E-Paper

হিজাব, যে যেখানে দাঁড়িয়ে

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বিহারের শংসাপত্র প্রদানের অনুষ্ঠানের দিকে তাকানো যাক। ঘটনাটি এত দিনে জানা, তবু বিস্ময়ের শেষ হয় না। ডাক্তারি পরীক্ষায় স্কলারশিপ পেয়েছে যে ছাত্রী, সে হিজাব পরে থাকুক অন্য কোনও ধর্মীয় পোশাক পরে থাকুক, তাতে কি সত্যিই কিছু যায় আসে?

ঈশা দাশগুপ্ত

শেষ আপডেট: ০৬ জানুয়ারি ২০২৬ ০৫:১৯

তিন দশক আগে মুক্তিপ্রাপ্ত একটি চলচ্চিত্রে প্রায় একই রকম দৃশ্য ছিল। তার প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন, দৃশ্যটিও মূলত হাস্যরসাত্মক। নায়িকা, নায়িকার বান্ধবী দু’জনেই একই রঙের বোরখা, হিজাব ও নিকাব পরিহিতা, তাই উপায়ান্তর না দেখে, নিকাব তুলে দেখছেন নায়ক।

এই দৃশ্য নিয়ে জল অনেক দূর গড়িয়েছিল। ছবিটি কিছু দিনের জন্য নিষিদ্ধ ছিল, পরিচালকের উপরেও বোমা আক্রমণ হয়। ছবিটির নাম বম্বে, পরিচালকের নাম মণিরত্নম। হিন্দু মুসলিম প্রেম, বিয়ে ও বাবরি মসজিদ দাঙ্গার পরিপ্রেক্ষিতে সংবেদনশীল এক উপস্থাপনা। হিজাবের দৃশ্যটি ছাড়াও এর মূল বিষয়বস্তু নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ ছিল, তাই সেই সময়ের ইন্টেলিজেনশিয়া বা বৌদ্ধিক সমাজ মণিরত্নমের পক্ষে ছিল।

এ বার ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বিহারের শংসাপত্র প্রদানের অনুষ্ঠানের দিকে তাকানো যাক। ঘটনাটি এত দিনে জানা, তবু বিস্ময়ের শেষ হয় না। ডাক্তারি পরীক্ষায় স্কলারশিপ পেয়েছে যে ছাত্রী, সে হিজাব পরে থাকুক অন্য কোনও ধর্মীয় পোশাক পরে থাকুক, তাতে কি সত্যিই কিছু যায় আসে? তবু নিজের পক্ষে রসিকতার যুক্তি দিয়েছেন নীতীশ কুমার। বলেছেন, আলাদা করে কাউকে বিব্রত করার কোনও ইচ্ছা ছিল না। ছাত্রীটির মুখ দেখা যাচ্ছিল না, তাই মজার ছলে হিজাব সরিয়েছিলেন তিনি।

মজা করেও কি কারও পোশাকের কোনও অংশ স্পর্শ করা যায়, সরিয়ে ফেলা যায়? মুসলমান ছাত্রীটির হিজাবের সঙ্গে কি অমুসলিম ছাত্রীর পোশাকের সঙ্গে ওড়না বা চুনরি ব্যবহারের তুলনা করা যেতে পারে না? তার দেহ থেকে সেই ওড়না কি শুধু ‘মজার ছলে’ টেনে নেওয়া যায়?

আর যদি সেই পোশাকের সঙ্গে যুক্ত থাকে ধর্মীয় ভাবাবেগ? পুরুষ ছাত্রের প্রথা বিশেষে ব্যবহৃত পাগড়ির সঙ্গে তুলনা করা চলে। সেই বিশেষ ধর্মাবলম্বী ছাত্রের পাগড়ি কি খুলে নিতে পারতেন নীতীশ কুমার? দাঙ্গা পরিস্থিতির ভয়ে, বা ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাতের ভয়ে পিছিয়ে যেতেন না কি? কিন্তু এ ক্ষেত্রে কোনও উত্তেজনাই হল না। প্রতিবাদ হয়তো হল কিন্তু তত কিছু নয়। সাহস যে কেউ পেল না, তার কারণ কি মেয়েটির লিঙ্গপরিচয় এবং ধর্মপরিচয়?

অদ্ভুত সমাপতন। প্রায় একই সময়ে কলকাতাতেও ঘটল একই রকম ঘটনা। প্রেক্ষিত আলাদা, কিন্তু লক্ষ্য সেই মুসলিম ছাত্রী। বারংবার বলা হচ্ছে, অধ্যাপিকা ব্যক্তিগত ভাবে ক্ষমা চেয়েছিলেন ছাত্রীটির হিজাব খুলে পরীক্ষা করার আগে। তাকে আলাদা ঘরে নিয়ে গিয়েও এই প্রক্রিয়া করা হয়েছে। এও যেন নীতীশ কুমারের রসিকতার যুক্তির মতো। ক্ষমা স্বীকারে অধ্যাপিকার ব্যক্তিগত অন্যায় ব্যবহারের ভার লাঘব হয় ঠিকই, কিন্তু হিজাব খুলে ছাত্রীটিকে পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত তো ব্যক্তিগত হতে পারে না, প্রাতিষ্ঠানিক হতে হয়। প্রতিষ্ঠান ক্ষমা স্বীকার করেছে কি?

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার হলে থাকার সুবাদে বিষয়টির সঙ্গে কম পরিচিতি নেই। দেখেছি, প্রথমেই হিজাব পরিহিত ছাত্রীদের দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করেন অনেকে। “ওই মেয়েগুলোর দিকে বেশি করে নজর রাখিস।” কেন রাখব? তার পোশাক কেন পাশের মেয়েটির সালোয়ার-কামিজ বা টিশার্ট জিন্‌স-এর সঙ্গে একই দৃষ্টিতে বিবেচিত হবে না? সংবিধানের ধর্মীয় সাম্যের ধার লঙ্ঘিত হবে কেন?

প্রতিযুক্তিতে কোনও অভিজ্ঞ শিক্ষক অধ্যাপক হয়তো বলবেন, তাঁরা কখনও এ রকম কোনও ছাত্রী হয়তো পেয়েছেন, যারা তাদের বিশেষ পোশাকের সুবিধা নিয়েছিল। হিজাবের মধ্যে থেকে হয়তো আবিষ্কৃত হয়েছিল নকল করার কাগজ। তা তো আবিষ্কৃত হয়েছে হিজাব না-পরা ছাত্রীর ক্ষেত্রেও। তবু হিজাব পরা ছাত্রীটির কথাই বলা হবে।

মনে পড়ে যায় ওরহান পামুকের স্নো উপন্যাসটির কথা। তুর্কিয়ে দেশে কামাল পাশা ধর্মনিরপেক্ষ সরকার গঠনের পরে মহিলাদের হিজাব না পরার স্বাধীনতা দেন। কিন্তু সেই স্বাধীনতাই পরবর্তীকালে হয়ে ওঠে বাধ্যতামূলক। যে মেয়েরা হিজাব পরিধান করতে চাইছে, তারা সরকার ও প্রশাসনের রোষের মুখে পড়ে। কোনও স্বাধীনতা বাধ্যতামূলক হয়ে গেলে তা আর স্বাধীনতা থাকে না, এই কথা তো অমর্ত্য সেনই বলেছেন। প্রিয় বই বন্দুকের নলের সামনে বসে পড়তে হলে সেই বই আর প্রিয় থাকে না।

তাই বিষয়টি কোনও ধর্ম পর্দাপ্রথা সমর্থন করে বা করে না-র নয়— বিষয়টি যিনি ঘোমটা বা বোরখা ব্যবহার করছেন তার ইচ্ছে বা অনিচ্ছের। খুব রোদে আমি বা আপনি মাথায় ঘোমটা দিলাম, আমাদের ইচ্ছা। তেমনই মেয়েটির হিজাব পরিধানও হতেই পারে তার ইচ্ছে। কেউ তাকে বাধ্য করেনি। অবশ্যই সামগ্রিক পিতৃতন্ত্র ও তার থেকে সৃষ্ট প্রথার মনস্তত্ত্বের উপরে প্রভাব তা হিন্দু মুসলিম উভয় সমাজের মহিলাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তা অস্বীকার করা চলে না। আমি বা আপনি হয়তো পিতৃতন্ত্রের প্রভাবেই সিঁদুর ঠেকাই কপালে, আধুনিকতাকে ক্ষুণ্ণ না করে প্রায় অদৃশ্য রাখি সেই পালন। আমাকে আপনাকে কেউ প্রত্যেক দিন জোর করে না। ছাত্রীটিকেও রোজ কেউ হিজাব পরতে জোর করে না। লুকিয়ে থাকা পিতৃতন্ত্রের প্রভাব তার মধ্যে থাকা সম্ভব, আপনার-আমার মতোই। কিন্তু আমাদের থেকে সে তবু আলাদা, হিজাবের জন্য তাই তাকে প্রতি দিন প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়।

‘হিজাব’ ওদের মেয়েদের, ‘আমাদের’ মেয়েদের নয়, এই ওরা-আমরা হিসাবের মধ্যেই আমরা তলিয়ে যাব, আরও বেশি করে?

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Ritual Indian Constitution

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy