নিজের একটা ছোট বাড়ি। তারই সামান্য একটি অংশকে ব্যবহার করে উত্তরবঙ্গের বহু মানুষ এই পর্যটনের মরসুমে ভাল আয় করছেন, যা শিল্পবঞ্চিত এই এলাকার অর্থনীতিকে নিশ্চয়ই কিছুটা চাঙ্গা করছে। কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে আরও একটি বিরাট উপকার হচ্ছে। পাহাড় বা ডুয়ার্সের সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার বাইরের মানুষের পরিচিতি বাড়ছে। জানাজানি হচ্ছে বিবিধ সংস্কৃতির। দূরত্ব কমছে জনপদ ও জঙ্গলের, পাহাড় ও সমতলের।

সমগ্র বিশ্ব আমাদের পরম আত্মীয়—এই হল চিরন্তন সনাতন ভারতীয় সংস্কৃতি। এমন প্রত্যয় নিয়েই হয়ত পর্যটনের একটি নতুন ধারা হোম-স্টে ও ইকো-ট্যুরিজম। বিশেষ করে অনামী গ্রামীণ পর্যটনের ক্ষেত্রে যা নব দিগন্তের উন্মোচন করেছে। হোম-স্টের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আতিথেয়তা ও আপ্যায়ন। এই উপমহাদেশে   অতিথিকে নারায়ণ রূপে গণ্য করা হয়। অতিথি সেবার মধ্য দিয়ে মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। পরস্পরকে স্নেহ মমতায় কাছে টানা হয়। অতিথি আপ্যায়ন ও বরণ করবার মধ্যে থাকে স্বস্তির অনুভূতি। এই সময়ে ক্ষয়ে যাচ্ছে শুভ বোধ। হারিয়ে যাচ্ছে মমত্ব বোধ। বিভেদকামী শক্তি যখন সক্রিয় তখন পর্যটনের জগতে হোম-স্টে ও ইকো-টুরিজম বিভিন্ন জাতি উপজাতির মানুষের মধ্যে সেতু-বন্ধনের কাজ করবে নিশ্চিত। যার জনপ্রিয়তাও হু হু করে বাড়ছে।  

কবিগুরুর ভাষায়, ‘কাজ করে মন অসাড় যখন মাথা যাচ্ছে ঘুরে হিমালয়ের খেলা দেখতে এলেম অনেক দূরে।’ অবসর কিংবা ছুটির দিনগুলোতে ভ্রমণ পিপাসুরা ছুটে যান নির্জন নিরালায়। 

এত দিন বাছাই করা কয়েকটা প্রসিদ্ধ স্থানই ছিল পর্যটকদের ঠিকানা কখনও বা কিছু বনবাংলো কিংবা ঐতিহাসিক স্থান। যার বুকিং পাওয়া ছিল কষ্টকর এবং ব্যয়সাধ্য। অন লাইন বুকিং-এর এমন ব্যবস্থা ছিল না। গ্রাম ভারতে ছড়িয়ে রয়েছে এমন অনেক অখ্যাত আনামী প্রাকৃতিক পরিবেশ যেখানে ভ্রমণ রসিক মানুষ দু’দণ্ড শান্তি পেতে পারেন। ব্যস্ত জীবনের কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতির কোলে  প্রাণ ভরে শ্বাস নিতে পারেন।

রূপকথার  রূপসী যেন উত্তরবঙ্গ। সাত বোনের মতো উত্তর-পূর্বের সাতটি রাজ্যের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য অহরহ চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে ভ্রমণ পিপাসুদের। আর শিলিগুড়ি হল সেই সেভেন সিস্টারের প্রবেশ দ্বার। যেখান থেকে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায় মন পছন্দ কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের জল, জঙ্গল পাহাড়কে কেন্দ্র করে মোহনীয় হোম-স্টেগুলির অবস্থান। একঘেয়েমি জীবনের থেকে ক্ষণিকের মুক্তি পেতে প্রকৃতি আর মাটির সান্নিধ্য খোঁজে সৌন্দর্য পিপাসু মন। অবসরের কয়েকটা দিন প্রকৃতির সঙ্গে লেপটে থাকা যায় অনাবিল আনন্দে। উত্তরবঙ্গের আকাশ ছুঁইছুঁই পর্বত শিখর আর লাবণ্যময়ী পার্বত্য উপত্যকার খাঁজে খাঁজে বিভিন্ন জাতি-জনজাতির বাস।

এ ছাড়াও রয়েছে বনবস্তি, চা-বাগান ও নদী উপত্যকার গা ঘেঁসে গড়ে ওঠা জনবসতি। নদনদীর ও ঝরনার কুলু কুলু শব্দ কিংবা গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকা পাখপাখালির সুমিষ্ট সুর। ঝিঁঝিঁর ডাক, ময়ূরের নৃত্য, লাজুক হরিণীর দৌড় দেখতে দেখতে মন ময়ূরের মতো নেচে ওঠে। গাছের পাতায় রোদের ঝিকিমিকি আর কুয়াশা ভেদ করে পাইনের গাছের ফাঁকে ফাঁকে আলোর কিরণমালা যেকোনো জীবন রসিকদের আনমনা করে দেই বইকি। এমন অভিনবত্বের স্বাদ নিতেই পর্যটকদের ঢল নামে রূপসী উত্তরবঙ্গে। 

মনোলোভা প্রাকৃতিক পরিবেশে দুর্গম পার্বত্য এলাকায় বিক্ষিপ্ত জনবসতিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে হোম-স্টেগুলি। প্রকৃতির শান্ত স্নিগ্ধ পরিবেশে ভ্রমণ পিপাসুরা স্থানীয় মানুষের আতিথেয়তা গ্রহণ করেন। জনজাতীদের সারল্য ও মাধুর্যের স্পর্শ পাওয়া যায় যেখানে সহজেই। নির্ধারিত রেট দিয়ে থাকবার সুব্যবস্থা রয়েছে। ইচ্ছে করলে স্থানীয় খাদ্যের স্বাদ নিতে যেমন পারবেন, তেমনই ঘরের নিকানো উঠোনময় প্রজাপতির ইতিউতি আর ফুল অর্কিডের সমারোহ দেখে মনে হবে আপনি কিছু দিনের জন্য রূপকথার দেশের বাসিন্দা। জনজাতীদের নিজস্ব লোকনৃত্য- সঙ্গীত ঘরবাড়ি এবং তাদের পরিপাটি শৈল্পিক জীবন যাপন খুব কাছ থেকে দেখা যায়। তবে অর্থের বিনিময়ে যার হিসাব মেলানো যাবে কোনওদিন। তাদের আতিথেয়তা নিখাদ আন্তরিকতায় থাকে ভরপুর। এমন বিরল  ভ্রমণের রেশ থেকে যায় বহুদিন।        

স্বাভাবিক ভাবেই পর্যটন আজ শুধু বিনোদন নয় এলাকার মানুষের আয়েরও উৎসও। জীবন জীবিকার সঙ্গে সম্পৃক্ত। উত্তরবঙ্গ বহু জাতি ভাষা সংস্কৃতির মিলনক্ষেত্র। রয়েছে বিভিন্ন জনজাতিদের নিজস্ব সংস্কৃতি। প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে তাদের নিজস্বতাকে নীরবে নির্জনে  টিকিয়ে রেখেছেন তাঁরা। এমন সরলমনা মানুষের সান্নিধ্যে আর তাদের বাড়ির অতিথি হয়ে পর্যটকরা খুব কাছ থেকে ছুঁয়ে যায় প্রাকৃতিক পরিবেশেকে। পিছিয়ে পড়া পাহাড়ি গ্রামসহ, বনবস্তি, চা বাগান কিংবা পাহাড়ি নদী ঝরনার কাছে টেন্টে রাত্রিবাসের বিরল অভিজ্ঞতা অর্জন করা যায়। এই সুযোগে সামাজিক বন্ধন দৃঢ়তর হয়। পরস্পরকে ঘরোয়া পরিবেশে খুব কাছ থেকে চেনা জানার এমন সুবর্ণ সুযোগ হোম-স্টে করে দিয়েছে।

সাংস্কৃতিক বিনিময়ের এমন সরেস উপায় আর কি বা হতে পারে। পিছিয়ে পড়া অনামি এলাকার উন্নয়নের সঙ্গে যেমন জীবন জীবিকার বিষয়টি গুরুত্ব পায় তেমনই যে সংযোগ আর সম্পর্কের বন্ধন  দৃঢ় হয়। এটাই হোম-স্টের গুরুত্ব। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের সুরটি ধরা পড়ে সহজেই। ভৌগলিক বিচ্ছিন্নতা  সত্ত্বেও মুল স্রোতের সঙ্গে একাত্মতা হতে উৎসাহিত করবে প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনসমাজকে এই ধরনের হোম-স্টে ও ইকো ট্যুরিজম। অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে স্থানীয় বাসিন্দাদের সরলতাকে লুঠ করে যেন মধ্যস্বত্বভোগীদের উৎপাত না ঘটে। তা হলে লাভের গুড় পিঁপড়েই খেয়ে ফেলবে। 

কেন্দ্রীয় ও রাজ্যের পর্যটন দপ্তরকে সতর্কতার সঙ্গে বিষয়টি লক্ষ্য রাখতে হবে। দেশি বিদেশি পর্যটকদের সেরা ডেসটিনেশন হবে উত্তরবঙ্গের মনোলোভা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কোলে লালিত হোম-স্টে ও ইকো-ট্যুরিজম। কিন্তু তখনই ভিন্ সংস্কৃতির প্রভাবও সামলে চলতে হবে। স্থানীয় সংস্কৃতি যেন আঘাত না পায়, সে দিকে নজর রাখতে হবে। 

(মতামত লেখকের নিজস্ব)