Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

১৭ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

মুখ্যমন্ত্রীর দূরদৃষ্টি এ বার শিল্পের জমি তৈরি করবে কি

প্রকৃত উৎসবের বাংলা?

দেবাশিস ভট্টাচার্য
০৫ জানুয়ারি ২০১৮ ০০:১৪

চা র পাশে এখনও বেশ উৎসবের আবহ। বড়দিন, বর্ষশেষ এবং বর্ষবরণের আনন্দ এখনও জারি আছে। শারদোৎসব বাদ দিলে এমন সর্বব্যাপী উৎসবময়তার হিড়িক বাঙালি-জীবনে ছিল না। রাজ্যে ‘পরিবর্তন’-এর সরকার আসার পর থেকে এই পরিবর্তনটাও বেশ চোখে পড়ছে। ক্রমে তার ব্যাপ্তিও ঘটছে।

উৎসব সব সময়েই উৎসাহবর্ধক। দৈনন্দিনতার ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে আলো-গান-হাসি-হুল্লোড়ের মধ্যে একটা বাড়তি জীবনীশক্তি পাওয়া যায়। অনেক না-পাওয়ার অভাব ভুলে থাকার জন্য এটা খারাপ নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাঙালিকে সেই ‘সুযোগ’ করে দিয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘‘উৎসব তো আমরা রচনা করতে পারি নে, যদি সুযোগ হয় তবে উৎসব আমরা আবিষ্কার করতে পারি।’’ মমতার হাত ধরে বাংলা এখন বহুবিধ উৎসব পালনে অভ্যস্ত। এমন অনেক উৎসব তিনি তৈরি করেছেন, আগে যা কেউ কোনও দিন ভেবেও দেখেনি। যেমন, মাটি উৎসব, জঙ্গলমহল উৎসব, দিঘায় তট উৎসব, বড়দিনের পার্ক স্ট্রিটে কার্নিভাল, লালদিঘির পাড়ে সপ্তাহান্তের ‘দেখো রে’ ইত্যাদি। ভেবে দেখলে এর কোনওটিই ‘রচনা’ নয়, ‘আবিষ্কার’। পার্ক স্ট্রিট, বড়দিন, জঙ্গলমহল, দিঘা বা দিঘি সবই ছিল। যা হল তা শুধু বিভিন্ন উৎসবের আলো জ্বালিয়ে দেওয়া।

Advertisement

রাজনীতির চশমা পরে এগুলির পিছনে কেউ ভিন্নতর উদ্দেশ্য খুঁজে পেতেই পারেন। কেউ বলতেই পারেন, বিশেষ বিশেষ জাতপাত, ধর্ম, সম্প্রদায়কে ‘তুষ্ট’ করার এ এক সহজ পন্থা। কিন্তু দৃষ্টিকে কিঞ্চিৎ স্বচ্ছ করলে বোঝা যায়, আসলে এর মাধ্যমে তৈরি হয় এক বৃহত্তর জনসংযোগ। জাতপাত, ধর্মের বেড়া ভেঙে সকলকে নিয়ে আনন্দ করার পরিসর সৃষ্টিতে এই রকম উৎসবের গুরুত্ব কম নয়।

বামেদের দীর্ঘ শাসনকালে উৎসবের চরিত্র ছিল ভিন্ন। বড় উৎসব বলতে দুর্গাপুজো। বাকি যেটুকু যা, সব নিজ নিজ গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ। এমনকী চলচ্চিত্র উৎসবও কার্যত নন্দনের চৌকাঠ পেরোত না। সেখানে মুষ্টিমেয়র প্রবেশাধিকার। মমতা সকল উৎসবকে সর্বজনীনতায় উত্তীর্ণ করতে পেরেছেন। এটা তাঁর কৃতিত্ব।

এ সবের বাইরে আরও একটা জিনিস চোখে পড়ে। সেটা হল সজ্জা। কলকাতা তো বটেই, জেলা শহরগুলিকে সাজিয়ে তোলার একটা সচেতন চেষ্টা বছরভর জারি আছে। ফলে উৎসবের মরশুম না থাকলেও বাহারি আলোর সাজে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা এবং উড়ালপুলগুলি নয়নাভিরাম হয়েছে। অধিকাংশ জেলা শহরেও রাস্তাঘাটের উন্নতি অস্বীকার করার নয়।

মুখ্যমন্ত্রী হয়েই মমতা নিয়মিত জেলা সফর শুরু করেছেন। প্রতি মাসেই এক বা একাধিক জেলায় ঘুরে বেড়ান তিনি। সব সময় যে তিনি সদর শহরে থাকেন, তা-ও নয়। বরং একটু দূরে কোনও প্রত্যন্ত এলাকা বেছে নেন। এর একটা ইতিবাচক দিক হল, তিনি যাবেন বলে সেই এলাকার উন্নতির দিকে আলাদা নজর পড়ে। কিছুটা হলেও কাজ হয়। এটা মুখ্যমন্ত্রীর সচেতন কৌশল।

তবে এই রকম যে কোনও কৌশলের পিছনেই থাকে কিছু পরিকল্পনা। থাকে দূরদর্শী ভাবনা এবং তা বাস্তবায়িত করার জন্য প্রয়োজনীয় দৃঢ়তা। মানতেই হবে, মমতা সেই কাজে অনেকাংশে সফল। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত তিনি এমন কিছু কিছু কাজ করতে পেরেছেন, যা করার ‘সাহস’ তাঁর পূর্বসূরিদের কারও হয়নি। জতুগৃহ হয়ে ওঠা ঘিঞ্জি মহাকরণ থেকে সরকারি মসনদ নবান্নে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া তার অন্যতম স্মারক।

কোনা এক্সপ্রেস দিয়ে যাওয়ার সময় মমতার চোখে পড়েছিল বাড়িটি। খোঁজ নিয়ে জেনেছিলেন কী ভাবে বাড়িটি সরকার নিজের হাতে নিতে পারে। তার পর কী ভাবে দ্রুততার সঙ্গে বাড়িটির সংস্কার করে, নানা মহলের প্রবল প্রতিরোধ উপেক্ষা করে মহাকরণ থেকে সরকারের সদর দফতর আজকের নবান্নে তুলে এনেছেন তিনি, তা সবার জানা। যাঁরা প্রতিরোধের বীজ বুনেছিলেন, আজ তাঁরা নিশ্চুপ!

রাজারহাটের ইকো পার্ক এখন শহরের অন্যতম দ্রষ্টব্য। তার চার পাশে রয়েছে আরও অনেক দর্শনীয় জায়গা। সেগুলিও সারা বছর দর্শক টানে। কী ছিল সেখানে? জলা-জঙ্গল-বাদাবন। আক্ষরিক অর্থেই বন কেটে বসত গড়ার মতো মমতার পরিকল্পনার ফসল আজকের ইকো পার্ক ও তার সংলগ্ন এলাকা। ঠিক যেমন তাঁর পরিকল্পনায় রাজারহাটে তৈরি হয়েছে একটি কনভেনশন সেন্টার। যে কোনও আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারের সঙ্গে যার তুলনা করা চলে। আলিপুরে সমাজবিরোধীদের আখড়া হয়ে পড়ে থাকা অন্ধকার জমিতে ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে আধুনিক একটি মুক্তমঞ্চ। আরও একটি মঞ্চ সমাপ্তির মুখে। এ সব কোনও কিছুই আচমকা আকাশ থেকে নামেনি। চোখের সামনে জায়গা তৈরি ছিল। ছিল না উদ্যোগ এবং সাহস। মমতা পরিকল্পনা মাফিক করে দেখালেন।

নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানাতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী আনন্দবাজার ডিজিটাল-কে স্বপ্ন দেখার কথা বলেছেন। বলেছেন, ২০১৮ হোক স্বপ্ন দেখার বছর। তার ঠিক দু’দিন আগেই সাগরদ্বীপে গিয়েছিলেন তিনি। গঙ্গাসাগরে যাঁরা আগে গিয়েছেন ও এখনও যান, তাঁদের নজরে এখানকার পরিবর্তনটা ধরা পড়বেই। রাস্তাঘাট, পরিষেবা, হেলিপ্যাড, পর্যটকদের থাকার অঢেল বন্দোবস্ত, মন্দিরের ঝকঝকে ব্যবস্থা, সব মিলিয়ে জায়গাটি জমজমাট। সড়ক পথে সরাসরি দ্বীপে পৌঁছনোর জন্য মুড়িগঙ্গা নদীর উপর সেতু তৈরির পরিকল্পনাও চূড়ান্ত।

সেখানেই সাগরতটে দাঁড়িয়ে প্রশাসনের কর্তাদের কাছে মুখ্যমন্ত্রী শুনিয়েছেন তাঁর একটি স্বপ্নের কথা। তিনি চান, সাগরদ্বীপকে দিঘা, মন্দারমণি, পুরীর মতো পর্যটনের আকর্ষণস্থল করে তুলতে। পুরীর মন্দিরে পুজো দেওয়ার বাইরেও সমুদ্রতট যেমন পর্যটকদের সব সময়ের আকর্ষণ, তেমনই সাগরদ্বীপকেও নিছক দু’দিনের মকরস্নানের গন্তব্য না রেখে সারা বছরের পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

আজ বললেই কাল সব কিছু হয় না। এই পরিকল্পনার বাস্তবায়নও অবশ্যই সময়সাপেক্ষ। ব্যয়সাপেক্ষ তো বটেই। তবে এটা ভাবতে পারাও নিছক কম নয়। এই দূরদর্শিতা এবং দৃঢ়তা এক জন প্রশাসকের বড় গুণ। অনেক অসম্ভব কাজ এতে সম্ভব হয়। আরও আগে, আর কেউ তো এ ভাবে ভাবেননি! কেন?

আগামী দিনের কথা ভাবতে না পারা বা মুখ ফিরিয়ে থাকার মাশুল এই রাজ্য নানা ভাবে দিয়েছে। জ্যোতি বসুর দল আশির দশকে এখানে কম্পিউটার আসতে বাধা দিয়েছিল। অটোমেশনের বিরুদ্ধে লালা ঝান্ডা উঠেছিল। আমরা পিছিয়ে গিয়েছিলাম। সিঙ্গুর আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজ্যে পরিবর্তন এলেও মমতার গায়ে লেগে গিয়েছিল শিল্প-বিরোধী তকমা। তাই শিল্পের জন্য জমি পাওয়ার প্রশ্নেও বিনিয়োগকারীদের অনেকে হয়তো সন্দিহান। কিন্তু এ সব কাটিয়ে ওঠার একটা সদর্থক প্রয়াসও পাশাপাশি চলছে। মুখ্যমন্ত্রী নিজে এ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। আসন্ন বিশ্ব বঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলনে তার কিছু ইঙ্গিত মিলতে পারে। বড় বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনের জন্য যা জরুরি।

যদি তা হয়, তা হলে বলতেই হবে, শুধু উৎসবের আবিষ্কার নয়, এই বাংলা নিজেকেও নতুন করে আবিষ্কার করতে পারে। এবং ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে সেই বাংলাই হতে পারবে প্রকৃত উৎসবের বাংলা।

আরও পড়ুন

Advertisement