একই লজ্জায় আর কত বার মুখ ঢাকতে হবে আমাদের, জানা নেই। একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকটার শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছি। অর্থাৎ খাতায়-কলমে সওয়া পাঁচশো বছর পিছনে ফেলে এসেছি মধ্যযুগের শেষ বিন্দুকে। কিন্তু এখনও হৃদয়ে রক্তক্ষরণের কারণ হয়ে উঠছে মন্দিরে প্রবেশ করতে চাওয়া দলিত কিশোরের উপরে অমানুষিক নির্যাতনের অভিযোগ।

রাজস্থানের ঘটনা। এক কিশোরের হাত-পা দড়ি দিয়ে বাঁধা হয়েছে। তার পরে মাটিতে ফেলে চলছে গণপ্রহার। কিশোরের অপরাধ কী? ‘অপরাধ’ হল একটি মন্দিরে প্রবেশের চেষ্টা করা।  দলিত হওয়া সত্ত্বেও মন্দিরে প্রবেশ! তথাকথিত উচ্চবর্ণ সহ্য করবে কী ভাবে! অতএব দল বেঁধে চলল অকথ্য নির্যাতন। অভিযোগ অন্তত তেমনই। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, পুলিশের খাতায় অন্য রকম ঘটনা লিপিবদ্ধ হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিয়োয় যে কিশোরকে নির্যাতিত হতে এবং অকথ্য মারধরে তীব্র আর্তনাদ করতে দেখা গিয়েছে, সেই কিশোরের বিরুদ্ধেই অভিযোগ দায়ের হয়েছে পুলিশের খাতায়। এক নাবালিকাকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়েছে ওই নাবালকের বিরুদ্ধে। পকসো আইনে গ্রেফতার করে তাকে একটি হোমে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

দেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতার ৭৫ বছর উদ্‌যাপনের তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছে ভারত সরকার। কিন্তু সামাজিক স্বাধীনতায় কি আজও পৌঁছতে পারলাম কি?

সম্পাদক অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা আপনার ইনবক্সে পেতে চান? সাবস্ক্রাইব করতে ক্লিক করুন

মুম্বই থেকে সম্প্রতি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার খবর এসেছে। জাতপাত নিয়ে গঞ্জনা সইতে না পেরে মেডিক্যাল কলেজ ক্যাম্পাসেই এক চিকিত্সক তথা স্নাতকোত্তর স্তরের শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। সেই লজ্জার রেশ কাটল না। রাজস্থান থেকে আবার দুঃসংবাদ এল।

আরও পড়ুন: মন্দিরে ঢুকতে যাওয়ার ‘শাস্তি’, দলিত কিশোরের হাত-পা বেঁধে মার!

এই দুঃসংবাদ কোনও অস্বাভাবিক ঘটনাও বোধহয় নয় আজকাল। কখনও মহারাষ্ট্র, কখনও গুজরাত, কখনও রাজস্থান, কখনও হরিয়ানা, কখনও উত্তরপ্রদেশ, কখনও কর্নাটক, কখনও অন্ধ্র— দেশের নানা প্রান্ত থেকে নির্যাতনের খবর আসে। জাতপাতের ভিত্তিতে বিভাজনকারী মানসিকতার জঘন্য কার্যকলাপের খবর আসে। এই ভারতই কি আমরা চেয়েছিলাম? স্বাধীনতা পাওয়ার পরে সাত দশকেরও বেশি সময় কাটিয়ে এসে আজ কি আক্ষেপ হয় না?

কোনও রাজনৈতিক দলকে দোষ দিয়ে কিন্তু লাভ নেই। তাতে সমস্যার সমাধান হবে না। সেই আপ্তবাক্য আমাদের মনে রাখতে হবে— আমরা তেমন শাসকই পাই, আমরা নিজেরা যেমনটা হই। অর্থাত্ সামাজিক মানসিকতা যেমন হবে, সমাজের চেহারা এবং গতিপ্রকৃতিও তেমনই হবে। অতএব যত দিন নিজেরা সংশোধিত হতে না পারব, তত দিন এই সব সামাজিক সঙ্কট থেকে মুক্তি পাব না।

বি আর অম্বেডকরের ভারত দর্শনের কথা মনে পড়ে। তাঁর তদানীন্তন উপলব্ধিগুলো আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হিসেবে ধরা দেয়। তথাকথিত অস্পৃশ্যদের ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে গলায় কালো সুতো বেঁধে। তথাকথিত অস্পৃশ্যদের চলার অধিকার নেই সরকারি রাস্তায়, তথাকথিত অস্পৃশ্যরা খাবার জল নিতে পারবেন না ধাতব কলসিতে, তথাকথিত অস্পৃশ্যরা ব্যবহার করতে পারবেন না সরকারি ইঁদারা, তথাকথিত অস্পৃশ্যরা পরতে পারবেন না সোনা বা রুপোর অলঙ্কার, তথাকথিত অস্পৃশ্যরা খেতে পারবেন না নিজেদের পছন্দ মতো খাবার— অম্বেডকরের ভাষণে বা রচনায় উঠে এসেছে এমন নানা ঘটনার কথা। সেই সব সামাজিক বৈষম্যের দৃষ্টান্ত তুলে ধরেই অম্বেডকর প্রশ্ন তুলেছিলেন, আমরা কি আদৌ রাজনৈতিক স্বাধীনতা পাওয়ার যোগ্য হয়ে উঠেছি? ১৯২৮, ১৯৩৫, ১৯৩৬— এই সময়ের নানা ঘটনার কথা তুলে ধরে অম্বেডকর সেই প্রশ্ন তুলেছিলেন। প্রায় একশো বছর পেরিয়ে এসেও সে প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক হয়ে ধরা দিচ্ছে।

কবে আমরা মুক্ত হব এই মারাত্মক সামাজিক বৈষম্য থেকে? আর কত দিন পরে বা কত বছর পরে পূর্ণ সামাজিক স্বাধীনতায় পৌঁছতে পারব আমরা? এই সব প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াতে হচ্ছে এখনও— এর চেয়ে লজ্জার বিষয় আর কী হতে পারে?