২০০৪ সালের এমনই এক শীতের সকালে সবে বড়দিনের রেশ কাটিয়ে জেগে উঠছিল পৃথিবী। স্থানীয় সময় আটটা নাগাদ সুমাত্রা দ্বীপের কাছে সমুদ্রের নীচে ধরা পড়ল এক তীব্র ভূমিকম্প। রিখটার স্কেলে ৯.৩ মাত্রার সেই কম্পনের প্রভাবে কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিশাল আকারের সুনামির ঢেউ তৈরি হয়ে ঘণ্টায় ৮০০ কিলোমিটার বেগে চার দিকে ছড়িয়ে পড়ল। প্রায় ৩০ মিটার পর্যন্ত উঁচু ঢেউয়ের আঘাতে সুমাত্রার আচেহ প্রদেশের জনপদগুলি ধ্বংস করে সেই দুর্যোগ এগিয়ে গেল শ্রীলঙ্কা, ভারত এবং তাইল্যান্ডের উপকূল তছনছ করতে। সেখানে ধ্বংসলীলা চালিয়ে আরও এগিয়ে গেল আফ্রিকার দিকে। ভারত মহাসাগরের এই ঘটনার পর সুনামির দুর্যোগ মোকাবিলায় আলাদা গুরুত্ব দিতে শুরু করেন বিজ্ঞানীরা ও বিপর্যয় মোকাবিলায় নিয়োজিত রাষ্ট্রপুঞ্জের সংস্থাগুলি। এক দিকে যেমন আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য সুনামির পূর্বাভাস ব্যবস্থা গড়ে তোলার উপর জোর দেওয়া হয়, তেমনই সুনামির ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রতটের জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই বিপর্যয়ের আঘাত মোকাবিলা করার সহনশীলতা গড়ে তোলার দিকে নজর দেওয়া হয়।
এই দ্বিতীয় পর্যায়ের পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল ঝুঁকিপূর্ণ গ্রামগুলিকে সামগ্রিক ভাবে সুনামি মোকাবিলায় তৈরি রাখা। এই লক্ষ্যে ইউনেস্কো-র ইন্টারগভর্নমেন্টাল ওশনোগ্রাফিক কমিশন (ইউনেস্কো-আইওসি) যে কর্মসূচি শুরু করেছে, তার নাম ‘সুনামি রেডি’। এর মূল লক্ষ্য— উপকূলীয় এলাকার মানুষ এবং জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের জরুরি বিপর্যয় ব্যবস্থাপনায় যুক্ত সংস্থাগুলির মধ্যে সমন্বয় সাধন করে তাদের সুনামির মোকাবিলায় আরও সক্ষম করা। আর সেই সক্ষমতার জোরে সুনামির সময় জীবন ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি কমানো। আঞ্চলিক নির্দেশিকা অনুযায়ী, কোনও এলাকা বা জনপদকে ‘সুনামি রেডি’ হিসেবে স্বীকৃতি পেতে হলে ১১টি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণ করতে হয়। যে সব এলাকা সফল ভাবে সুনামির ঝুঁকি মোকাবিলার ক্ষেত্রে নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে পারে এবং এই সব শর্ত পূরণ করে দেখায়, তাদের ইউনেস্কো-আইওসি থেকে একটি স্বীকৃতির সনদপত্র দেওয়া হয়।
শর্তগুলির মধ্যে প্রথমেই দেখা হয় যে, এলাকায় সুনামির জল ঠিক কত দূর আসতে পারে, তার মানচিত্র তৈরি করে ঝুঁকির এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে কি না। তার পর সেই সব ঝুঁকিপূর্ণ নিচু এলাকায় বসবাসরত জনসংখ্যা ও সম্পদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করে রাখতে হয়। গুরুত্ব দেওয়া হয় সুনামির ঝুঁকি কমানোর জন্য আগে থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ ও সম্পদের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার উপর। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে, বিপদ দেখা দিলে কোন দিক দিয়ে যেতে হবে, সেই মানচিত্র এবং দিক-নির্দেশক সাইনবোর্ড রাখতে হয়।
‘সুনামি রেডি’ হিসেবে মান্যতা পাওয়ার জন্য সচেতনতামূলক কর্মসূচির আলাদা গুরুত্ব থাকে। সহজ ভাষায় তৈরি শিক্ষামূলক প্রচার পুস্তিকা বা লিফলেটের ব্যবস্থা করতে হয়। সচেতনতা বাড়ানোর জন্য অনুষ্ঠান বা প্রচারের আয়োজন করতে হয় বছরে অন্তত এক বার। এ ছাড়াও সুনামির আগাম সতর্কবার্তা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য অন্তত তিনটি কার্যকর উপায় থাকতে হয়। বিপদে এলাকা ছেড়ে নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার পথের নির্দেশ দিয়ে একটি পরিষ্কার মানচিত্র তৈরি করে সবার কাছে পৌঁছে দিতে হয়।
এ ছাড়াও প্রশাসনিক স্তরে কিছু প্রস্তুতি রাখতে হয়। যেমন, জরুরি অবস্থা মোকাবিলার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা গাইডলাইন তৈরি করে রাখতে হয়। দুর্যোগের সময় জরুরি কাজগুলো করার মতো দক্ষতা এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আগে থেকে মজুত করে রাখতে হয়। ২৪ ঘণ্টা যে কোনও সময় সুনামির সতর্কবার্তা পাওয়ার জন্য অন্তত তিনটি আলাদা মাধ্যম বা ব্যবস্থা করে রাখতে হয়।
হায়দরাবাদে অবস্থিত ‘ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সেন্টার ফর ওশন ইনফরমেশন সার্ভিসেস’ ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ‘সুনামি রেডি’ উদ্যোগটি কার্যকর করার ক্ষেত্রে মূল সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করছে। এই কেন্দ্রটি বিশ্ব জুড়ে হওয়া ভূমিকম্পের উপরও নজর রাখে। শীঘ্রই ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে ভারতে ১০০টিরও বেশি ‘সুনামি-প্রস্তুত’ গ্রাম থাকবে। এই বিশেষ কৃতিত্ব অর্জনের দিক থেকে ভারত হবে এই অঞ্চলের প্রথম দেশ।
ওড়িশার ছয় জেলার ২৬টি উপকূলীয় গ্রাম ইতিমধ্যেই এই স্বীকৃতি পেয়েছে। এখন সেই তালিকায় আরও ৭২টি গ্রাম যুক্ত হতে চলেছে। এ ছাড়া গুজরাত, কেরল, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের মতো রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোও কিছু গ্রাম বেছে নিয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ বা এপ্রিল মাসের মধ্যে কেরল তাদের ন’টি উপকূলীয় গ্রামকে এই উদ্যোগের আওতায় আনার প্রস্তাব দিয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের উপকূলীয় অঞ্চলে সুনামির যথেষ্ট ঝুঁকি রয়েছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত ভারতের পূর্ব উপকূলে ‘সুনামি রেডি’ স্বীকৃতির বেশির ভাগই গিয়েছে ওড়িশার ঝুলিতে। অন্য দিকে, পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন অঞ্চল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার কাজ বেশ সক্রিয় ভাবে করছে। রাজ্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উপকূলীয় বিপদ মোকাবিলায় বিভিন্ন পরিকল্পনা চালু করেছে, তবে ‘সুনামি রেডি’ স্বীকৃতি পাওয়ার লক্ষ্যে এ রাজ্যের তরফে কতটা কাজ হয়েছে, সেই তথ্য এখনও সুলভ নয়। বিপর্যয় মোকাবিলায় রাজ্যের প্রস্তুতিকে অনেকটা এগিয়ে দিতে পারে এই কার্যক্রম।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)