই শেষে রাজার আর্তনাদ: “ঠকিয়েছে। আমাকে ঠকিয়েছে এরা।... আমার নিজের যন্ত্র আমাকে মানছে না।” এই জটিল ক্ষমতাতন্ত্র রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব উদ্ভাবন।
রক্তকরবী-র পাণ্ডুলিপিগুলির দিকে তাকালে দেখা যাবে, আঁকিবুকি থেকে ক্রমে গড়ে উঠছে অত্যাশ্চর্য সব রূপাবয়ব: আদিম জীবজন্তু, নারীমুখের আদল, পাখি বা মানুষের আকার-প্রকার। রক্তকরবী পাণ্ডুলিপিচিত্রে অক্ষরের কাটিকুটি ভেদ করে মাথা আর দেহ তোলে এক দানবিক হিংস্র মূর্তি: লাল, বাদামি আর সাদার মিশ্রণে সে স্পষ্ট; এক মূর্তিমান হিংস্রতা। ক্ষমতার যে কদর্য চেহারা মানুষকে ব্যক্তিসত্তা থেকে অবনমিত করে সংখ্যা বা পদনামে, সেই রাক্ষসকে রবীন্দ্রনাথ স্পষ্ট করে দেন।
১৯২৪-এ জাপানে শিক্ষাবিষয়ক এক ভাষণে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “আমরা জেলখানার জন্য বন্দি জুটিয়ে আনি, পাগলাগারদের জন্য রোগী, আমরা শিশুদের মনগুলিকেও তেমনই ফাটকে সীমাবদ্ধ করে তুলছি, ভেঙেচুরে দিচ্ছি তাদের অন্তর্লীন ক্ষমতা...’। ‘অন্তর্লীন’ শব্দটি লক্ষণীয়, ‘বন্দিশালা’ ‘অন্তর্লীন’ও হতে পারে। রক্তকরবী সেই আত্মবীক্ষণ, আত্ম-আবিষ্কারেরও নাটক।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)