×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

০৫ মার্চ ২০২১ ই-পেপার

ক্ষতি

১৫ জানুয়ারি ২০১৯ ০০:০০
শ্রীজাতর জন্য মালদহে অতিরিক্ত সতর্কতা। —ফাইল চিত্র

শ্রীজাতর জন্য মালদহে অতিরিক্ত সতর্কতা। —ফাইল চিত্র

একের পর এক অসহনশীলতার ঘটনায় ভারত এক একটি মাইলফলক পার করিতেছে। কবি শ্রীজাতর উপর হিন্দুত্ববাদীদের হামলা হইল অসমের শিলচরে। শিলচর নামটি সংঘর্ষের ইতিহাসের স্মৃতি বহন করিয়া আনে। কিন্তু প্রখ্যাত সাহিত্যিকের সভায় উপস্থিত হইয়া এমন হামলা সেখানেও ঘটে নাই। বরেণ্য অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহের সঙ্গত ও বাস্তবসম্মত একটি মন্তব্যের জন্য কী পরিমাণ অসম্মানিত হইতে হইল, তাহাও একটি উল্লেখযোগ্য মুহূর্ত হিসাবে গণ্য হইবার মতো। পাশাপাশি স্মরণীয় উত্তরপ্রদেশের অভূতপূর্ব পরিস্থিতি, যেখানে হিন্দু জনতার তাণ্ডবে নিরস্ত্র অসহায় মানুষের সহিত তাঁহাদের সুরক্ষাদানে ছুটিয়া আসা পুলিশ অফিসার নিজেও হিংস্র জনতার হাতে নিহত হইতে পারেন। এখনও অবধি যোগী আদিত্যনাথের সরকার সেই রাজ্যে গরু-নির্যাতনের তদন্তেই ব্যস্ত, জনতার হাতে পুলিশ-নিধন গৌণ অপরাধ। কেরলের শবরীমালা মন্দিরে মহিলাদের প্রবেশ উপলক্ষ করিয়া বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠীর মধ্যে চলিতেছে নিরন্তর মারপিট। তাহার পর স্মরণীয়, ‘দি অ্যাক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার’ চলচ্চিত্রটিকে কেন্দ্র করিয়া কংগ্রেস কর্মীরা কী ভাবে উদ্দাম হামলা চালাইতেছেন একের পর এক মাল্টিপ্লেক্সে, চলচ্চিত্র প্রদর্শন বন্ধ করিয়া উদ্দেশ্য সিদ্ধ করিতেছেন। এবং শেষত, কলিকাতার প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সভায় এবিভিপিকে কথা বলা হইতে ঠেকাইতে চলিয়াছে ছাত্রদের দুই পক্ষের প্রবল সংঘর্ষ। এ সমস্তই দেখাইতেছে, অসহিষ্ণুতা এখন দেশের প্রাত্যহিক জীবনচর্যা। একটি ঘটনাকে ব্যতিক্রম ঠাহরিয়া তাহার আলোচনা অর্থহীন।

উল্লেখ্য, প্রথম কয়েকটি দৃষ্টান্তে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিই সরাসরি অসহনশীলতার পরিবেশ ও তজ্জনিত সংঘর্ষের হেতু হইলেও শেষ দুইটি উদাহরণ কিন্তু বিরোধী শিবিরের। রাহুল গাঁধী বারংবার নিষেধ করিয়াছিলেন এই চলচ্চিত্রকে উপলক্ষ করিয়া কোনও ধরনের ধ্বংসাত্মক আচরণ করিতে। কিন্তু সর্বভারতীয় সভাপতির কথা শুনিতে দলীয় কর্মীরা নারাজ। প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদাহরণটি বলিয়া দেয়, বাম ও লিবারালরাও একই রকম হিংস্রতায় বিপরীত মতাবলম্বীদের বাধা দিতে সিদ্ধহস্ত। বিজেপির বিরুদ্ধে অসহিষ্ণুতার অভিযোগ ও নিজেদের অসহিষ্ণুতা প্রকাশের মধ্যে তাঁহারা বিশেষ বিরোধ দেখেন না।

অর্থাৎ এই দেশের সার্বিক পরিস্থিতিটি এখন দলমতনিরপেক্ষ ভাবেই অসহিষ্ণু। বিভেদ ও সংঘর্ষ উস্কাইতে বিজেপির সহিত কংগ্রেস বা অন্য বিরোধী দলগুলির কোনও তুলনা না হইলেও শেষ পর্যন্ত অসহিষ্ণুতা প্রচার ও প্রসারে সব দলই ক্রমে এক জায়গায় আসিয়া দাঁড়াইতেছে। ইহাই স্বাভাবিক। সহিষ্ণুতার মতো অসহিষ্ণুতাও একটি আত্ম-উজ্জীবনকারী পরিবেশ, যে পরিবেশে এক-কে দেখিয়া অন্যে শিখে, কতিপয়ের দৃষ্টান্ত ক্রমে বহু মানুষের সংস্কৃতিতে প্রসারিত হয়। অমর্ত্য সেন আবারও মনে করাইয়া দিয়াছেন, এই দেশে গত কয়েক বৎসরে বিজেপির কল্যাণে অপরের মতকে মান্য করিবার, এমনকি সহ্য করিবার অভ্যাসটি গত হইয়াছে। সেই প্রেক্ষিতেও অসহিষ্ণুতার প্রসারিত অর্থটি উপলব্ধি করা প্রয়োজন। দেশের যে ক্ষতি হইয়াছে ও হইতেছে, তাহা বিপুল ও গভীর। এই উপলব্ধিটি ক্ষতির আকার ও প্রকার বুঝিতে সাহায্য করিতে পারে।

Advertisement
Advertisement