Advertisement
০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩
কোথায় আকবর, আর...

ফৈজ়াবাদ নয়, মুঘল সম্রাট প্রদেশের নাম রেখেছিলেন অওধ

যত দূর জানা যায়, রামচরণ ছিলেন রামানন্দী সাধু। বাঙালি রামানুজ আর রামানন্দের তফাত মাথায় রাখে না। কিন্তু এই দুই আখড়ায় তফাত আছে। তিলকের ধরনও আলাদা। রামানুজ আসলে শ্রী সম্প্রদায়ের, তিনি বিষ্ণু ও লক্ষ্মীর উপাসক।

এখন: রাম সীতা লক্ষ্মণরূপীদের দেওয়ালির আরতি করছেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। অযোধ্যা, ৬ নভেম্বর। পিটিআই

এখন: রাম সীতা লক্ষ্মণরূপীদের দেওয়ালির আরতি করছেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। অযোধ্যা, ৬ নভেম্বর। পিটিআই

গৌতম চক্রবর্তী
শেষ আপডেট: ১৫ নভেম্বর ২০১৮ ০০:০০
Share: Save:

যোগী আদিত্যনাথ হয়তো জানেন না, জানার কথাও নয়, কিন্তু ফৈজ়াবাদ না থাকলে অযোধ্যায় আজ রামচন্দ্রের এই রমরমা হত না। ঘটনাটা অষ্টাদশ শতকের। সরযূ নদীর ধারে রামচরণ দাস নামে এক সাধু তখন আশ্রম খুলে বসেছেন, শিষ্যদের তিনি রোজ রামকথা শোনান। ফৈজ়াবাদের নবাব আসফ উদ দৌলা তাঁর কথা শুনে মুগ্ধ, আশ্রমের খরচ চালাতে তিনি রামচরণকে কয়েকটি গ্রাম দান করলেন। আসফ উদ দৌলা আরও একটা কারণে বিখ্যাত, তিনিই প্রথম ফৈজ়াবাদ থেকে লখনউতে রাজধানী সরিয়ে আনেন। ফৈজ়াবাদ ও লখনউ তাই রাম-মাহাত্ম্যে অঙ্গাঙ্গি।

Advertisement

যত দূর জানা যায়, রামচরণ ছিলেন রামানন্দী সাধু। বাঙালি রামানুজ আর রামানন্দের তফাত মাথায় রাখে না। কিন্তু এই দুই আখড়ায় তফাত আছে। তিলকের ধরনও আলাদা। রামানুজ আসলে শ্রী সম্প্রদায়ের, তিনি বিষ্ণু ও লক্ষ্মীর উপাসক। রামানন্দ রামানুজের শিষ্য বলে শোনা যায়, কিন্তু তিনি রাম ও সীতার উপাসক। রামানুজের গীতাভাষ্য আছে, রামানন্দীদের সে রকম কিছু নেই, রামানুজের ভাষ্যটিকেই তাঁরা মেনে চলেন।

মুঘল আমলের শেষে দিল্লিতে কেন্দ্রীয় শক্তি যখন ছিন্নবিচ্ছিন্ন, তখন রামানন্দীদের উত্থান। আর পাঁচটা আখড়ার নাগা সন্ন্যাসীদের মতো এঁদেরও তেজারতি ব্যবসা, বাণিজ্য। এবং কখনও মরাঠা, কখনও মুঘল, কখনও রোহিলাদের দলে ভাড়াটে সৈন্য হিসাবে ভিড়ে যান। এই আখড়ায় জাতপাত নেই, ব্রাহ্মণ থেকে শূদ্র যে কেউ রাম-সীতার আরাধনা করতে পারে। ফলে লোকবল ও অস্ত্রবলে এঁরা অনেক বেশি ক্ষমতাবান। সে সময় এঁদের দু’টি প্রধান কেন্দ্র: নেপালের কাছে জনকপুর ও দক্ষিণে চিত্রকূট। পরে, অযোধ্যার তৃতীয় কেন্দ্রটি। যোগী-মোদীরা যতই গলা চড়ান না কেন, অষ্টাদশ শতকের আগে অযোধ্যা কখনওই তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।

প্রথম গুরুত্ব দিলেন আকবর। শাসনের সুবিধার জন্য ১৫৮০ সালে তিনি গোটা সাম্রাজ্যকে ১২টি সুবায় ভাগ করেন। গঙ্গা-যমুনার দোয়াব অঞ্চলে থাকল ১৩৫ ক্রোশ দীর্ঘ, ১১৫ ক্রোশ প্রশস্ত ‘অওধ’ প্রদেশ। সুলতানি আমলে ভাল জলহাওয়ার জন্য ফৈজ়াবাদ শহরের খ্যাতি ছিল। কিন্তু আকবর প্রদেশের নাম রাখলেন অওধ। কেন এই নাম? আবুল ফজ়ল ‘আইন-ই-আকবরি’তে জানাচ্ছেন, ‘অযোধ্যা থেকে অওধ। হিন্দুধর্মের অন্যতম অবতার রামচন্দ্র অযোধ্যায় জন্মেছিলেন।’ অর্থাৎ মুঘল সম্রাট আকবরই প্রথম অযোধ্যার মতো জঙ্গুলে জায়গাকে গুরুত্ব দিলেন! এবং রামচন্দ্রের কথা মনে রেখে! যোগী-মোদীদের অবশ্য এ সব জানার কথা নয়।

Advertisement

অযোধ্যা তখন শুধু জঙ্গুলে নয়, ডাকাতদের আখড়াও। অনাদি অনন্তকাল ধরে রামচন্দ্রের নামে আকাশবাতাস ধ্বনিত হত না। হর্ষবর্ধনের আমলে হিউয়েন ৎসাং অযোধ্যায় গিয়েছিলেন। কোনও রামমন্দির ছিল না। বরং তিনি যে বৌদ্ধ যোগাচার ঘরানার শ্রমণ, সেই ঘরানার দুই দার্শনিক অসঙ্গ ও বসুবন্ধু একদা অযোধ্যার বৌদ্ধ বিহারে থাকতেন। পূর্বসূরি পণ্ডিতদের স্মৃতিস্থল দেখতে গিয়েছিলেন চিনা শ্রমণ। অযোধ্যার পরই তাঁর নৌকো ডাকাতদের কবলে পড়ল, ডাকাতরা শ্রমণকে মা কালীর কাছে বলি দেবে মনস্থ করল। অতঃপর নদীতে প্রবল ঝড়, নৌকো টালমাটাল। ডাকাতেরা হিউয়েন ৎসাঙের পায়ে লুটিয়ে পড়ল। চৈনিক শ্রমণ নিজেই তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তে এ সব লিখে গিয়েছেন।

কিন্তু এ সব বলে লাভ? যোগী-মোদীরা যে ভাবে ফৈজ়াবাদকে অযোধ্যা, মুঘলসরাইকে দীনদয়াল উপাধ্যায়, বারাণসীকে কাশী, আর ইলাহাবাদকে প্রয়াগরাজ বানাচ্ছেন, তার তো কোনও মাথামুন্ডু নেই। প্রয়াগ কি আদৌ রাজপথ, বাগিচা, অট্টালিকা সমন্বিত কোনও শহরের নাম? প্রয়াগ থাকতে পারে এই কলকাতায়, আপনার ঘরের কোণেও। তুলসীদাস ‘রামচরিতমানস’-এ জানাচ্ছেন, সেই সাধুসন্তসমাজরূপ প্রয়াগরাজ সর্বদেশে, সর্বকালে সকলেই লাভ করতে পারেন। ‘অকথ অলৌকিক তীরথরাউ।’ মানে, সেই তীর্থরাজ অলৌকিক, বাণীর অগোচর। যোগী-মোদীরা তুলসীদাসও ঠিকঠাক পড়ে উঠতে পারেন না!

অযোধ্যা যে মুসলিমস্পৃষ্ট অওধ বা ফৈজ়াবাদের তুলনায় এক ছোট্ট, অবান্তর জায়গামাত্র, রামকথার পরম্পরাই তার প্রমাণ। চিত্রকূট থেকে বারাণসী, অযোধ্যা, সব জায়গাতেই রামকথা পাঠ হয়। অঞ্জানিনন্দন শারণ এ ব্যাপারে পরিষ্কার দুটো ভাগ দেখিয়েছিলেন। বারাণসী পরম্পরা বলে, তাঁরা তুলসীদাস ও তাঁর শিষ্য কথকদের থেকে শিক্ষা পেয়েছেন। আর অযোধ্যা পরম্পরা পূর্বসূরি হিসেবে মুখ্যত রামানন্দী সাধুদের কথা বলে। অঞ্জানিনন্দন বিদেশবাসী, সেকুলার ঐতিহাসিক নন। রামানন্দী সাধু, রামকথার ঐতিহ্য নিয়ে ১৯৩৮ সালে ‘মানসকি প্রাচীন পুকার’ বলে বই লিখেছিলেন। সে বই যোগী আদিত্যনাথের গোরক্ষপুরের গীতা প্রেস থেকেই বেরিয়েছিল। হিন্দুত্ববাদীরা এ সবেরও খোঁজ রাখেন না? যোগী-মোদীদের হিন্দুত্ববাদ খেয়াল রাখেনি, তুলসীদাসের কাব্যটি সে যুগে ফার্সি ভাষাতেও অনূদিত হয়েছিল। কারও সমস্যা হয়নি।

সমস্যা আধুনিকতার ক্ষুদ্র দৃষ্টিতে। চোখের সামনে যতটুকু দেখা যায়, ততটুকুই সত্য। অযোধ্যায় শিসমহল নামে একটি মন্দির আছে। পর পর আয়না, তার ওপরের খোপে রাম-লক্ষ্মণ-সীতা। কারও সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম করতে গেলেই ওপরে একই সঙ্গে প্রতিবিম্ব-দর্শন দেবেন তিন জন। ওই আয়না আর প্রতিবিম্বই কি সত্য? কয়েক বছর আগেও অযোধ্যার মন্দিরে রামকিঙ্কর উপাধ্যায় বা শ্রীনাথ মিশ্রের মতো কথাবাচকরা এটি ব্যাখ্যা করতেন অন্য ভাবে।

তুলসীদাসের অযোধ্যাকাণ্ডে এক দিন রাজারাজড়া, অমাত্যরা রাজা দশরথকে যথারীতি প্রভূত স্তুতিবাক্যে ভরিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু দশরথ আয়নায় তাঁর রাজমুকুট ঠিক করতে গিয়ে দেখলেন, ঝুলপিতে দু’গাছি পাকা চুল। পাত্রমিত্ররা যা-ই বলুক, রাজা বুঝলেন, তিনি বৃদ্ধ হয়েছেন। এ বার রামকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করার সময় এসেছে। এটুকু পাঠ করে কথাবাচকরা বলতেন, মুকুট ক্ষমতার প্রতীক। সে কোনও না কোনও ভাবে পিছলে যায়, সারা ক্ষণ একই মাথায় থাকে না। প্রকৃত রাজা তাই কেবল স্তাবকদের কথা না শুনে জনগণের সত্যের আয়না দেখেন। কথকরা জানাতেন, এই কারণে অযোধ্যার প্রাসাদে আয়না থাকলেও তুলসীদাস লঙ্কার রাক্ষসরাজ্যে কোনও আয়না রাখেননি। রাক্ষসরা কখনও জনতার কথা শোনে না, সত্যের আয়নায় নিজের মুখ দেখে না। নরেন্দ্র মোদী ও যোগী আদিত্যনাথরা সরযূর তীরে অভিজ্ঞ কথাবাচকদের থেকে রামকথা শুনুন।

শুনলে যোগীজি সত্যের আয়নায় নজর দিতে সক্ষম হবেন। নাথযোগীদের অনেক সময় পিরও বলা হত। যেমন গোরক্ষনাথকেই অনেকে বলতেন, গোরক্ষপির। হঠযোগী গোরক্ষনাথ ব্রাহ্মণ্যধর্মের বিরোধী ছিলেন, অন্ত্যজদের শিষ্য করতেন। মুসলিমরাও সাগ্রহে তাঁর শিষ্যত্ব নিতেন। গোরক্ষনাথ বলতেন, ‘‘বেদ বা কোরান কোনওটাই সত্য নয়। তোমরা এখন ধর্মে যোগী। আমার পন্থে ভেদবুদ্ধি নেই।’’ এখনও গোরক্ষপুরের কাছাকাছি ভিট্টি, বাড়গো, মহেশপুর গ্রামে তাই বেশ কিছু মুসলমান নাথ যোগীর বাস। তাঁরা ঘর-সংসার করেন, যোগাভ্যাস করেন, বিছানার নীচে রামায়ণ ও কোরান দুই-ই থাকে। এটাই ঐতিহ্য। আজ নয়, অনেক দিন ধরেই। ১৯২১ সালের জনগণনা হিসাব দিয়েছিল, নাথপন্থায় ৩১ হাজারের বেশি মুসলমান যোগী ও প্রায় দেড় লক্ষ ফকির রয়েছেন।

অতএব, ফৈজ়াবাদ, ইলাহাবাদের নাম পাল্টে আদিত্যনাথ মুসলিম সংস্রব থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারবেন না। যোগীজি বরং নিজের নাম এবং ঘরানাটাই বদলে নিন। নইলে কেউ যদি তাঁকে আদিত্যপির বলে ডেকে ফেলে!

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.