‘বিজন ঘরে... আসবে যদি’ (পত্রিকা, ২৪-১১) শীর্ষক নিবন্ধে লেখক লিখেছেন, ‘‘বাদল সরকারের কয়েক দশক আগেই বিজনরা বুঝে গিয়েছিলেন নাটক কেবল মঞ্চে নয়, রাস্তাঘাটে ঘুরে ঘুরে করার বিষয়।... পরবর্তী কালে বাদলরা যার নাম দেবেন থার্ড থিয়েটার।’’ বিজন যদিও গ্রামেগঞ্জে থিয়েটার নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন, কিন্তু কখনওই প্রসেনিয়াম ভাবনার বাইরে অঙ্গনে বা মুক্তমঞ্চে করার কথা ভাবেননি, আর থার্ড থিয়েটারের লক্ষ্যই হল প্রসেনিয়াম ভেঙে বেরিয়ে আকাশের নীচে মানুষের মধ্যে আসা। 

বিজন ১৯৫০-এ ‘গণনাট্য’ ছেড়ে ‘ক্যালকাটা থিয়েটার’ গঠন করেন, এবং পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে ‘ক্যালকাটা থিয়েটার’ ছেড়ে ‘কবচকুণ্ডল’ নির্মাণ করেন। এ সমস্তই প্রসেনিয়াম ভাবনায় থিয়েটার দল তৈরি এবং এই থিয়েটার দলের সমস্ত প্রযোজনাই মঞ্চ ভাবনা থেকেই। ১৯৭৭-এ শেষ প্রযোজনা ‘চলো সাগরে’ পর্যন্ত বিজন মঞ্চনাটকই করে যান। ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, ‘হাসি, ‘রাজদ্রোহী’ ইত্যাদিতে পেশাদারি মঞ্চাভিনয়ও করেন। এই সময়ের মধ্যে ‘গণনাট্য’ এবং অন্যান্য গ্রুপ থিয়েটার পথনাটক করলেও, বিজনবাবু কখনও সে-পথে হাঁটেননি। 

বাদলবাবু ১৯৭০ পর্যন্ত সফল মঞ্চনাটক করে, এমনকী ‘সাগিনা মাহাতো’র মতো মঞ্চসফল প্রযোজনাকে বাতিল করে, ১৯৭১ সালে পুনরায় ‘সাগিনা মাহাতো’র অঙ্গন প্রযোজনা করলেন। ১৯৭২-এ ‘স্পার্টাকুস’ প্রযোজনা থেকে আর মঞ্চে ফিরে যাননি। ১৯৭৩ থেকে শুরু করলেন কার্জন পার্কে খোলা আকাশের নীচে প্রতি শনিবার আরও অনেক দলের সঙ্গে মুক্তমঞ্চে নাট্য প্রযোজনা। বিজনবাবু এই সময় প্রসেনিয়ামের ভাবনা থেকেই নাটক করে গিয়েছেন। বিজনবাবু মানুষের জন্য থিয়েটারের কথা বলেছেন, কিন্তু কী করে থিয়েটার মানুষের হবে, তার কোনও প্রক্রিয়া গ্রহণ করতে পারেননি, যা পেরেছিলেন বাদলবাবু।

বাদলবাবুর কাছে থার্ড থিয়েটার একটা দর্শন। সে অর্থে কোনও ফর্ম বা আঙ্গিক নয়। বাদলবাবু তাত্ত্বিক দিক থেকে প্রভাবিত হয়েছিলেন পোল্যান্ডের গ্রোটস্কির ‘পুয়োর থিয়েটার’-এর দ্বারা। দেশজ লোকনাট্যের আঙ্গিকও বাদলকে ভাবতে সাহায্য করেছিল। দেশীয় লোকনাট্য এবং পাশ্চাত্য থিয়েটারের সিন্থেসিস হিসাবে তিনি থার্ড থিয়েটারের প্রবর্তন করেন। সুতরাং বাদলবাবু নাট্য পরিবেশনের দিক থেকে মোটেই বিজনবাবুদের দ্বারা প্রভাবিত হননি। 

নিঃসন্দেহে বিজনবাবুর নাটকে নিপীড়িত শোষিত মানুষের কথাই উঠে আসত, যা বাদলবাবুর নাটকেরও বিষয়বস্তু হয়েছে। বিজনবাবু থিয়েটারকে সংগ্রামের হাতিয়ার হিসাবেই নিয়েছিলেন, নিছক শিল্পচর্চার জন্য নয়। বাদলবাবুও এই মতে বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু কী ভাবে থিয়েটার সব মানুষের থিয়েটার হয়ে উঠবে, তার আঙ্গিক নিয়ে ভেবে যেতে পারেননি বিজন। বাদলবাবু থিয়েটারকে 

পুঁজির নিয়ন্ত্রণ থেকে সর্বতো ভাবে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। আর বিজনবাবু মঞ্চ ভাবনা থেকে মুক্ত হতে না পেরে পুঁজির নিয়ন্ত্রণের শিকারই হয়েছিলেন। 

তবুও ভাবনা, চিন্তায়, দর্শনে আজও বিজনবাবু অগ্রণী, ব্যতিক্রমী। আজকের ভাবনাবিহীন বিনোদনের ‘অলীক কুনাট্য রঙ্গে’ বিজন বিশেষ ভাবে স্মরণীয়।

দীপক বিশ্বাস

ইন্দ্রপ্রস্থ, বহরমপুর

 

নীতি নেই

ভোটের রাজনীতি বড়ই বিচিত্র। সেখানে কোনও নৈতিকতা, আদর্শ, প্রগতিশীল চিন্তার স্থান থাকতে নেই। তিন তালাকের মতো কুপ্রথার বিরুদ্ধে যারা সুপ্রিম কোর্টের রায়ে নারীর স্বাধিকার ও সম্মান প্রতিষ্ঠা হয় মনে করে, তারাই আবার সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক শবরীমালার আয়াপ্পা মন্দিরে সব বয়সের মহিলার প্রবেশাধিকারকে নিশ্চিত করার রায়ের বিরোধিতার আন্দোলনে শামিল হয়। দীর্ঘ কাল ধরে চলে আসা কুপ্রথাকে আয়াপ্পা ভক্তদের ভাবাবেগ ও স্পর্শকাতর বিষয় বলে বিজেপি, কংগ্রেসের মতো সর্বভারতীয় দলগুলি যে ভাবে সুপ্রিম কোর্টের রায়কে কার্যকর করতে কেরল সরকারকে বাধা দিচ্ছে এবং এই রায়কে পুনর্বিবেচনার দাবি জানাচ্ছে, তা চরম সুবিধাবাদ ও সকল মহিলার প্রতি অসম্মান স্বরূপ। আশির দশকে শাহবানু মামলায় সুপ্রিম কোর্ট প্রদত্ত রায়কে যে ভাবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গাঁধী শুধু মুসলিম ভোট হারাবার ভয়ে কার্যকর করা থেকে বিরত হয়েছিলেন, আজও একই ভাবে রাজ্য কংগ্রেস তাদের সর্বভারতীয় সভাপতি রাহুল গাঁধীর নির্দেশ অমান্য করে, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, কেরল সরকারের বিরোধিতায় আন্দোলনে শামিল হয়েছে৷

দেবকী রঞ্জন গঙ্গোপাধ্যায়

উত্তরপাড়া, হুগলি

 

গন্ধবিচার

‘মোদীকে উচ্ছেদের ডাকে নেই এসইউসি’ শীর্ষক সংবাদ (৮-১১) পড়ে মনে হল, কেবল ভোটে কেন, জোটের ‘গন্ধবিচার’ তো সর্বত্রই করা বাঞ্ছনীয়। আর ভোটের চেয়ে, বিশেষ করে আমাদের দেশে বর্তমান ভোট রাজনীতির যা অবস্থা তার চেয়ে, আন্দোলন তো অবশ্যই বড়। মোদী সরকারকে উচ্ছেদ করলেই যদি আমরা সুখে-শান্তিতে, মানুষ হিসাবে বাঁচার ন্যূনতম অধিকার নিয়ে বাস করতে পারতাম, তা হলে তো কোনও কথাই ছিল না। 

বস্তুত, ‘গন্ধবিচার’ তথা দল বিচার তো খুব সহজ ব্যাপার নয়। এর জন্য চাই জ্ঞানের চোখ, সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি। এর অভাব সর্বত্রই প্রকট। তাই তো আমরা বারবার ঠকছি। বীজ চিনতে না পেরে কুমড়ো বীজ পুঁতে লাউয়ের আশা করছি। আর তা না পেলে হতাশ হচ্ছি, বলছি, কাউকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না; যে যায় লঙ্কায়, সে হয় রাবণ। অথচ কোনও রামায়ণেই লেখা নেই, যারাই লঙ্কায় গিয়েছে সবাই রাবণ হয়ে গিয়েছে। বরং সীতা, রাম, লক্ষ্মণ, যাঁরাই লঙ্কায় গিয়েছিলেন কেউই রাবণ হননি। এমনকী হনুমানও হনুমান হয়েই ফিরেছিলেন। এ প্রসঙ্গে রামায়ণ একটা অমূল্য শিক্ষা আমাদের দিয়েছে, যা আমরা গ্রহণ করছি না। সেটা হল: সীতা ছদ্মবেশী রাবণকে চিনতে ভুল না করলে এত বড় লঙ্কাকাণ্ড ঘটত না। আমরা ভোটাররাও চিনতেই পারছি না, আমাদের স্বার্থরক্ষাকারী দল কোনটি। 

ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলি যা-ই করুক না কেন, শক্তিশালী গণআন্দোলনই জনসাধারণকে কিছুটা ‘রিলিফ’ দিতে পারে; দেয়ও। আন্দোলনের ফলে দেখা গিয়েছে, বহু ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধি, ভাড়া বৃদ্ধির দাপটকে কিছুটা প্রশমিত করা সম্ভব হয়েছে, সম্ভব হয়েছে গরিব পরিবারের ছেলেমেয়েদের শিক্ষার ব্যয়ভারকে কিছুটা হলেও লাঘব করা, প্রাথমিক স্তরে ইংরেজি চালু করা, হাসপাতালের চার্জের ঊর্ধ্বগতির উদ্দামতাকে কিছুটা হলেও দমন করা, বহু দুষ্কর্মে দুষ্কৃতীদের চিহ্নিত করা ও শাস্তি দেওয়া, এমনই আরও কিছু। 

আর মোদী সরকার উচ্ছেদ হল কি হল না, তা কি সাধারণ মানুষের কাছে খুব আগ্রহের বিষয়? এর আগে বহু বার শাসক বদলেছে, কিন্তু শোষণের চরিত্রের কি বিরাট কিছু পরিবর্তন হয়েছে? কংগ্রেসের পর এসেছে বিজেপি; কংগ্রেসের নীতিগুলিকে, বলা ভাল মালিক তোষণ করা পদক্ষেপগুলিকে আরও সুচারু ভাবে কী করে প্রয়োগ করা যায় তারই সযত্ন অনুশীলন লক্ষ করা গিয়েছে সাড়ে চার বছরে। এ রাজ্যে বামফ্রন্টের জায়গায় এসেছে তৃণমূল কংগ্রেস। একই পরম্পরা এ ক্ষেত্রেও বর্তমান। সেই অর্থে যদি মোদীকে উচ্ছেদের ডাকে না থাকে এসইউসি, তবে কি বিরূপ সমালোচনার খুব বেশি জায়গা থাকে? 

সিপিএম কোন যুক্তিতে কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতা করছে জানি না; তবে কংগ্রেসের সঙ্গে বিজেপির পার্থক্য খুব স্পষ্ট ভাবে প্রতিভাত হচ্ছে না। এই জোটের ফলে সিপিএমের বিধায়ক-সাংসদের সংখ্যা হয়তো বাড়তে পারে, কিন্তু গণমুক্তি? তা নিয়ে বিচার-বিবেচনার জায়গাটা কি প্রতিটি ভোট উৎসব আমাদের গুলিয়ে বা ভুলিয়ে দেবে? 

গৌরীশঙ্কর দাস

সাঁজোয়াল, খড়্গপুর

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু, 

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০১। 

ইমেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।