বাঘকে ‘মানুষখেকো’ বলা নিষিদ্ধ হইল। বাঘ সংরক্ষণের ভারপ্রাপ্ত সংস্থা ‘ন্যাশনাল টাইগার কনজ়ারভেশন অথরিটি’ (এনটিসিএ) সিদ্ধান্ত লইয়াছে যে, ঔপনিবেশিক আমলের এই ভয়ানক রীতি আর বহন করিবে না ভারত। বাঘকে ‘ম্যান-ইটার’ বা মানুষখেকো বলিয়া দাগাইয়া দিলে যে ভীতির উদ্রেক হয়, বাঘের প্রতি মানুষের যেমন জিঘাংসা জাগ্রত হয়, তাহা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের নীতির সহিত সাযুজ্যপূর্ণ নহে। এই সিদ্ধান্তের মূলে রহিয়াছে ‘অবনী’ নামে এক বাঘিনির হত্যা, যাহার পর প্রতিবাদের ঝড় উঠিয়াছিল। ওই বাঘিনি তেরো জনকে হত্যা করিয়াছে, এমন দাবি করিয়া তাহাকে ‘মানুষখেকো’ ঘোষণা করিয়া মৃত্যু পরোয়ানা জারি করিয়াছিল মহারাষ্ট্রের বন দফতর। অতঃপর শিকারিদের একটি মস্ত দল দিনের পর দিন দুই সন্তান-সহ ওই বাঘিনিকে তাড়াইয়া ফেরে। পোস্ট মর্টেম পরীক্ষায় দেখা যায়, ওই বাঘিনি অন্তত চার-পাঁচ দিন অভুক্ত ছিল। ২ নভেম্বর, ২০১৮ অবনীর মৃত্যু ঘটে। তাহার এক বৎসর পর এনটিসিএ ‘মানুষখেকো’ শব্দটিকেই তামাদি করিবার সিদ্ধান্ত লইল। প্রশ্ন উঠিবে, শব্দ তো বদল হইল, বাঘের বদল হইবে কি? বাঘ কি মানুষ খাওয়া থামাইবে? মানুষখেকো বাঘের সহিত ভারতবাসীর পরিচয় দীর্ঘ দিনের, বাংলায় তাহাকে লইয়া রূপকথা, লোকগীতি কতই না রচনা হইয়াছে। চারশতেরও অধিক মানুষ খাইয়াছে, এমন বাঘেরও সন্ধান মিলিয়াছে। জিম করবেটের কাহিনিতে মানুষখেকো বাঘেরা অমরত্ব পাইয়াছে। আজ কি বাঘের হাত থেকে মানুষকে বাঁচাইবার প্রয়োজন ফুরাইয়াছে? এনটিসিএ-র বক্তব্য, এখন হইতে বাঘ মনুষ্যলোভী হইয়াছে সন্দেহ করিলে তাহাকে ‘মানুষের জন্য বিপজ্জনক’ বলিয়া ঘোষণা করিতে হইবে। 

ইহা কি কেবল মঞ্জুভাষণ? ‘দরিদ্র’ না বলিয়া ‘আর্থিক ঝুঁকিসম্পন্ন’, কিংবা ‘প্রতিবন্ধী’ না বলিয়া ‘বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন’ বলিলে এক ধরনের সহমর্মিতার আশ্বাস মিলিতে পারে। কিন্তু তাহার পশ্চাতে যদি দরিদ্র বা প্রতিবন্ধীর অবস্থায় পরিবর্তন আনিবার অঙ্গীকার কাজ না করে, তবে তাহা অর্থহীন হইয়া যায়। এমনকি প্রহসনের মতো শুনাইতে থাকে। এ ক্ষেত্রেও সেই কথাই প্রযোজ্য। বাঘের সংখ্যা বাড়িতেছে, বর্তমানে ভারতে প্রায় তিন হাজার বাঘ রহিয়াছে, বলিতেছে সরকারি পরিসংখ্যান। কিন্তু ইহাও সত্য যে এ বৎসরের প্রথম পাঁচ মাসে একান্নটি বাঘের মৃত্যু হইয়াছে, তাহাদের অধিকাংশই প্রাণ হারাইয়াছে চোরাশিকারির হাতে। ট্রেনের ধাক্কায় মৃত্যু এবং অনাহারে মৃত্যুও স্থান পাইয়াছে সেই তালিকায়। মৃত্যুর এই তালিকাও সম্পূর্ণ কি না, তাহা লইয়া সংশয় রহিয়াছে। বাঘ যে বিপন্ন, তাহাতে সন্দেহ নাই। ইহাও প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, বাঘ নিজের মতোই থাকিতে ভালবাসে, সাধারণত লোকালয়ে আসিয়া মানুষ শিকার করে না। বাঘের নিজস্ব এলাকায় মানুষ প্রবেশ করিলে তবেই বাঘ তাহাকে মারে। সুন্দরবনে লোকালয়ের সহিত ঘনিষ্ঠ ভাবে বাঘের বাস, কিন্তু গত চৌদ্দ-পনেরো বৎসরে মাত্র একটি ঘটনায় বাঘ গ্রামে আসিয়া মানুষ মারিয়াছে। বরং গত বৎসর লালগড়ে একটি বাঘকে যেমন বীভৎস উপায়ে হত্যা করা হইয়াছিল, তাহা রাজ্যবাসী এখনও বিস্মৃত হন নাই। অতএব বাঘকে ‘মানুষখেকো’ বলিয়া তাহার মৃত্যুর শমনে স্বাক্ষর করিবার পূর্বে ভাবিতে হইবে বইকি।