• আবাহন দত্ত
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

অভিযোগ: কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট কারচুপি করে ভোটে জিতেছেন

অভিযোগ নিয়েও বহু প্রশ্ন, তবু পুনর্নির্বাচন

Line at Election
ভোট-উৎসব: আঙুলের ছাপ দিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করতে নেমে পড়েছে উৎসাহে ভরপুর ঝুপড়ি-বাসীরাও, নাইরোবি, ৭ অগস্ট। ছবি: গেটি ইমেজেস।

Advertisement

জোমো কেনিয়াট্টা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পা রাখা ইস্তক সে-দেশের আকাশে-বাতাসে ‘রি-রান’ শব্দটা ধ্বনিত হতে শুনছি। ছোট দোকানি থেকে বাইক-ট্যাক্সির চালক, চাকরিজীবী থেকে বেকার— তর্ক একটাই। উহুরু না ওডিঙ্গা?

গত ৮ অগস্ট আয়োজিত কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ৫৪ শতাংশ ভোট পেয়ে জিতে আসেন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট উহুরু কেনিয়াট্টা। কিন্তু ভোটের ফল মানতে নারাজ বিরোধী প্রার্থী রায়লা ওডিঙ্গা সোজা চ্যালেঞ্জ ঠোকেন সুপ্রিম কোর্টে। অভিযোগ ছিল, হ্যাক করে ফলাফল বদলানো হয়েছে। পাঁচ দিনের বিচারপ্রক্রিয়ার শেষে ১ সেপ্টেম্বর ভোটের ফল বাতিল করে আদালত রায় দেয়, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে ফের ভোটের আয়োজন করতে হবে। এমতাবস্থায়, ২৭ সেপ্টেম্বর আমরা পৌঁছই কেনিয়া।

এয়ারপোর্ট থেকে খানিক দূর এগোতে কথায়-কথায় গাড়ির চালকই তুললেন ‘রি-রান’-এর প্রসঙ্গ। তিনি স্পষ্টই প্রেসিডেন্টের পক্ষে। শুধু তিনি নন, পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত সকলেই। হোটেলের কর্মচারী, টুরিস্ট গাইড, ফরেস্ট গার্ড— ‘বিরোধীদের তৈরি মিথ্যা অভিযোগ’-এ বিরক্ত সকলেই। এমনিতে টুরিস্ট-প্রিয় দেশ কেনিয়া। পর্যটকরাও ভা‌লবাসেন কেনিয়াকে। কিন্তু এ বার খবর শুনেই বহু লোক সফর বাতিল করে চলে যাচ্ছেন জানজিবার। এক ভ্রমণ সংস্থা জানায়, এক দিনে প্রায় ৭০টা ব্লক বুকিং বাতিল হল, এমন ঘটনাও ঘটেছে। নারোক কাউন্টির প্রত্যন্ত এলাকায় মাসাই মারা-র জঙ্গলে এক রিসর্টকর্মীর আক্ষেপ, ‘‘২৬ অক্টোবর আমরা সকলেই আবার কোনও এক জনকে ভোট দেব। কিন্তু সে জন্য আমাদের এত বড় ক্ষতি হয়ে যাবে?’’ অনেকেরই আবার রাগ গিয়ে পড়েছে এক মার্কিন সংবাদসংস্থার উপর। সংস্থাটি কেনিয়া থেকে হাতে-গরম ভোটের খবর জানাচ্ছে বাইরের পৃথিবীকে। তাঁদের বক্তব্য, কেনিয়া সম্পর্কে মিথ্যে ভয় ছড়ানো হচ্ছে। দেশে কান পাতলেই তাই সেই সংস্থা সম্পর্কে উহুরুপন্থীদের হরেক মন্তব্য শোনা যাচ্ছে। কেউ বলছেন ‘বিরোধীদের এজেন্ট’, কারও আবার বক্তব্য ‘মার্কিনিরা বড্ড ভিতু’!

তবে এত কিছুর পরেও ভোট-উৎসাহে ভাটা নেই। কেনিয়ার মানুষ এমনিতেই আমুদে, নাচ-গান ভালবাসেন। এক দিন দুপুরে নাইরোবির অভিজাত ‘আপটাউন’ এলাকায় হঠাৎ মিঠে সুর কানে এল। ব্যস্ত যানজটের মধ্যে মাথায় কতগুলো মাইক বেঁধে এগিয়ে চলেছে জিপ। ওখান থেকে প্রেসিডেন্টের সমর্থনে গান বাজানো হচ্ছে। বড় রাস্তা ছেড়ে একটু পরেই গাড়িটা ঢুকবে পাড়ায়-পাড়ায়। আর যেখানেই পৌঁছবে সেখানকার মানুষ তালে তালে নাচ জুড়ে দেবেন। এক দিন বিকেলে সে নাচও দেখা গেল। একটা বাইক ঘিরে মাইক হাতে গান আর নাচ। গায়ে আফ্রিকার চিরাচরিত দীর্ঘ পোশাক। পিঠে লেখা ‘উহুরুতো ২০১৭’। প্রচারকারীদের বক্তব্য, ‘‘আমাদের প্রিয় প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে কুৎসায় কান দেবেন না।’’ বিরোধীদের প্রচার-ছবিতে আবার উৎসাহের চেয়ে উত্তেজনাই বেশি। সে দিন আমাদের পাড়ি দিতে হবে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার রাস্তা। পেরতে হবে নাইরোবিসহ ছ’টা কাউন্টি। আর সে দিনই রাজধানী নাইরোবিতে ‘মেগা র‌্যালি’-র ডাক দিয়েছে বিরোধীরা। পথে পড়বে তাদের অন্যতম ঘাঁটি আফ্রিকার বৃহত্তম বস্তি কিবেরা। দিনটা সোমবার। জানা গেল, ভোটের আবহে নাকি কাজের প্রথম আর শেষ দিন (শুক্রবার)-টাই বেছে নিচ্ছেন ওডিঙ্গা। সর্বত্র তৈরি হয়েছে ভয়ের পরিবেশ। যানজটের আশঙ্কায় সবাই তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়ছেন, ভাঙচুরের ভয়ে তটস্থ দোকানি, গাড়ি চালকেরা। এই ছবিটাই প্রতি দিন দেখা যাচ্ছে কেনিয়ার সব খবরের কাগজে। ট্যাবলয়েডগুলো খুললেই, প্রথম পাতা থেকে শেষ পাতা, নানাবিধ ভোটের খবর। ‘আজ মাচাকোসে প্রচারে উহুরু’, ‘নির্বাচনের আবহে ছাত্র-সংঘর্ষে বন্ধ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস’— ভোট ছাড়া কোথাও কোনও হেডলাইন নেই।

এ প্রসঙ্গে কেনিয়ার জনবিস্তার বিষয়ে কিছু বলা প্রয়োজন। কেনিয়ায় মোট বিয়াল্লিশটি জনজাতির মানুষ বাস করেন। তাদের পোশাক, বাড়িঘর, খাদ্যাভ্যাস, লেখাপড়া, ভাষা, ধর্মাচার, পেশা আলাদা। স্বভাবতই তাদের ভোট-উৎসাহও আলাদা রকমের। তাই যে জনজাতি যে ভাবে বিষয়টার সঙ্গে সম্পর্কিত, তাঁরা সে ভাবে ভোটে উহুরু বা ওডিঙ্গার সমর্থনে দাঁড়াচ্ছেন। কেনিয়ায় সবচেয়ে বড় জনজাতি কিকুয়ু। সমাজে সবচেয়ে ক্ষমতার জায়গাতেও তাঁরা। প্রেসিডেন্টও সেই জনজাতির। উহুরুপন্থী এক কিকুয়ু ব্যক্তি বলছেন, ‘‘ভোটে কোনও কারচুপি হয়নি। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক তো অন্য জনজাতির। তাই প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করেছে!’’ এই সমস্ত মতামত, চিন্তাভাবনাকে এক জায়গায় করে এক কেনিয়া বানানোর চেষ্টাও চলছে ভোটের আবহে। টি-শার্ট বিক্রি হচ্ছে ‘উই আর ওয়ান’। উগ্র জাতীয়তাবাদীরা এক ধাপ এগিয়ে বলছে‌ন, ‘তুয়াচে উকাবিলা’ অর্থাৎ ‘জাতি পরিচয় ত্যাগ করো’। তবে সে সবে কেউই খুব একটা পাত্তা দিচ্ছেন না। ওঁরা শুধু ‘রি-রান’-এ মজে। উল্লেখ্য, অক্টোবরের গোড়ায় আচমকাই উহুরুর বিরুদ্ধে সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তুলে নির্বাচন বয়কট করেন ওডিঙ্গা। ৩০ অক্টোবরের ফলাফলে ৯৮.২৬ শতাংশ ভোট পেয়ে জেতেন উহুরু। যদিও ভোট পড়ে মাত্র ৩৮.৮৪ শতাংশ।

১৯৭৫ সালের ১২ জুন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গাঁধীর নির্বাচনকে বাতিল করে দিয়েছিল ইলাহাবাদ হাইকোর্ট। বহুজাতি, বহুভাষী, বহুসংস্কৃতির ভারত ভাগ হয়ে গিয়েছিল ইন্দিরা আর বিরোধী জয়প্রকাশের শিবিরে। পঞ্জাব থেকে তামিলনাড়ু, গুজরাত থেকে বিহার— শাসক বা বিরোধী স্বর উঠছিল একযোগে।

কেনিয়াতেও এখন পুনর্নির্বাচন ঘিরে তেমনই উত্তালে বহুধাবিভক্ত বিয়াল্লিশটি জনজাতি। ঠিক নিজেদের মতো করেই।

সবাই যা পড়ছেন

Advertisement

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন