যোগ্য গরিব কে?
এন সি সাক্সেনা কমিটির রিপোর্ট (২০০৮) অনুসারে ইতিমধ্যেই দেশব্যাপী আর্থ-সামাজিক-জাতিগত আদমসুমারির (সোশিয়ো-ইকনমিক কাস্ট সেন্সাস ২০১১) কাজ শেষ হয়েছে। সেখানে গ্রামীণ এলাকায় প্রতিটি গ্রাম তথা মৌজা-ভিত্তিক এবং শহর এলাকায় প্রতিটি ওয়ার্ড-ভিত্তিক সমস্ত পরিবারকে নির্দিষ্ট সূচকের ভিত্তিতে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
poor

কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গাঁধীর প্রস্তাবিত এবং দলীয় ইস্তাহারে সংযোজিত ‘ন্যায়’ প্রকল্পের কাঠামো এবং আর্থিক সংস্থানের উপায় নিয়ে এর আগে আলোচনা করেছি (‘ন্যায়ের টাকা কিন্তু আছে’, ৩-৪)। আমরা দেখেছি, কতকগুলো ব্যবস্থা করতে পারলে সঙ্গতির সমস্যা হবে না। কিন্তু এই প্রকল্পের সুযোগ পাওয়ার যোগ্য কারা, সেটা নির্ধারণ করা সহজ কাজ নয়। অর্থাৎ, গরিব খোঁজার ক্ষেত্রে সমস্যা আসবেই এবং সেই কাজটা কখনওই নিখুঁত হবে না।

এন সি সাক্সেনা কমিটির রিপোর্ট (২০০৮) অনুসারে ইতিমধ্যেই দেশব্যাপী আর্থ-সামাজিক-জাতিগত আদমসুমারির (সোশিয়ো-ইকনমিক কাস্ট সেন্সাস ২০১১) কাজ শেষ হয়েছে। সেখানে গ্রামীণ এলাকায় প্রতিটি গ্রাম তথা মৌজা-ভিত্তিক এবং শহর এলাকায় প্রতিটি ওয়ার্ড-ভিত্তিক সমস্ত পরিবারকে নির্দিষ্ট সূচকের ভিত্তিতে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এক, ‘এক্সক্লুডেড’ বা বাতিল পরিবার, যারা কোনও ভাবেই বিপিএল (দারিদ্র সীমার নীচে) তালিকায় জায়গা পাবে না। দুই, ‘ইনক্লুডেড’ বা অন্তর্ভুক্ত পরিবার, যারা সরাসরি বিপিএল তালিকায় জায়গা পেয়েছে। তিন, ‘ডিপ্রাইভড’ বা বঞ্চিত পরিবার, যেখানে আগের দু’টি ভাগের বাইরের বাকি সমস্ত পরিবারকে তাদের বঞ্চনার তীব্রতা বা মাত্রা অনুসারে বেশি থেকে কমে সাজানো হয়েছে। এর পর, বেশি বঞ্চিত পরিবারটি বিপিএল তালিকায় আগে ঢোকার অগ্রাধিকার পাবে। এখন ‘ন্যায়’ প্রকল্পের জন্য উপরের দ্বিতীয় ভাগের সমস্ত পরিবার প্রথমেই অন্তর্ভুক্ত হবে। এর পর তৃতীয় ভাগের পরিবারগুলির মধ্য থেকে বঞ্চনার মাত্রা অনুসারে ২০ শতাংশ সবচেয়ে বঞ্চিত পরিবারকে ‘ন্যায়’ প্রকল্পের আওতায় আনা হবে ধাপে ধাপে। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে এই ন্যায় প্রকল্পটি নির্দিষ্ট গরিব-ভিত্তিক না হয়ে সকলের জন্য হলে (যা কিনা সর্বজনীন ন্যূনতম আয়ের শামিল) উপরের বর্ণিত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সংশ্লিষ্ট খরচ থেকে রেহাই পাওয়া যেত। তা ছাড়া, প্রকল্প ‘টার্গেটেড’ বা পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্য-ভিত্তিক হলে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সুযোগও বেশি থাকে।

এ বার দেখে নেওয়া যাক কী কী কারণে ‘ন্যায়’ গ্রহণযোগ্য।

১) যে কোনও ধরনের সরাসরি টাকা বণ্টনের প্রকল্প সব সময়ই জনপ্রিয়তার দিক থেকে খুব উপরের দিকে থাকে। বিলিবণ্টন যে হেতু রাজনৈতিক নেতাদের সব সময়ই আরও ক্ষমতাবান করে তোলে, সুতরাং এই ধরনের প্রকল্পের ক্ষেত্রে সাধারণত ডান-বাম দুই দিকেরই রাজনৈতিক সমর্থন পাওয়া যায়। 

২) এই ধরনের প্রকল্পের উপভোক্তাদের এই কর্মসূচিতে যোগ দিতে কোনও খরচ বা শর্ত মানতে হয় না এবং আয়ের বা সম্ভাব্য আয়ের কোনও সুযোগ ছেড়ে আসতে হয় না। যেমন ১০০ দিনের কাজের প্রকল্পের সুযোগ পেতে গেলে এক জনকে কাজ করে মজুরি পেতে হয়, সুতরাং ওই ১০০ দিনের কাজের সময় উপভোক্তা অন্য আয়যোগ্য কাজের সুযোগ হারান। কিন্তু ওই একই মজুরির টাকা কাজ না করিয়ে সরাসরি দিলে উপভোক্তার নিট আয় মজুরির সমান হয়। অর্থাৎ গরিবি হটানোর জন্য আয় সংস্থানই মূল লক্ষ্য হলে ‘ন্যায়’-র মতো সরাসরি টাকা বণ্টনের প্রকল্পের অর্থনৈতিক যুক্তি অনেক বেশি।

৩) উন্নত দেশে ‘দারিদ্রসীমার সমতুল্য আয়’ যথেষ্ট বেশি, তাই এই ধরনের টাকা বণ্টনের প্রকল্প ততটা সম্ভবপর নয়। কিন্তু ভারতে ‘দারিদ্রসীমার সমতুল্য আয়’ খুব কম, এবং আয়ের বণ্টনেও অসাম্য বিপুল, তাই এই জাতীয় প্রকল্প কার্যকর। 

৪) অনেকের আবার চিন্তা, এই প্রকল্প বাজারের মূল্যস্ফীতির কারণ হবে, বিশেষত ভোগ্যপণ্য ও খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়ে যাবে। কিন্তু এই ভাবনাকে তিনটি যুক্তিতে অমূলক বলা যায়। এক, গত ছ’সাত বছর যাবৎ ভারতে খাদ্যদ্রব্যের মূল্যস্ফীতির হার নিম্নমুখী, এমনকি নানা ক্ষেত্রে মূল্যস্তর কমছে। দুই, ভোগ্যপণ্য ও খাদ্যদ্রব্যের মূল্যস্ফীতি বিভিন্ন কারণে হতে পারে, যেমন তেলের দাম বৃদ্ধি (যা সরবরাহের খরচ বাড়ায়), চরম প্রতিকূল আবহাওয়া (বন্যা, খরা), ইত্যাদি। সে ক্ষেত্রে খাদ্যের চাহিদা বৃদ্ধি কেবল একটিমাত্র কারণ। তিন, অন্তত ভারতের ক্ষেত্রে এখনও পর্যন্ত এমন কোনও গবেষণালব্ধ দৃষ্টান্ত নেই যেখানে গরিবের খাবারের চাহিদা বাড়ার কারণে মূল্যস্ফীতি ঘটছে। ১০০ দিনের কাজের মোটামুটি সফল রূপায়ণের পরেও গত দশ-বারো বছরে এমন কোনও দৃষ্টান্ত নেই যে, গরিবের হাতে পয়সা আসার ফলে বাজারদর বেড়েছে।

৫) কারও আবার শঙ্কা হচ্ছে যে, গরিবের হাতে সরাসরি টাকা গেলে, সে মদ খেয়ে বা জুয়া খেলে তার অসৎ ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু বাস্তব অন্য কথা বলে। সেল্ফ এমপ্লয়েড উইমেন’স অ্যাসোসিয়েশন-এর (সেবা) তিনটি পরীক্ষামূলক গবেষণা থেকে দেখা যাচ্ছে, গরিব মানুষ সরাসরি হাতে টাকা পেলেও অসৎ ভাবে খরচ করেননি। বেশির ভাগ গরিব পরিবার ওই টাকা নিজস্ব ক্ষুদ্র উদ্যোগে লাগিয়েছে বা গবাদি পশু কিনেছে। দিল্লি ও ইনদওরের কাছে যে গ্রামগুলিতে এই গবেষণা করা হয়, সেই গ্রামগুলির সামগ্রিক উন্নতিও ধরা পড়েছে। উপরন্তু, প্রস্তাবিত ‘ন্যায়’ প্রকল্পের টাকা পরিবারের মহিলা সদস্যের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট-এ জমা পড়বে। তাতে টাকার সদ্ব্যবহারের সম্ভাবনা বাড়বে।

সব শেষে অবশ্যই এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে অন্য যে কোনও লক্ষ্যভিত্তিক গরিবি হটানোর প্রকল্পের মতো ‘ন্যায়’-এরও বিভিন্ন সমস্যার দিক থাকবে। কিন্তু আমার মতে সমস্যার সিংহভাগই থাকবে যোগ্য গরিব খোঁজার ক্ষেত্রে। এর অর্থনৈতিক সংস্থান বা সামগ্রিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ নেই। প্রকল্পটি প্রশ্নাতীত হত যদি এই কর্মসূচিতে সকলকেই শামিল করা যেত। সে দিক থেকে হয়তো একে একটা সর্বজনীন ন্যূনতম আয় প্রকল্পের প্রথম পর্ব বা অগ্রণী প্রকল্প (পাইলট প্রজেক্ট) হিসেবে দেখা যেতে পারে।             

ব্রিটেনে ওয়ারিক ইউনিভার্সিটিতে অর্থনীতির শিক্ষক

নির্বাচনী নির্ঘণ্ট

২০১৪ লোকসভা নির্বাচনের ফল

  • সকলকে বলব ইভিএম পাহারা দিন। যাতে একটিও ইভিএম বদল না হয়।

  • author
    মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূলনেত্রী

আপনার মত