• প্রেমাংশু চৌধুরী
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

সাফল্যের উৎপত্তি ও বিকাশ

যোগীকে বাদ দিয়ে বিজেপির পক্ষে বিহারের ভোটে নামা অসম্ভব

Hathras Protest
মেরুকরণ-নায়ক: হাথরস ঘটনার প্রতিবাদে যোগী আদিত্যনাথের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ, মুম্বই, ১০ অক্টোবর। এএফপি

লোকসভায় দাঁড়িয়ে যোগী আদিত্যনাথ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। কথা বলতে গিয়ে কান্নায় গলা বুজে আসছে। স্পিকারের চেয়ার থেকে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় তাঁকে বার বার শান্ত করার চেষ্টা করছেন। আশেপাশের বিজেপি সাংসদরা কেউ তাঁর পিঠে হাত রাখছেন। কেউ চোখ মুছিয়ে দিতে চাইছেন। যোগীর গাল বেয়ে চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে। ধরা গলায় যোগী বলছেন, ‘‘আমি রাজনৈতিক বিদ্বেষের শিকার। শুধু জানতে চাই, আমি এই সংসদের সদস্য কি না? আমাকে সংসদ সুরক্ষা দিতে পারবে কি না?’’

ঘটনাস্থল, লোকসভা। ২০০৭-এর ১২ মার্চ। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর গদিতে তখন মুলায়ম সিংহ যাদব। সাম্প্রদায়িক অশান্তি পাকানোর চেষ্টার অভিযোগে গেরুয়াধারী গোরক্ষপুরের সাংসদকে মুলায়মের পুলিশ গ্রেফতার করে জেলে পোরে। টানা ১১ দিন যোগী জেলে আটক ছিলেন। জামিনে ছাড়া পাওয়ার পরেই লোকসভায় এসে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। সোমনাথবাবু তাঁকে বার বার শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন। যোগীর অভিযোগ খতিয়ে দেখার জন্য সে দিন গুরুদাস দাশগুপ্তের মতো বাম সাংসদরাও স্পিকারের কাছে আর্জি জানিয়েছিলেন। যোগী ধরা গলায় কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, ‘‘আমাকে সংসদ সুরক্ষা দিতে না পারলে আমি আজই লোকসভা ছেড়ে চলে যাব। আমার কাছে এ সবের কোনও গুরুত্ব নেই। আমি সমাজের জন্য সন্ন্যাস নিয়েছি। নিজের বাবা-মাকে ছেড়েছি।’’

উত্তরপ্রদেশে অশান্তি তৈরির চেষ্টার অভিযোগে গ্রেফতার হওয়ার ১৩ বছর পরে যোগী আদিত্যনাথ এখন নিজেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর গদিতে। হাথরস-কাণ্ডের পর তিনি এখন বলছেন, তাঁর রাজ্যে অশান্তি তৈরির জন্য আন্তর্জাতিক স্তরে ষড়যন্ত্র হচ্ছিল।

তিন বছর আগে নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহ-সঙ্ঘ পরিবার— এই ত্রিশক্তি গেরুয়াধারী যোগীকে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর পদে তুলে এনেছিল। রাজনৈতিক গুরুত্বের বিচারে তিনি বোধ হয় বিজেপিতে মোদী-শাহের পরেই তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। কিন্তু হাথরসের ঘটনার পরে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে যোগীর দক্ষতা নিয়ে বিজেপি-আরএসএস-এর একাংশের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁর কাজকর্মের ধরন নিয়ে গুঞ্জন ছিলই। ঠাকুর সম্প্রদায়ের মুখ্যমন্ত্রীর আমলে ব্রাহ্মণরা কোণঠাসা বলে অভিযোগ উঠছিল। হাথরসে দলিত তরুণীর গণধর্ষণ, মৃত্যুর ঘটনায় শুধু বিজেপির অন্দরে নয়, আদালতেও যোগী সরকার প্রশ্নের মুখে। প্রধানমন্ত্রী হাথরসের ঘটনার বিষয়ে তাঁকে ফোন করেছিলেন। উমা ভারতী, সাধ্বী নিরঞ্জন জ্যোতির মতো বিজেপি নেত্রীরা যোগীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

এখানেই যোগীর জাদু! তাঁর দিকে আঙুল উঠছে ঠিকই। কিন্তু গুরুত্ব কমছে না। যোগীর রাজ্যে দলিত পরিবারের হেনস্থার জেরে বিহারের দলিত ভোটব্যাঙ্ক বিজেপি তথা এনডিএ-র থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে কি না, তা নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কিন্তু যোগী আদিত্যনাথকেই বিজেপি বিহারে ভোটপ্রচারে তারকার সম্মান দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। নরেন্দ্র মোদীর উত্তরসূরি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী পদের দাবিদার হওয়ার আগে যোগীকে ২০২২-এর উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা ভোট উতরোতে হবে। কিন্তু আপাতত দেওয়াল-লিখন স্পষ্ট। মুখ্যমন্ত্রী যোগীর বিরুদ্ধে দলের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। কিন্তু উত্তরপ্রদেশের পূর্বাঞ্চল ও লাগোয়া বিহারে গোরক্ষনাথ মঠের প্রভাবের জেরে তার মোহন্ত ও পীঠাধীশ্বর যোগীকে বাদ দিয়ে বিজেপির পক্ষে বিহারের ভোটে নামা সম্ভব নয়।

এমন নয় যে, যোগী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিন বছরে বড় মাপের সাফল্য দেখিয়েছেন। মায়াবতীর আমলে উত্তরপ্রদেশে যমুনা এক্সপ্রেসওয়ে তৈরি হয়েছিল। অখিলেশ যাদবের সময় আগরা-লখনউ এক্সপ্রেসওয়ে। যোগীর ঝুলিতে এখনও তেমন কিছু নেই। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ইনিংসের শুরুতেই তাঁর ঘরের মাঠ গোরক্ষপুরের হাসপাতালে অক্সিজেনের অভাবে শিশুমৃত্যুর ঘটনা। তাঁর অ্যান্টি-রোমিয়ো স্কোয়াড, গ্যাংস্টার বিকাশ দুবের মতো একাধিক ঘটনায় পুলিশের ‘এনকাউন্টার’-এর পরেও রাজ্যে আইন-শৃঙ্খলার উন্নতি ঘটেনি। উল্টে সিএএ বা নয়া নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে তিনি ‘বদলা’ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। 

সেখানেই তাঁর সাফল্য। কোভিডের প্রকোপ এবং লকডাউন জারির পরই এপ্রিল মাসে আরএসএস-এর মুখপত্র পাঞ্চজন্য-তে উত্তরপ্রদেশকে করোনা মোকাবিলায় সেরা রাজ্যের খেতাব দেওয়া হয়েছিল। যোগী সরকার তখনও পরিকাঠামোর অভাব, আইসিইউ বেড, আইসোলেশন ওয়ার্ডের অভাবে জেরবার। কিন্তু যোগীর সাফল্যের বর্ণনায় নিবন্ধে সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল তিনি কী ভাবে তবলিগি জামাতের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা করেছেন। নিন্দুকেরা তাই বলতেই পারেন, দিল্লি থেকে উত্তরপ্রদেশ, বিহার থেকে বাংলা, ভোটের মেরুকরণ করতে হলে যোগী আদিত্যনাথই বিজেপির অন্যতম বাজি।

এই সাফল্যের উৎস সন্ধানে আদিত্যনাথের গুরুর গুরু মোহন্ত দিগ্বিজয়নাথের ইতিহাস ঘাঁটা দরকার। এক সময় অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নেওয়া দিগ্বিজয়নাথ ভি ডি সাভারকরের সময় হিন্দু মহাসভায় যোগ দেন। মহাত্মা গাঁধীর হত্যার ঠিক তিন দিন আগে তিনি এক প্রকাশ্য জনসভায় জাতির জনকের বিরুদ্ধে হিন্দুদের উস্কানি দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ। যার জেরে গাঁধী-হত্যার পরেই তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। ন’মাস পরে ছাড়া পান। তার পর হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, হিন্দু মহাসভা ক্ষমতায় এলে পাঁচ থেকে দশ বছরের জন্য মুসলিমদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হবে।

রামলালার মূর্তি রেখে বাবরি মসজিদ দখল করার পিছনে মোহন্ত দিগ্বিজয়নাথ ছিলেন অন্যতম মস্তিষ্ক। দিগ্বিজয়নাথ ও গোরক্ষপুর মঠের মোহন্ত পদে তাঁর উত্তরসূরি মোহন্ত অবৈদ্ধনাথ দু’জনেই হিন্দু মহাসভার টিকিটে সাংসদ হন। রামমন্দির আন্দোলনে প্রথম সারিতে থেকেছেন। তাঁর উত্তরসূরি যোগী আদিত্যনাথকে সঙ্গে নিয়েই তাই মোদীকে রামমন্দিরের শিলান্যাস করতে হত।

প্রাক্-করোনা যুগের শেষ বিধানসভা ভোট হয়েছিল দিল্লিতে। রাজধানীর বিধানসভা ভোটের প্রচারেও সিএএ-র বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী শাহিন বাগের সামনে বিজেপি গেরুয়াধারী যোগীকে নিয়ে এসে খাড়া করেছিল। বিজেপি কিন্তু সেই মেরুকরণ থেকে ফায়দা তুলতে পারেনি। এবার করোনা অতিমারির মধ্যেই বিহারের ভোট। যোগীকে ফের প্রচারে নামাতে উদ্যত বিজেপি। এবার কি ফায়দা মিলবে? এখন যোগী আদিত্যনাথের বিজেপিকে প্রয়োজন, না কি বিজেপির যোগীকে প্রয়োজন?

যোগীর গুরু মোহন্ত অবৈদ্ধনাথ হিন্দু মহাসভার পরে বিজেপিতে যোগ দিলেও এমন নয় যে তিনি বিজেপি নেতৃত্বের কথায় ওঠবস করতেন। আদিত্যনাথও সেই ধারা অব্যাহত রেখেছেন। গোরক্ষপুরে নিজের হিন্দু যুবা বাহিনীর বলে বলীয়ান আদিত্যনাথের সঙ্গেও বিজেপির সম্পর্ক অম্লমধুরই থেকেছে। তাঁর মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগে পর্যন্ত বিজেপি নেতৃত্ব তাঁর কথা মতো প্রার্থী বাছাই না করলে তিনি বিদ্রোহ করেছেন। নিজের অনুগামীদের বিজেপির প্রার্থীর বিরুদ্ধে খাড়া করেছেন। বিজেপির মন্ত্রীদেরও হারিয়ে দিয়েছেন। হিন্দুত্বের মতাদর্শকে লঘু করার জন্য বিজেপির সমালোচনা করতেও ছাড়েননি।

২০১৭-তে বিজেপি উত্তরপ্রদেশে ৪০৩টি আসনের মধ্যে ৩১২টি আসন পায়। মোদীর ঢেউয়ের সঙ্গে যোগ হয়েছিল অমিত শাহের জাতপাতের অঙ্ক। ব্রাহ্মণ-বানিয়ার চিরাচরিত ভোটব্যাঙ্কের সঙ্গে যাদব ছাড়া ওবিসি ও দলিত ভোটও বিজেপির ঝুলিতে এসে পড়েছিল। কিন্তু আদিত্যনাথের রাজত্বে তাঁর নিজের সম্প্রদায় ঠাকুরদের দাপটে ব্রাহ্মণদের মধ্যেই অসন্তোষ। হাথরসের পরে দলিত ভোটব্যাঙ্কও হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা।

উত্তরপ্রদেশের ২০২২-এর বিধানসভা ভোটের আগেই রামমন্দিরের দরজা খুলে যাবে। হয়তো এসপি, বিএসপি, কংগ্রেসের ছন্নছাড়া অবস্থা তখনও বহাল থাকবে। সেই সুযোগে হয়তো দ্বিতীয় বার উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর গদিতে ফিরে দিল্লির মসনদের দাবিদার হয়ে উঠবেন যোগী।

কিন্তু তার আগে নরেন্দ্র মোদীকে হয়তো যোগীকে ‘রাজধর্ম পালন’-এর কথা মনে করিয়ে দিতে হবে। ২০০২-এর গুজরাত দাঙ্গার পর মোদীকে যে কথা মনে করিয়ে দেন অটলবিহারী বাজপেয়ী।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন