স্বদেশী আন্দোলনের জোয়ারে তখন ভেসে গিয়েছে সমগ্র বাংলা। শুধু বড় শহর বা মহানগর নয়, প্রত্যন্ত বাংলার গ্রামেও স্বদেশী দ্রব্য গ্রহণ, বিলিতি দ্রব্য বর্জনের আন্দলন চলছে। এমন এক সময়ে কীর্ণাহারের প্রত্যন্ত এলাকা নিমড়া থেকে কলকাতায় গিয়ে ঠিকানা খুঁজলেন এক সদ্য যুবক। ম্যাট্রিক পাশ করেছেন ১৯৩০ সালে। পরিবারের স্বপ্ন, ছেলে ডাক্তার হয়ে অসহায়, গরিব মানুষদের চিকিৎসা করবে। ব্যক্তিগত প্রস্তুতিও সেই পর্যায়ে ছিল। কিন্তু কলকাতায় গিয়ে জড়িয়ে পড়লেন স্বদেশি আন্দোলনে। নজরুল ইসলামের কবিতা পড়ে যে আপাদ মস্তক মুগ্ধতা, সেই মুগ্ধতা থেকে একবার গেলেন ‘গণবাণী’ অফিসে। আলাপ হল বিদ্রোহী কবির সঙ্গে। ঠিক তখনই আগামী দিনের জন্য পথ প্রস্তুত করে নিলেন যেন, সাহিত্য রচনা করবেন। সঙ্গে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম। 

সদ্য যৌবনের ভাবনা সূত্র থেকে যে কলম হাতে তুলে নিয়েছিলেন সাহিত্য সাধক এম আব্দুর রহমান, ১৯৯৩-এ মৃত্যুর দিন পর্যন্ত সেই কলমের সৃজনশীলতা সক্রিয় ছিল। এক এক করে বারোটি গবেষণা গ্রন্থ, কবিতা  ও পদ্য সঙ্কলন চারটি, নজরুল বিষয়ক গ্রন্থ তিনটি, একটি নাটক এবং চারটি জীবনী গ্রন্থ। শ্রেষ্ঠ চব্বিশটি সাধনার ফসল রেখে গিয়েছেন পরবর্তী প্রজন্মের জন্য। প্রস্তুত ছিল আরও চব্বিশটির মতো গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি, যা কালের গর্ভে বিলীন হওয়ার পথে। 

বিভিন্ন সাহিত্য সভায় কিংবা ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় আব্দুর রহমান স্মৃতিচারণা করতেন নজরুল ইসলামকে নিয়ে। গণবাণী অফিসে আলাপ হওয়ার সময়েই বিদ্রোহী কবি তাঁকে বলেছিলেন, গ্রামে একটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করতে। কারণ বইপত্রের মাধ্যমেই একটি জাতির আত্মিক উন্নতির সম্ভব। যুবক রহমান কবিকে বলেন, তাহলে আপনিই প্রথমে লাইবেরির জন্য কিছু বই দিন। নজরুল ইসলাম কিছু বই উপহার দিলেন। সম সময়ে আলাপ হয় শিক্ষাবিদ লেখক হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে। যাঁর পরামর্শে হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উইলফ্রেড ক্যান্টওয়েল স্মিথকে চিঠি লেখেন এম আব্দুর রহমান। অধ্যাপক স্মিথ তাঁকে ‘মডার্ন ইসলাম ইন ইন্ডিয়া’-সহ বেশ কিছু বই পাঠান। সাহিত্যচর্চা চলতে থাকল। জন্মভূমি নিমড়ায় তাঁত প্রতিষ্ঠা করলেন, সেখানে তাঁতের শাড়ি, গামছা প্রস্তুত করা হত। সঙ্গী বাল্যবন্ধু মহম্মদ কেরাবিন। অচেনা অজানা লেখকদের সম্বন্ধে বিস্তৃত তথ্য অনুসন্ধান করে প্রবন্ধ সমূহ প্রকাশিত হতে শুরু করল, সে সময়ে গুলিস্তা, সওগাত সহ বিভিন্ন পত্রিকায়।

বীরভূম ও বর্ধমান জুড়ে ফকির বিদ্রোহের যে বিস্তীর্ণ পটভূমি, তাকে খুঁজে পাওয়া গেল একটি পুথিতে। অসম্পূর্ণ পুথি কিছুটা নষ্ট হয়ে গিয়েছে। রহমান সাহেব সেই পুথি সংগ্রহ করলেন বীরভূম-বর্ধমান সংলগ্ন গ্রাম হাটকালুয়ায়। পুথি রচয়িতা স্বভাব কবি জমিরুদ্দিন দফাদার, মুখে মুখে ছড়া বলতেন। প্রজন্ম পরম্পরায় ছড়াগুলি এখনও মোরগ্রাম– হাটকালুয়ার মানুষের কাছে প্রচলিত। ডাক্তারি পড়া হয়নি কিন্তু আইনের পাঠ নিয়েছিলেন। প্রথমে সিউড়ি ও পরে কাটোয়া কোর্টে আইনজীবী হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন। পাশাপাশি চলছে অবিরাম সাহিত্য সাধনা। একে একে প্রকাশিত হয়েছে– সীমান্ত গান্ধী আব্দুল গফফর খান, শহীদ বীর তিতুমীর, দেশপ্রেমিক কবি ও সাহিত্যিক প্রভৃতি প্রয়োজনীয় প্রবন্ধ সংকলন। সরোজিনী নায়ডুর সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখে ফেলেছেন ততদিনে। শারীরিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ায় সিউড়ি বসবাসের ইতি টেনে পুনরায় কলকাতা চলে যান রহমান সাহেব। 

দিল্লি দখলের লড়াইলোকসভা নির্বাচন ২০১৯ 

নজরুল ইসলামের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তো ছিলই, দ্বিতীয় পর্বে কলকাতা গিয়ে পরিচিত হলেন এস ওয়াজেদ আলির সঙ্গে। এস ওয়াজেদ আলির ‘গুলিস্তা’ তখন অবিভক্ত বাংলার উল্লেখযোগ্য সাহিত্য পত্রিকা। সম্পাদক হিসাবে মুদ্রিত থাকত এস সামশের আলির নাম। যিনি ওয়াজেদ আলির ভাই, তবে পত্রিকার অলিখিত সম্পাদক ছিলেন ‘বঙ্কিম দুহিতা’ উপন্যাসের লেখক ইদ্রিস আলি। ‘গুলিস্তা’ সম্পাদক এম আব্দুর রাহমানকে পত্রিকার সহকারী সম্পাদক হিসাবে কাজ চালিয়ে যেতে বলেন। 

সাহিত্য রচনার সঙ্গে স্বীকৃতিও এসেছে নানা সময়ে। ১৩৮১ বঙ্গাব্দে শ্রী শ্রী সাধু তারাচরণ সত্যসঙ্ঘ তাঁকে ‘সাহিত্য ভারতী’ উপাধি প্রদান করেন। পেয়েছেন বুলবুল ও নজরুল পুরস্কার  জয়দেব কেঁদুলি বাউল মেলায় তাঁকে কুমুদরঞ্জন পুরস্কার দেওয়া হয়। বীরভূম সাহিত্য পরিষদ তাঁকে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করে ১৯৮৩ সালের ২রা অক্টোবর। কীর্ণাহার তারাপদ মেমোরিয়াল গালর্স হাইস্কুলে একটি মনোজ্ঞ অনুষ্ঠানে সংবর্ধনা প্রদান উপলক্ষে একটি সংবর্ধনা সংকলন প্রকাশিত হয়েছিল, সেখানে লিখেছেন অন্নদাশঙ্কর রায়, সমরেশ বসু , সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, গৌর কিশোর ঘোষ সহ বহু বিশিষ্ট সাহিত্য ব্যাক্তিত্ব। সাহিত্যিক সমরেশ বসু ওই সংবর্ধনা সংকলনে লিখেছেন – “আমি টুকরো ভাবে তাঁর ধর্মীয় কবিতাগুলি পড়েছি, যার মধ্যে আমি পেয়েছি, মানুষের জন্য শাশ্বত মঙ্গলবোধের সাধনা, এমনকি তার অধিকারের জয়গান। ... এম আব্দুর রহমানের কিছু বিছিন্ন কবিতার পঙক্তিতে আমি সন্ধান পেয়েছি সেই শাশ্বতের, আর তাঁকে জেনেছি, তাঁকে যে যত ভাবেই জেনে থাকুক, তিনি আসলে মানব প্রেমিক, মরমী একজন সাধক, এটাই সব থেকে বড় আধুনিকতা  যে বৃহত্তর সমাজের কথা ভেবে আমরা গৌরব করি, সে সমাজের কথা বলতে পারিনে, কিন্তু এম আব্দুর রাহামন নিজে যে একটি সমাজ গঠন করেছেন, যা মানুষের নিত্য কালের , সেখানে তিনি জীবিত থাকবেন বহুকাল’’। 

আব্দুর রহমান স্বদেশি আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে থেকেছেন আর ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে সকল সমাজের অবদান  নিয়ে গবেষণা করেছেন, তুলে ধরেছেন অনেক স্বাধীনতা সংগ্রামীর কথা, যাঁদের কথা সমাজ ভুলে গিয়েছিল। এর মাঝে মোহনদাস কর্মচন্দ গাঁধীকে নিয়ে  দীর্ঘ কবিতার সংকলন প্রকাশিত হল। পাঠকের হাতে এল ফরিয়াদ, বল্লবীরের মতো কবিতাগ্রন্থ ও সংকলন। সওগাতের মত মননশীল সাহিত্যপত্রে ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়েছিল ‘মুসলিম সাময়িক পত্রের ইতিহাস’, ১৩৪৭ ও ১৩৪৮ বঙ্গাব্দে সওগাতের আরও কয়েকটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। ফকির ও সন্ন্যাসী বিদ্রোহ যেমন আলোচিত ও পঠিত, তেমন ভাবে রাজনগর রাজ পরিবারের ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রামের  কথা  আলোচনার পরিসরে আসেনি। এম আব্দুর রহমান তাই লিখলেন ‘আজাদি যুদ্ধের নেপথ্য নায়িকা রানী লালবিবি’। রানী লালবিবি রাজনগরের সে সময়ের রাজা আসাদুজ্জামানের স্ত্রী। সপ্তদশ শতকের ছয় ও সাতের দশকে আসাদুজ্জামান তৎকালীন নবাব মীরজাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন। মৃত্যুর দিন পর্যন্ত (১৭৭৭ খ্রিস্টাব্দ) ইংরেজদের বিরুদ্ধে দেশের জন্য লড়েছিলেন ওই রাজা। মুর্শিদাবাদ ও বীরভূম সীমানায় এবং কড়িধ্যা ও হেতমপুরে বেশ কয়েক বার মুখোমুখি যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন। এর মধ্যে চুনাখালি দুর্গ জয় করে আসাদুজ্জামান ইংরেজ বাহিনীর ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিলেন। 

প্রাবন্ধিক এম আব্দুর রহমানের বর্ণনায় “মুর্শিদাবাদের এই বিষাদের দিনে বীরভূমের রাজনগরে চলছে আনন্দ উৎসব, তাঁদের প্রিয় রাজা আসাদুজ্জামান খাঁ ‘চুনাখলি’ জয় করে মুর্শিদাবাদ অভিযানে চলেছেন...। বীরভূম রাজ্যের রানী লালবিবির আনন্দ সকলের চেয়ে বেশী, খুশিতে বাগ বাগ তিনি, দু হাতে দান করছেন দীন, দুখী,অনাথ, আতুর আর ফকির সন্ন্যাসীদের। প্রার্থনা করছেন স্বামীর পূর্ণ বিজয় আর দেশের আজাদির জন্য।’’ এ সব তথ্যের প্রামাণ্যতা পাওয়া যায় মহারাজা মহিমানিরঞ্জন চক্রবর্তী লিখিত ‘বীরভূমের রাজবংশ’, সুপ্রকাশ রায়ের ‘ভারতে কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম’ প্রভৃতি গ্রন্থে।

প্রতিষ্ঠানিক পর্যায়ে নয়, রহমান সাহেব গবেষণা করেছেন নিজের তাগিদে, দেশ ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে। নিমড়ায় নিজের ভিটেমাটির প্রতি টান, মাটির ঘরের দোতলার বারান্দায় বসে ছুটির দিনে অবিরাম লেখা, পুথি সংগ্রহ, পুরনো বইপত্র— এই ধারাবাহিকতায় আমৃত্যু ছেদ পড়েনি। বীরভূম সাহিত্য পরিষদ প্রকাশিত সংকলনে সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ তাঁর সম্পর্কে যে মূল্যায়ন করেছেন, সেটি ভীষণ প্রয়োজনীয়— “সরল সত্যের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশের জন্য শ্রদ্ধেয় এম আব্দুর রহমানের মতো সংস্কৃতিবান মানুষের প্রয়োজন আছে। ...এঁদের সমকালে উপেক্ষিত হলেও কিছু যায় আসে না। কারণ এঁরা যে কর্মে লিপ্ত আছেন, তা তুচ্ছ যশের জন্য নয় – আপন মানসিক ধর্মের কারণে , নদীকে কেউ যদি বলে নদী , তুমি কেন বয়ে যাচ্ছ ? নদী বলবে, বয়ে যাওয়ায় আমার জীবন। তাই সাধকরা সেই নদীর মতো।...’’ 

এম আব্দুর রহমাম সেই বহতা নদীর মতোই এক জন মানুষ। 

 

(লেখক সাহিত্যকর্মী, মতামত নিজস্ব)