E-Paper

এও কি পালাবদলের ইঙ্গিত

ইসলাম-অনুসারী আইনে প্রবল কড়াকড়ির জন্য ইরান পরিচিত। ১৯৭৯ সালে জনপরিসরে পুরুষ ও মহিলাদের মেলামেশা নিষিদ্ধ করেছিল।

প্রণয় শর্মা

শেষ আপডেট: ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:১৫

এ বার ইরান। পুলিশ-প্রশাসনের সঙ্গে সংঘর্ষে নেমে উত্তাল সেখানকার জনতা। ইতিমধ্যেই হত বেশ কিছু। সংবাদমাধ্যমে, সমাজমাধ্যমে ভেসে আসছে মারামারি হাতাহাতির রক্তাক্ত সব ছবি। আপাতকারণ, ক্রমশ বেড়ে চলা দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধি খেপিয়ে দিয়েছে মানুষকে। তবে তার পিছনে যে আরও গভীর কারণ আছে, বুঝতে অসুবিধা হয় না।

গভীর কোনও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ইরান, তা এমনিতেও স্পষ্ট। বাস্তবিক, এই সংঘর্ষ শুরুর আগে যখন সমাজমাধ্যমে ভেসে আসছিল আনন্দ-যাপনের ভিডিয়ো বা ছবি, তা দেখলে মনে হয়, বুঝি ইউরোপ-আমেরিকার কোনও দেশ। হাজার হাজার তরুণ-তরুণী, তাদের মাথা আবরণহীন, পরনে জিন্‌স আর ছোট হাতের জামা, পপ কনসার্টে গানের সঙ্গে সঙ্গে তারা লাফাচ্ছে, নাচছে, গাইছে। শহরের আর এক প্রান্তে এক দল তরুণ-তরুণী ব্যান্ড-এর হার্ড রক-এর তালে তালে মাথা ঝাঁকাচ্ছে। বার্লিন, প্যারিস, লন্ডন বা নিউ ইয়র্কে এমন দৃশ্য পরিচিত। কিন্তু এ সব ছবি তেহরানের।

ইসলাম-অনুসারী আইনে প্রবল কড়াকড়ির জন্য ইরান পরিচিত। ১৯৭৯ সালে জনপরিসরে পুরুষ ও মহিলাদের মেলামেশা নিষিদ্ধ করেছিল। সম্প্রতি দেখা গেল, অগণিত মানুষ ‘ডিজ়াইন সপ্তাহ’ উপভোগ করতে শহরে ঘুরছেন। বিশাল বিশাল রঙিন শিল্পকর্মের উন্মুক্ত প্রদর্শনী, আলো-সঙ্গীতের খেলা, গানবাজনার অনুষ্ঠান চলল শহরের বেশ কয়েকটি জায়গায়। বাইরের জগতের অনেকে যা দেখে হতবাক। এই তো সে দিনও চুল না-ঢেকে বেরোনোর জন্য প্রজাতান্ত্রিক ইরান মেয়েদের কী ভয়ানক শাস্তি দিল। ‘এমন ভাবে মাথা ঢাকা দিতে হবে যে, একটি চুলও দেখা যাবে না’, এমন বিধান মানতে বাধ্য করছিল। গত কয়েক বছর ইরানের মেয়েরা তেহরানের প্রশাসকদের সঙ্গে বার বার সংঘাতে জড়িয়েছেন। হিজাব পরার নিষেধাজ্ঞা তাঁরা অমান্য করেছেন। তবে কি ইরান বদলাচ্ছে?

পর্যবেক্ষকরা জানাচ্ছেন, গত সেপ্টেম্বরে ইজ়রায়েল এবং আমেরিকার সঙ্গে সংক্ষিপ্ত যুদ্ধে জড়ানোর পর থেকে চোখে-পড়ার মতো কিছু পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। গত কয়েক মাস অনেক বেশি মেয়ে জনপরিসরে ঘুরছেন মাথা না ঢেকেই। ব্যাপারটা যেন গা-সওয়া হয়ে উঠছে। মেয়েদের পোশাক নিয়ে সংঘাত চরমে উঠেছিল ২০২২ সালে, পুলিশি হেফাজতে বাইশ বছরের তরুণী মাহশা আমিনির মৃত্যুর পরে। ইরানি কুর্দ এই মেয়েটিকে পুলিশ ধরেছিল পোশাক বিধি ভাঙার জন্য। তাঁর মৃত্যুতে সারা দেশে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে।

প্রতিবাদের তীব্রতায় ধাক্কা খেলেও, ইরানের প্রশাসন দ্রুত দমন করে প্রতিবাদীদের। মানবাধিকার নিয়ে কর্মরত সংস্থা ‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল’ জানিয়েছে, ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী প্রতিবাদীদের উপর রাইফেল, শটগানও ব্যবহার করেছিল। নানা মানবাধিকার সংস্থার হিসাব, অন্তত ৫৫১ জন মানুষ প্রাণ দিয়েছেন। রাষ্ট্রপুঞ্জের তথ্য, এক হাজার জনেরও বেশি গ্রেফতার হয়েছেন। আর আজ? ইরানের অধিকাংশ শহরে মেয়েরা মাথা আবরণহীন রেখে, জিন্‌স আর স্নিকার পরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ক্যাফেগুলিতে হালকা সুরে বাজছে পাশ্চাত্য সঙ্গীত, ছেলে-মেয়েরা সময় কাটাচ্ছে এক সঙ্গে। হাত ধরাধরি করে তাদের হাঁটতেও দেখা যাচ্ছে। এমন নানা ছোট ছোট ঘটনা ফাটল ধরাচ্ছে সেই সব কঠোর সামাজিক বিধিতে, যেগুলোর জন্য ইরান বিশ্বের কাছে পরিচিত ছিল।

তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, এই আপাত-সহিষ্ণুতার পিছনে এখনও অন্ধকার। ইরানের ধর্মীয় নেতারা রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন-পীড়ন আরও তীব্র করেছেন। কয়েকশো সাংবাদিক, আইনজীবী, ছাত্রছাত্রী, লেখক এবং মানবাধিকার কর্মীকে হয়রান করা হয়েছে, তলব করে বন্দি করা হয়েছে গত কয়েক মাসে। প্রশাসন কৌশলী অবস্থান নিয়েছে— বাধা-নিষেধের দৃশ্যমান চিহ্নগুলিকে শিথিল করেছে, যাতে জনমত শান্ত থাকে। তলায় তলায় চলছে বিরুদ্ধ স্বরের কণ্ঠরোধ।

দীর্ঘ দিন পশ্চিমের দেশগুলির নানা বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে ইরানের আর্থিক অবস্থা এখন সঙ্কটজনক। চলছে তীব্র জলসঙ্কটও। বহু বছর রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামতি না হওয়ায় দেশের জল সরবরাহকারী ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। যার অন্যতম কারণ, টাকার অভাব। ওয়াশিংটনবাসী ইরান-বিশেষজ্ঞ আলেক্সা বাতান্তার মতে, প্রকাশ্যে নাচগান, মেলামেশার সুযোগ করে দেওয়া আসলে সরকারের এক সুচিন্তিত কৌশল। ক্ষমতার প্রধান সীমারেখাগুলির বিন্দুমাত্র নড়চড় হয়নি। এক দিকে প্রকৃত বিরোধিতা প্রকাশের সীমাকে কঠোর ভাবে বেঁধে দিয়ে, অন্য দিকে বেশভূষার বিধিতে শিথিলতা দেখিয়ে জনতার অবরুদ্ধ আবেগ মুক্তির একটা পথ করে দিচ্ছে সরকার।

ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্ব এখন বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে। ১৯৭৯ সালে ধর্ম-বিপ্লবের পরে এত বড় চ্যালেঞ্জ সেই নেতৃত্ব দেখেননি। গত জুন মাসে ইজ়রায়েলি হানায় ইরানের সামরিক এবং আণবিক ঘাঁটিগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই অঞ্চলে যারা ইরানের পরিচিত সহায়— গাজ়ায় হামাস, লেবাননে হিজ়বুল্লা এবং ইরাকের সামরিক শক্তি— তাদের শক্তি খর্ব হয়েছে। ইরানের আশঙ্কা, ইজ়রায়েল ফের আক্রমণ করবে। সেই সম্ভাবনা এড়াতে আমেরিকার সঙ্গে সংযোগ বাড়াতে চায় ইরান। ট্রাম্পের সঙ্গে মিত্রতা হলে ইজ়রায়েল সহসা আক্রমণ করতে চাইবে না। তাতে বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা উঠতে পারে, আর্থিক চাপ কিছুটা কমতে পারে। আমেরিকার সমর্থন পেতেই হয়তো মহিলা ও যুব প্রজন্মের উপর কড়াকড়ি শিথিল হচ্ছে। তাতে কি কাজ হবে? যদি তা হয়, তা হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক চিত্র বদলাবে বিরাট ভাবে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Tehran

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy