গত সেপ্টেম্বরে চতুর্থ বার জাতীয় নির্বাচনে জিতিয়াছেন জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা মের্কেল। কিন্তু তাঁহার সরকার এখনও পর্যন্ত স্থিতিলাভ করে নাই। বরং আবার নূতন করিয়া তাঁহার দেশে নির্বাচন ডাকিতে হইবে কি না, এই আশঙ্কাই আপাতত ছড়াইতেছে জার্মানিসহ গোটা ইউরোপ মহাদেশে। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাইবার দরুণ তাঁহাকে অন্য দলের মুখাপেক্ষী হইতে হইয়াছিল. এবং তাঁহার দলের স্বাভাবিক মিত্র বলিয়া যাহাদের ভাবা হইয়াছিল, সেই ফ্রি ডেমোক্র্যাটস ও গ্রিন পার্টির সহিত বনিবনা না হওয়ায় নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে আসিয়া সংশয় উপস্থিত হইয়াছিল যে মের্কেলের যুগ বোধহয় এ বার সমাপ্তির পথে। কিন্তু না, আবারও পরিস্থিতি পরিবর্তিত। বাভেরিয়া-ভিত্তিক কনজারভেটিভ দল সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটস বা এসপিডি মের্কেলের দিকে তাহাদের সহযোগিতার হাত বাড়াইয়া দিয়াছে। তাহাদের সহায়তায় মের্কেল এখন দুইটি সম্ভাব্য পথে সরকার গড়িতে সক্ষম। প্রথম পথ, সংখ্যালঘু সরকার তৈরি। (গত চার বছর চ্যান্সেলর মের্কেলের সরকারে শরিক থাকিবার পরও এসপিডি-র এ বারের নির্বাচনে আসনসংখ্যা বেশ কম, তাহাদের রাজনৈতিক কেরিয়ারে সর্বনিম্ন।) এ ছাড়া একটি দ্বিতীয় পথও আছে। এসপিডি মের্কেলের সঙ্গ লইবার পর আরও দু’একটি দল আগ্রহ দেখাইয়াছে সরকারে যোগ দিতে। এই দ্বিতীয় সম্ভাবনাটি কার্যে পরিণত হইলে আবারও একটি গ্র্যান্ড অ্যালায়েন্স সরকার তৈরি হইবে সে দেশে। যে কোনও একটি সম্ভাবনা রূপায়িত হইলেই নিশ্চিত, মের্কেল আরও কিছু দিন দেশের শীর্ষপদে আসীন থাকিতে পারিবেন।

তবে এই সংকটের মধ্য দিয়া একটি কথা পরিস্ফুট: ইউরোপের বৃহত্তর প্রেক্ষিতে জার্মানিতে একটি স্থিতিশীল ও প্রগতিবাদী সরকারের প্রয়োজনীয়তা কতখানি গভীর। গত কয়েক বছরে ইউরোপের সমাজে ব্যাংকিং সংকট, উদ্বাস্তু সংকট, ব্রেক্সিট, ট্রাম্প, ক্যাটালোনিয়া বিচ্ছিন্নতাবাদ ইত্যাদি একের পর এক আঘাত আসিয়াছে. কিন্তু প্রতিটিতেই মনে হইয়াছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে ঐক্য ও বোঝাপড়া থাকিলে সংকট কাটাইয়া ওঠা সম্ভব। কিন্তু জার্মানির অনিশ্চয়তা ইউরোপীয় দেশগুলির সরকারের উপর যে ছায়া ফেলিতেছে, তাহার চরিত্রটি ভিন্ন। জার্মানিতে মের্কেল-বিরোধিতার কারণ— রক্ষণশীল সামাজিক শক্তির প্রবল উত্থান। এক বার যদি সেই উত্থান চরম হইয়া ওঠে, তবে অন্যান্য দেশেও, বিশেষত ফ্রান্সেও তাহার প্রভাব পড়িবে সরাসরি। ফরাসি প্রধানমন্ত্রী এমানুয়েল মাকরঁ সেই কারণেই বিশেষ উদ্বিগ্ন। গত সপ্তাহে তিনি সেই উদ্বেগ প্রকাশ করিয়া ফেলিয়াছেন এই বলিয়া যে, মের্কেল সঙ্গে থাকিলে তিনি ইউরোপে ‘রেনেসাঁস’-এর কথা ভাবিতে পারেন, আর তাহা না হইলে ইউরোপে রক্ষণশীল রাজনীতির বাড়বাড়ন্ত ঠেকানো বিরাট চ্যালেঞ্জ। গত কয়েক বছরে মের্কেলের তত্ত্বাবধানে যে ভাবে ইইউ-এর প্রয়োজনীয়তা ও প্রাসঙ্গিকতা প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে, মহাদেশ-জোড়া উদ্বাস্তু সংকটও যে ভাবে তাঁহাকে টলাইতে পারে নাই, তাহাতে ইউরোপের স্থিততম দেশ জার্মানির মহাদেশীয় গুরুত্ব এখন অপরিসীম। মের্কেল শরিকি সরকার তৈরির মালমশলা গুছাইয়া লইয়া চতুর্থ টার্ম অপ্রতিহত না রাখিতে পারিলে, কেবল জার্মানি নয়, ইউরোপের সামনেও বড় অনিশ্চয়তা।