যত দিন কলকাতায় পড়ানোর চাকরি ছিল, ছাব্বিশে জানুয়ারি একটা নির্ভেজাল ছুটির দিন পাওয়া যেত— দেরিতে ঘুম থেকে উঠে একটু লুচি আর আলু-ফুলকপির ছেঁচকি। বছর দশেক আগে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে চাকরি করতে এসে হল ভারী মুশকিল, শুধু যে ভোরবেলায় প্রাতঃকৃত্য ও স্নানাদি সমাপন করে ফ্ল্যাগ তুলতে দৌড়তে হবে তা-ই নয়, আমার সমবেত সহকর্মীদের হরেক অক্টেভের সঙ্গে গলা মিলিয়ে জাতীয় সঙ্গীত গাইতে হবে, স্বাধীনতা, সংবিধান, জাতি, নাগরিকত্ব, প্রজা, তন্ত্র, ইত্যাদি ভারী ভারী বিষয় নিয়ে বক্তৃতাও দিতে হবে। প্রথম বার ব্যাপারটা সহজ ছিল। দেশ স্বাধীন হয়েছে, সংবিধান হাতে এসেছে তো কী হয়েছে, দারিদ্রের বিরুদ্ধে, জাতপাতের বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই চলছে, চলবে, সে লড়াইয়ে আমরা সবাই শরিক, ইত্যাকার হাবিজাবি বলে পার পেয়ে গেলাম, সাঁ করে হাতে এসে গেল শিঙাড়া-খাস্তা কচুরি-কালাকাঁদ-বালুশাহি ভর্তি প্যাকেট। পরের তিন বারও ওই সবই একটু অদলবদল করে চালিয়ে দিলাম, ওই সাম্প্রদায়িকতাকে আগে টেনে এনে, জাতপাতকে একটু নামিয়ে দিয়ে, ওই আর কী! অনেক দিন আগে ক্লাসে উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারতীয় গণতন্ত্রের ইতিহাস পড়ানোর স্মৃতি খুব কাজে লাগত।
এ ভাবেই দিব্যি চলছিল। ঠিকই, প্রজাতন্ত্র বা স্বাধীনতা দিবসে পতাকার তলায় দাঁড়িয়ে একশো বছর ওই একই কথা বলে চালিয়ে দেওয়া যায়, উতরে দিলেই মিষ্টির প্যাকেট আর গরম চা। কিন্তু ভিক্টোরিয়ায় সিআইএসএফ-এর সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষীদের মোতায়েনের সময় থেকেই হল মুশকিল। আমি ওই আগের মতোই, পাড়ার ক্লাবের স্টাইলে চালিয়ে দেওয়ার মতলবে ছিলাম, কিন্তু সিআইএসএফ কম্যান্ডার তাঁর আগ্নেয়াস্ত্রে আলতো করে হাত রেখে এক সুভদ্র দার্ঢ্যের সঙ্গে বললেন, আজ থেকে কুচকাওয়াজ শুরু। ব্যস, আর যায় কোথায়— উঠিল বিশ্বে সে কী কলরব! আমি গাড়ি থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গেই এক ঝাঁক জওয়ান ওয়াঘা স্টাইলে মার্চ করতে করতে আমাকে নিয়ে গেলেন এক সুরম্য মঞ্চে, আমার অপটু টানে শ্বেতশুভ্র মর্মরপ্রাসাদের সামনের বিশালাকার সবুজ লনে পঁয়ত্রিশ ফুট উচ্চতায় উঠে গেল জাতীয় পতাকা, ঝরে পড়ল এক রাশ ফুল, চুলচেরা বাহান্ন সেকেন্ডের ‘জনগণমন’ শুরু হতেই হাত বুকের উপর রাখব না মিলিটারি স্যালুট স্টাইলে মাথায় ঠেকিয়ে, না বুঝতে পেরে দু’পকেটে হাত ঢোকালাম বুঝভুম্বুল আমি, আর পিছন থেকে কম্যান্ডার সবার অলক্ষ্যে আলতো করে আমার হাত দু’টি আমারই পকেট থেকে বার করে দু’পাশে নামিয়ে দিলেন।
গান শেষে স্টেজ থেকে নেমে আমি যথাসাধ্য গাম্ভীর্যে নিজেকে মুড়ে নিয়ে একটা গার্ড অব অনার নিলাম। তার পর আবার আমার বক্তৃতার পালা, এ বার এক অন্যতর ভারতবর্ষের সামনে, যেখানে সামনে জমায়েত দেশের হরেক প্রান্তের মানুষকে নিয়ে তৈরি-করা এক রক্ষীবাহিনী। নার্ভাস লাগছিল, ভেবেছিলাম, পরশপাথর ছবিতে মঞ্চাসীন শ্রী পরেশচন্দ্র দত্তকে সন্তোষ দত্ত যে কালজয়ী স্টাইলে ইনট্রোডিউস করেছিলেন, আমার অবস্থাও তেমনই হবে। কিন্তু হয়নি, ভারতমাতা বাঁচালেন। এক বহুভাষী, বহুত্ববাদী দেশের যথার্থ মহানায়কের স্টাইলে আমার ভিতর থেকে কেউ বলে উঠল, “দোস্তোঁ, ইয়ে, মানে, হমারে সারে কলিগস, থ্যাংক ইউ সো মাচ ফর কামিং হিয়ার অন আ কোল্ড মর্নিং, আমার তরফ থেকে আপ সবকো প্রজাতন্ত্র দিবস কে শুভকামনায়েঁ…।”
স্বাধীনতা বা প্রজাতন্ত্র দিবসের এই ঝিঙ্কুচিকুরের তুলনায় ২৬ নভেম্বর বাধ্যতামূলক ‘সংবিধান দিবস’ পালন করাটা আমার কাছে বরাবরই মনে হয়েছে নস্যি। বক্তৃতা দেওয়ার বালাই নেই, সরকারের নির্দেশমতো সংবিধানের প্রস্তাবনার ইংরেজি আর হিন্দি ভাষ্যের কয়েকশো করে ফোটোকপি বানিয়ে শীতের কবোষ্ণ রোদের দিকে পিঠ করে সহকর্মীদের সঙ্গে হোঁচট খেতে খেতে পাঁচ মিনিটে পড়ে নিলেই আবার সেই মিষ্টির প্যাকেট আর চা। দেশের নানান জায়গায় যখন আম্বেডকরের মূর্তি ভাঙা হচ্ছে, উন্নাও বা হাথরসে যখন গণধর্ষণ ও হত্যা, তখন দৃপ্তকণ্ঠে বেশ বলে গিয়েছি, “এতদ্দ্বারা ইস সংবিধান কো অঙ্গীকৃত, অধিনিয়মিত অউর আত্মার্পিত করতে হ্যায়।” গণতান্ত্রিক দেশকে ভবিষ্যতের জন্য বাসযোগ্য করে তোলার এই সাংবিধানিক অঙ্গীকারের আকুতি জানানোর জন্য কোনও কোনও প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা এগুলো পড়ার সময়ে নাৎসি স্যালুটের স্টাইলে হাত তুলে থাকতেন।
সাংবিধানিক গণতন্ত্র, স্বাধীনতা আন্দোলন ইত্যাদির নানাবিধ সরকারি যাগযজ্ঞে অনেক দিন অংশগ্রহণ করে আমার এক ধরনের জগাখিচুড়ি ভাষায় শূন্যগর্ভ বক্তৃতা দেওয়ার ঈষৎ দক্ষতা জন্মেছে। হিন্দি ভাষার পারঙ্গমতাও বেড়েছে, নিঃসন্দেহে। এই তো, বছর চারেক আগেই, ভিক্টোরিয়ায় যুদ্ধপরিস্থিতি, বিকেলবেলা তার নতুন গ্যালারি ‘বিপ্লবী ভারত’ রিমোটের সুইচ টিপে দিল্লি থেকে উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী। সকাল সাড়ে এগারোটায়— চার দিকে যখন ছত্রভঙ্গ অবস্থা— প্রধানমন্ত্রীর অফিসের এক সেকশন অফিসার ফোনে ধরলেন আমাকে। কথোপকথন হল এই রকম:
অফিসার: আচ্ছা, আজ শামকো পর্ধানমন্ত্রীজি ইয়ে সারে বাংলা শব্দ বোলেঙ্গে। আপ এক বার চেক কিজিয়ে ইয়ে সহি হ্যায় ইয়া নহী।
আমি: হাঁ হাঁ, বাতাইয়ে।
অফিসার: ইয়ে সহি হ্যায়? একবার বিদায় দে মা ঘরে আসি?
আমি: নহী নহী, ঘরে নহী, ঘুরে হ্যায়, একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি।
অফিসার (নার্ভাস): ঘরে নহী, ঘুরে হ্যায়? ইস কা মতলব ক্যা?
আমি: ইস কা মতলব, ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা।
অফিসার (তবুও নার্ভাস): আপ হানড্রেড পারসেন্ট সহি তো বোল রহে হ্যায়? ইয়ে বিলকুল ঠিক হ্যায়, না?
আমি বুঝতে পারি, অফিসার সিঁটিয়ে আছেন, একটু ভুল হলেই ওঁর পোষ্য কুকুর-বেড়ালেরও চাকরি চলে যাবে। আমি উত্তেজিত ভাবে বলি, “আরে ইয়ে বহুত ফেমাস সং হ্যায়, ইস কা মতলব, মা, আভি কে লিয়ে ম্যায় যা রহা হুঁ, লেকিন কভি আলবিদা না কহনা, ম্যায় ওয়াপস লট আউঙ্গা আপকে পাস। আপ বিলকুল ফিকর মাত কিজিয়ে। ইয়ে পর্ধানমন্ত্রীজি কি ম্যাটার হ্যায়, ম্যায় আপকো টু হানড্রেড পারসেন্ট সহি বোল রহা হুঁ...।
হঠাৎ সবিস্ময়ে আবিষ্কার করি, হুবহু ‘পর্ধানমন্ত্রীজি’র স্টাইলেই বলছি। স্বাধীনতা, দেশ, গণতন্ত্র, ইত্যাদির ঔপচারিকতায় কনট্রিবিউট করতে পেরে আমার, ওই চাপসঙ্কুল পরিস্থিতিতেও একটা ফিল-গুড ফিলিং হতে থাকে। সন্ধেয় বড় পর্দায় প্রধানমন্ত্রীর স্বভাবসিদ্ধ দীর্ঘ বক্তৃতা যখন চলছে, তখন তার একটা অংশ আমি হাসিমুখে পার্শ্ববর্তিনীর কানে কানে অফিসের নাটকের প্রম্পটারের স্টাইলে ফিসফিস করে আওড়াতে থাকি, কারণ ওটা তো আমারই লেখা।
এ ভাবেই বেলা বয়ে গেল, ছায়ারা দীর্ঘতর হল। আমার তেষট্টি বছর বয়স হল, আমি এখন সিনিয়র সিটিজ়েন, প্রবীণ নাগরিক। কয়েক বছর ধরেই লক্ষ করছি যে রাস্তায় অল্পবয়সি ছেলেমেয়েরা আমাকে কারণে-অকারণে জেঠু বলে ডাকছে, মুখ ফস্কেদাদুও দু’-এক বার। মনে হয়, আচ্ছা, তা হলে কি বুড়ো হয়ে গেলাম?
সান্ত্বনার জন্য আমাদের গণতন্ত্রের দিকে, সংবিধানের দিকে তাকাই। তারা সুপারসিনিয়র সিটিজ়েনশিপের দোরগোড়ায়, কিন্তু আমার তো তাও শুগার-প্রেশার-কোলেস্টেরল নিয়ে চলে যাচ্ছে, তাদের মতো জরার চিহ্নলক্ষণ ফুটে ওঠেনি। মনে হয়, এই বেশ ভাল আছি, ধর্মেও আছি, জিরাফেও। বিলকিস বানো, অ্যাঞ্জেল চাকমাকে নিয়ে ওয়টস্যাপে বন্ধুদের কাছে ক্রোধও উগরে দিচ্ছি, আবার ফুল-টুল সাজিয়ে পতাকাও তুলছি, যদিও সে পতাকা ‘বহিবারে’ ‘শকতি’ আর অবশিষ্ট নেই।
আমারই দুর্ভাগ্য, এমন ঠিক কেউ আর অবশিষ্ট নেই, যাকে অকপট বলব, ‘আমি কীরকম ভাবে বেঁচে আছি তুই এসে দেখে যা নিখিলেশ’।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)