প্রশ্ন: কলকাতায় যখন পড়াশোনা করতেন, সেখানে আশেপাশে সবাই উচ্চবর্ণের। জেএনইউ’তে গিয়ে দেখলেন, অন্য রকম?

অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়: জেএনইউ’তে গিয়ে দেখলাম, কাস্ট সেখানে খুব বড় ব্যাপার। কে কোন কাস্টের, সেটা সব্বাই জানে। অমুকে মৈথিলী ব্রাহ্মণ না বিহারের তফসিলি জাতির, সেটা অত্যন্ত গুরুতর প্রশ্ন। জাতপাতের বৈষম্য, তা নিয়ে ক্ষোভবিক্ষোভ, এ সবই সেখানে প্রবল। পশ্চিমবঙ্গ থেকে গিয়েছি, উচ্চবর্ণের সন্তান, জাতপাতের লড়াই কাকে বলে কোনও দিন জানি না, জেএনইউ’তে হাজার রকমের বিভাজন। এই অভিজ্ঞতা থেকে বড় শিক্ষা পেয়েছিলাম বলে মনে করি। এ নিয়ে লিখেওছি। জেএনইউয়ের সুবর্ণজয়ন্তীতে একটি সঙ্কলন বেরোচ্ছে, সেখানে জাতপাতের চেতনা নিয়ে লিখেছি। জাতপাতের লড়াই নয়, চেতনা। ওখানে কেউ যখন কারও কাস্টের কথা বলত, সাধারণত বিবাদের সুরে বলত না। এই দিক থেকে জেএনইউ আমার শিক্ষার একটা বড় অঙ্গ। তবে সেটা শিক্ষার একটা বিশেষ দিক।

প্র: এটাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা?

উ: এটাই প্রধান শিক্ষা। কাস্ট এবং দারিদ্র। জেএনইউ’তে অনেকে ছিল যারা প্রচণ্ড গরিব।

প্র: কলকাতায় নয়?

উ: প্রেসিডেন্সিতে নয়। ওখানেও নানান ধরনের আর্থিক অবস্থার অনেকে যেত, অনেকেই ছিল দরিদ্র, তাদের চিনতাম, তাদের সঙ্গে ক্যারম খেলতাম। এবং তাদের রাজনৈতিক মতামত প্রায়শই আমার থেকে আলাদা হত। তাদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে জানতে পারতাম যে জীবন সম্বন্ধে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি আমার থেকে কতটাই অন্য রকম। শিক্ষা হিসাবে এটা ছিল দারুণ ব্যাপার। কিন্তু তারা আমার বুদ্ধিচর্চার শরিক ছিল না। তাদের সঙ্গে অর্থনীতি বা ইতিহাস বা রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করতাম না।

প্র: তার মানে আমাদের জগৎটা ছিল আমাদের মতো লোকদেরই নিয়ে?

উ: হ্যাঁ। আর হঠাৎ এমন এক জগতে গিয়ে পড়লাম যেখানে আমার মতো লোক খুব কম। অনেকে নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের, বা আরও দরিদ্র। কেউ ওড়িশার ছোট চাষির ছেলে। অত্যন্ত মেধাবী। এক জন ছিল, ব্রাহ্মণ, কিন্তু বাবা ছোট চাষি, টাকাপয়সা একদম নেই। একেবারে অন্য একটা জগৎ।

প্র: সকলের সঙ্গে সমান ভাবে মিশতেন?

উ: সমান ভাবে কি না সেটা ওরা বলতে পারবে, তবে মিশতাম।

প্র: রাজনীতি থেকে শিক্ষা, সব জায়গায় উচ্চবর্ণের দাপট আর তার ফলে বৈচিত্রের অভাব, এটাই তবে পশ্চিমবঙ্গের গৌরবহানির কারণ?

উ: কথাটা ভেবে দেখার মতো। আমি কিন্তু বলিনি। কথাটা আপনার। তবে আমি মনে করি আপনার এই কথাটা ঠিক হতেই পারে। দলিত আন্দোলনের কথা ভাবুন। মরাঠি দলিত আন্দোলনের সম্পর্কে কিছু কিছু কথা কিন্তু আমি জানি। আমার মা মরাঠি সেই সূত্রেই জানি। পশ্চিমবঙ্গে কি দলিত আন্দোলন কিছু আছে বা হয়েছে? জানি না, কিন্তু এটা বলতে পারি যে, কখনও শুনিনি।

প্র: এখানে ‘আমরাই’ সবাই।

উ: ঠিক। ‘আমরাই’ সবাই। কিন্তু তার একটা কারণ এই যে, অন্যদের সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। মহারাষ্ট্রে কিন্তু খুব প্রাণবন্ত দলিত আন্দোলন আছে। মরাঠি সংস্কৃতিতে কাস্টের ব্যাপারটা অনেক বেশি দ্বন্দ্বসংঘাতে ভরা, কিন্তু তার ফলে সাংস্কৃতিক লেনদেনগুলোর চরিত্রটা পাল্টে যায়, কারণ কাস্ট হঠাৎ খুব বড় একটা ব্যাপার হয়ে ওঠে এবং আপনাকে ভাবতেই হয় আপনি কোন দিকে, আপনার সহানুভূতি কাদের প্রতি। আপনাকে নিজের অবস্থানটা ঠিক করতে হয়। এক দিক থেকে আমি আপনার কথা সমর্থন করছি।

প্র: টয়েনবি যে ভাবে দেখেছিলেন, ইতিহাসে দ্বন্দ্ব থেকেই প্রগতি আসে। কারণ দ্বন্দ্ব থেকে আসে চ্যালেঞ্জ, চ্যালেঞ্জ থাকলে জবাব দিতে হয়। (আর্নল্ড টয়েনবি, ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ)

উ: আমি তো বলব মার্ক্সেরও এই একই মত। অনেকেই এই মত পোষণ করেন, কিন্তু আমি করি না। তবে আপনি বোধ হয় ঠিকই বলছেন— বাংলায় তফসিলি জাতির মানুষ প্রচুর, ওবিসিও তাই, কিন্তু আমাদের কাস্ট সম্পর্কে চেতনা বেশি নেই।

প্র: বাংলায় যাঁরা বৈষ্ণব বলে পরিচিত তাঁরা নিম্নবর্ণের ছিলেন, সেই কারণেই তাঁদের আমরা আপন মনে করিনি। অন্য জায়গায় বৈষ্ণবদের ক্ষেত্রে এমনটা হয়নি।

উ: তামিলনাড়ুতে তো নয়ই।

প্র: অভিবাসনের বৃত্তান্তে ফেরা যাক। এ বার তো জেএনইউ থেকে হার্ভার্ডে লাফ।

উ: সেটা খুব বড় লাফ ছিল। জেএনইউ আমার কাজের অভ্যাসে বিশেষ ছাপ ফেলেনি। সেখানে আমি কঠোর পরিশ্রম করতে শিখেছি এমনটা বলা যাবে না। ফলাফলের চাপ তেমন ছিল বলে মনে হয় না আমার। হার্ভার্ডে গিয়ে আমেরিকানদের কাজের অভ্যাসের সঙ্গে পরিচয় হল। প্রথমটা তো বুঝতেই পারিনি যে আমি কিছুটা পিছিয়ে পড়েছি। আমার কেমন যেন ধারণা ছিল যে সব ঠিকঠাক, ভালই চলছে আমার পড়াশোনা। কিন্তু সবাই প্রচণ্ড পরিশ্রম করছিল। আমেরিকায় যে জিনিসটা প্রথম শিখেছিলাম তা হল, লোকে অবিশ্বাস্য রকমের পরিশ্রম করে। ওই রকম কাজ করার কোনও অভিজ্ঞতা আমার ছিল না। সে দিক থেকে ব্যাপারটা বেশ অন্য রকমই হল...

প্র: তার মানে বলা যায়, যত দিন বাংলায় ছিলেন তত দিন পরিচিত পরিবেশে একটা নিশ্চিন্ত আশ্রয়ের মধ্যে ছিলেন। জেএনইউ’তে ভারতদর্শন হল, বৈচিত্র একটা জোর নাড়া দিল, সমৃদ্ধও করল। কিন্তু সেখানেও কঠোর পরিশ্রমের শিক্ষা হয়নি, যেটা হল আমেরিকায় পৌঁছনোর পরে।

উ: অবশ্যই। কঠোর পরিশ্রম কাকে বলে, শিখলাম।

আরও পড়ুন: এক্সক্লুসিভ অভিজিৎ: কলকাতা প্রাণবন্ত মেধাচর্চার একটা বড় জায়গা ছিল, এখন আর তা বলা যাবে না

প্র: আপনাদের নতুন বইয়ে অভিবাসন নিয়ে একটা চ্যাপ্টার আছে, তার সঙ্গে আপনার নিজের জীবনের এই অভিজ্ঞতা কী ভাবে মেলানো যাবে? (অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং এস্থার দুফলো-র নতুন বই: ‘গুড ইকনমিক্স ফর হার্ড টাইমস’, জাগারনট)

উ: আমরা এ রকম কিছু উদাহরণ দিয়েছি, একেবারে খুব চেনা স্বভাবের বাঙালি, বাড়িতে নিজের খাবারের থালাটাও কোনও দিন ধোয়নি, এমন লোকও রেস্তরাঁয় কাজ করতে শুরু করেছেন, এক সময় নিজের ব্যবসা খুলেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নের অধ্যাপক না হয়ে ডানকিন ডোনাটস-এর চেন খুলেছেন। এগুলোই রূপান্তরের নমুনা। আমেরিকা এমন একটা দেশ যেখানে পরিশ্রমের মূল্য দেওয়া হত। আমার মনে হয় গত চল্লিশ বছরে দেশটা অনেকখানি পাল্টে গিয়েছে। পরিশ্রমের সেই মূল্য এখন আর নেই, শ্রেণিবিভাজনটা খুব বেড়েছে।

প্র: ব্যানার্জি মডেল কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যেতে চাইলে পশ্চিমবঙ্গের করণীয় তা হলে একটাই: একটা জাতীয় জনসংখ্যা নথি তৈরি করে কিছু লোককে রাজ্য থেকে বার করে দেওয়া এবং তাদের জায়গায় অভিবাসীদের নিয়ে আসা। কাজ হবে?

উ: এটা একেবারেই ঠিক কথা যে, বাংলায় অভিবাসনের একটা বড় ভূমিকা ছিল। তামিলনাড়ুর মতো জায়গা থেকে এখানে শ্রেষ্ঠ মেধার মানুষরা আসতেন। আমি যখন বড় হচ্ছি, সেই সময়েও বিস্তর তামিল ব্রাহ্মণ দেখেছি। দ্রাবিড় আন্দোলনের ধাক্কায় রাজ্য থেকে সরে এসে তাঁরা দক্ষিণ কলকাতায় বসতি করেছিলেন। প্রচুর তামিল মানুষ আমাদের ওখানে ভাড়া থাকতেন।

প্র: একটু তর্ক তুলব? কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন মুখোপাধ্যায় বংশের শাসন চলছে, সেই সময় কিছু সেরা তামিল স্কলার এখানে কাজ করেছেন। যেমন সি ভি রামন কিংবা কৃষ্ণন। চন্দ্রও কিছু দিন ছিলেন কলকাতায়। (অ্যাস্ট্রোফিজ়িসিস্ট সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখর, রামনের ভাইপো) চন্দ্র তাঁর অনুমোদিত জীবনীতে বলেছেন, সি ভি রামনও কোথাও একটা বলেছেন, কলকাতায় একটা জোরদার তামিল-বিরোধী মনোভাব জারি ছিল। রামন তো কলকাতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন, তাঁকে তাড়ানো হয়েছিল।

উ: সেটা হতেই পারে। কিন্তু তখন অনেকেই মনে করেছিলেন, তামিলনাড়ুর তুলনায় কলকাতা অনেক ভাল জায়গা। আমিও দেখেছি অনেক তামিল ছিলেন, যাঁরা খুব প্রতিভাবান। বস্তুত, এখন এমআইটিতে কলকাতার যে কয়েক জন মানুষ অধ্যাপনা করেন তাঁদের মধ্যে এক জন মারওয়াড়ি, আর এক জন তামিল। অগ্রবাল হলেন অর্থনীতির শিক্ষক, আর তামিল যাঁর কথা বলছি তিনি ইংরেজি পড়ান, শঙ্কর রামন। এঁরা দক্ষিণ কলকাতার লোক।

কলকাতায়: (বাঁ দিক থেকে) সি ভি রামন, কে এস কৃষ্ণন ও এস চন্দ্রশেখর

প্র: প্রফেসর অগ্রবাল কী পড়ান?

উ: ইন্ডাস্ট্রিয়াল অর্গানাইজ়েশন।... যেটা বলতে চাইছি তা হল, কলকাতা এমন এক শহর ছিল যেখানে সবাই অন্য জায়গা থেকে আসতেন। এখন মোটামুটি বলা যায়, এখান থেকে সবাই বেরিয়ে যাচ্ছে। কমবয়েসিরা সুযোগ পেলেই শহর ছেড়ে যাচ্ছে। মানে আমরা আর প্রতিভাবানদের আকর্ষণ করছি না। আপনার যে প্রকল্প, অনেক মানুষকে বার করে দেওয়া, ওতে আমি সায় দিচ্ছি না...

প্র: বিজেপির প্রকল্প, আমার নয়।

উ: বিজেপির প্রকল্প অন্য। আমি তার মধ্যে যেতে চাই না। আমার বক্তব্য, বাংলাকে যদি ঘুরে দাঁড়াতে হয় তবে নতুন মেধা, নতুন প্রতিভা আকর্ষণ করতে হবে। যে কোনও মহানগরের সেটাই ধর্ম।

প্র: মনে হয়, বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থিক নীতির প্রতি আপনার একটা প্রচ্ছন্ন সমর্থন আছে। অন্তত নির্মলা সীতারামন গত বাজেট পেশ করা পর্যন্ত ছিল। নির্মলা তো আপনার জেএনইউয়ের সহপাঠীও! পরে অবশ্য আপনি বলেছেন, করের হার কমিয়ে দিয়ে ওঁরা কিছু চোনা ফেলেছেন। এটা কিন্তু ওঁরা মন থেকে ঠিক করেননি, ঘাবড়ে গিয়ে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এখনও আপনি সরকারের নানা নীতির বিরোধিতা করছেন না, বস্তুত সমর্থনই করছেন, কেবল আপনার মতে করের টাকা থেকে খরচ না করে সরকার অংশত ঋণ করে খরচ চালাচ্ছে, সেটা নিয়েই যা আপত্তি। অর্থাৎ আপত্তিটা পদ্ধতিগত, নীতির বিষয়বস্তু নিয়ে নয়।

উ: সরকারের অনেকগুলো প্রকল্প আছে। সামাজিক প্রকল্প, আর্থিক প্রকল্প, নানা ধরনের। আমি নানা উপলক্ষে বার বার বলেছি, একটা জিনিস ওঁরা করেছেন যাতে অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে, সেটা হল অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ। সিদ্ধান্ত নেওয়ার কাঠামোটা ভয়ানক কেন্দ্রীভূত হয়ে গিয়েছে, সেটা ক্ষতিকর। যাঁরা বিনিয়োগ করেন তাঁরা এমন একটা ব্যবস্থায় কাজ করতে চান না যেখানে মুষ্টিমেয়র অনুমোদনের জন্য সব কিছু আটকে থাকে।

প্র: তার মানে, সরকারের নীতি নিয়ে আপনার কোনও সমস্যা নেই।

উ: আমার কাছে ওটাও (কী ভাবে প্রকল্পের টাকার সংস্থান হচ্ছে) নীতির অঙ্গ। আরও কর বসিয়ে আরও জনকল্যাণ ব্যয় করা যদি উদ্দেশ্য হয়, আমি অবশ্যই সেটা সমর্থন করব। আমি তো বরাবর বলে এসেছি যে, কর বাড়িয়ে জনকল্যাণে খরচ বাড়ানোর সুযোগ আমাদের আছে। আমি কংগ্রেসের ‘ন্যায়’ প্রকল্প সমর্থন করেছি বলে অনেকেই যখন আমাকে আক্রমণ করেছিলেন, তখন আমি এটাই বলেছিলাম। আমার বক্তব্য এটা ছিল না যে ওঁদের ওই প্রকল্পটি খুব সুচিন্তিত কিছু। কিন্তু গরিবদের কিছু সুবিধা দিলেই যাঁরা আক্রমণ করেন, যাঁরা বলেন ধনীদের ওপর কখনও (নতুন) কর বসানো উচিত নয়, তাঁদের প্রতি আমার বিন্দুমাত্র সমর্থন নেই। নতুন বইটিতে এটা আমাদের অন্যতম প্রধান বক্তব্য।

প্র: আপনার আর একটি বিতর্কিত মন্তব্য হল, চড়া হারে কর বসানোর নীতি বামপন্থীও নয়, দক্ষিণপন্থীও নয়। আধুনিক ধনতন্ত্রের কুলদেবতা মিল্টন ফ্রিডম্যান তো নেগেটিভ ট্যাক্সের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের সময়কার তথাকথিত দক্ষিণপন্থী সরকার এবং অন্য নানা সরকারও আইন করে তাঁদের হাতে টাকা হস্তান্তর করতে চেয়েছেন যাঁরা সঞ্চয় এবং বিনিয়োগ করেন। সেটা মিনিমাম বেসিক ইনকামের ব্যাপার নয়... 

উ: প্রেসিডেন্ট আইজ়েনহাওয়ারের আমল থেকে ১৯৮০— চল্লিশ বছরে এই নিয়ে বামপন্থী এবং দক্ষিণপন্থীদের মধ্যে কোনও মতবিরোধের কথা শোনা যায়নি। এ বিষয়ে ঐকমত্য জারি ছিল যে, চড়া হারে কর বসানো উচিত এবং আর্থিক ভাবে অনগ্রসর শ্রেণির হাতে সম্পদের হস্তান্তর করা দরকার। রেগন সেটা পাল্টে দিলেন।

প্র: ঐকমত্যটা ভেঙে গেল কেন?

উ: সেটাই আমরা বইতে লিখেছি। ভিন্নমত দেখা দিল কারণ আয়বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে গেল এবং সবাই ঘাবড়ে গেল...

প্র: মানে মনমোহন সিংহের জমানার দ্বিতীয় পর্বে আয়বৃদ্ধি হট করে থেমে গেল এবং মোদী-১ ও মোদী-২, উভয় পর্বেই অধোগতির সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে।

উ: আয়বৃদ্ধির গতি কমে আসছিল, আমাদের সে বিষয়ে কিছু করার দরকার ছিল। আমার মনে হয় এ ক্ষেত্রে অত্যধিক কেন্দ্রীকরণের একটা ভূমিকা আছে, এই ব্যাপারটার ফলে আয়বৃদ্ধির আরও ক্ষতি হয়ে থাকতে পারে।

প্র: বাস্তব জীবন জটিল। আয়বৃদ্ধির গতিভঙ্গের সম্পর্কে চার রকমের মত শুনেছি। বিমল জালান বলেছেন এটা কাঠামোগত নয়, সাময়িক উত্থানপতনের অঙ্গ। মানে দিনের পরে যেমন রাত্রি আসে। ওঙ্কার গোস্বামীর মতে সমস্যাটা কাঠামোগত। তৃতীয় মতটা এখন মন্ত্রের মতো উচ্চারিত হচ্ছে: বিশ্ব অর্থনীতির গতিভঙ্গ হয়েছে, তাই ভারতেও ধাক্কা লেগেছে। অথচ আমেরিকায় এবং ইউরোপের অনেক দেশেও মন্দা নেই। চার নম্বর ব্যাখ্যাটা দিয়েছেন মনমোহন সিংহ: নোট বাতিলের ফলেই এই গতিভঙ্গ, অর্থাৎ এ সমস্যা মানুষের সৃষ্টি।

উ: আমি জানি না। তথ্যপ্রমাণ দেখে কোনও ব্যাখ্যাকেই ঠিক বা ভুল বলার মতো জায়গায় আমি নেই, নোট বাতিলের কোনও বড় ভূমিকা আছে কি না তা-ও আমি এখনও জানি না...

প্র: গীতা গোপীনাথ কোয়ার্টার্লি জার্নাল অব ইকনমিক্স-এ একটি প্রবন্ধ লিখেছেন। (গীতা হার্ভার্ডে অর্থনীতির অধ্যাপক, এখন আইএমএফ-এর মুখ্য অর্থনীতিবিদ।)

উ: হ্যাঁ, সেটা দেখেছি আমি।

প্র: নোট বাতিলের পরেই তিরুপ্পুরের পোশাকের কারখানায় বিক্রিবাটা ৪১ শতাংশ কমে গিয়েছিল, আপনাদের বইয়েও সে কথা বলা আছে।

উ: কিছু একটা নিশ্চয়ই ঘটেছে। প্রশ্নটা হল, বিক্রিবাটা কমে যাওয়ার সমস্যাটা দীর্ঘমেয়াদি কি না। বস্ত্রশিল্পের বাজার নিয়েও একই প্রশ্ন। আমি মানছি না, তা নয়। আমরাও সমীক্ষা করেছিলাম। কিন্তু এই সমস্যার কতটা নোট বাতিলের ফলে হয়েছে, সেটা আমি জানি না। তবে আমার বেশি চিন্তা কৃষকদের নিয়ে। কৃষিপণ্যের সহায়ক দাম (সাপোর্ট প্রাইস) কমিয়ে রাখা হয়েছে, ফলে শিল্পজাত জিনিসপত্রের তুলনায় ফসলের তুলনামূলক দাম কমে গিয়েছে, তাতে কৃষকদের খুবই সমস্যা। এটা আমার কাছে বড় কারণ।... গীতা সম্ভবত এই দাবি করছেন না যে তাঁর কাছে সব কিছুর ব্যাখ্যা আছে, কেবল বলছেন কিছু একটা ঘটেছে। অর্থনীতিতে যদি আগে থেকেই ভাটার টান না থাকত, হয়তো তা আরও তাড়াতাড়ি ঘুরে দাঁড়াতে পারত।

(তিন পর্বে এই সাক্ষাত্কার প্রকাশিত হচ্ছে, আজ দ্বিতীয় পর্ব)