মঙ্গলবার, ৬ নভেম্বর কালীপুজো। ধর্মের দোহাই দিয়ে দেশ জুড়ে লক্ষ লক্ষ ছাগশিশুকে হত্যা করা হবে। শাস্ত্রে ষড়রিপুকে বলি দিতে জীব হত্যার নির্দেশ আছে বলে আমার অন্তত জানা নেই। আরও মারাত্মক বিষয়টি হল বহু শিশুর সামনেই এই বলিদান প্রথা চলে, যা প্রত্যক্ষ করে শিশুরা উল্লসিত হয়, আবার অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এদের কথা ভেবে কি আমরা এই নিষ্ঠুর হত্যালীলা থেকে নিবৃত্ত হতে পারি না?
মায়ের কাছে তো সুস্থ ও জড়বুদ্ধিসম্পন্ন দুই সন্তানই সমান। এই শিক্ষাই তো আমরা জন্ম থেকে পেয়ে থাকি। তবে এই অমানবিক প্রথা এখনও চলে কী করে? প্রতিটি শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে এই অমানবিক প্রথা বন্ধে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারকেও এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ করতে হবে।

রাধিকানাথ মল্লিক
কলকাতা-৭


 

ধর্মমন্ত্রী দরকার

দেবাশিস ভট্টাচার্য (‘উৎসবের পাওয়া, না পাওয়া’, ২৬-১০)লিখেছেন, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উৎসবপ্রীতি সুবিদিত। তিনি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে সব ধর্মের উৎসবকেই গুরুত্ব দিয়ে ক্রমশ এক অন্য রকম আবহ তৈরি করে দিয়েছেন। এখন বড়দিন আর বর্ষশেষের কলকাতাকেও অনেক বেশি ঝলমলে লাগে। মানুষ অনেক বেশি আনন্দের উপাদান খুঁজে পান।’’ এ কথা ঠিক, এই সরকারের আমলেই যে কোনও ধর্মীয় উত্সবে গতি বেড়েছে। শারদোৎসবে সরকারি কোষাগার থেকে ক্লাবকে অনুদান, কার্নিভাল, প্রলম্বিত সরকারি ছুটি এই সরকারেরই অবদান। শহরে আলোর রোশনাই আগের থেকে অনেক বেড়েছে। শহরের বেশ কিছু পুজোর জাঁকজমক সত্যি নজরকাড়া। তবে সেগুলোর সিংহভাগ ক্লাবের কর্মকর্তাই কোনও না কোনও নেতামন্ত্রী। সত্তরের দশকে দেখা যেত পুজোর কর্মকর্তা, এলাকার তথাকথিত মস্তান।
প্রশ্ন হল, এ সব ধর্মীয় উৎসবে সরকারের চাপিয়ে দেওয়া আনন্দের উপাদানে মানুষ কি সত্যি আনন্দ খুঁজে পাচ্ছেন? আগে পুজোর বোনাস একটা বড় উপাদান ছিল আনন্দের। এখন রাজ্যে রুগ্‌ণ হয়ে যাওয়ায় বড় কলকারখানার বড় অভাব। এখনও রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের ডিএ বকেয়া। বন্ধ কারখানার বেকার কর্মচারীরা কোথায় উপাদান খুঁজবেন? দেখা যাচ্ছে এ রাজ্যে নিরাশ হয়ে অসংখ্য ছেলেমেয়ে কাজ পেয়ে ভিনরাজ্যে। একাকী বাবা-মায়েরা আনন্দের উপাদান কোথায় খুঁজে পাবেন? বরং ইদানীং সেতুভঙ্গ, বোমা বিস্ফোরণ, স্কুল-কলেজে গোলাগুলি, দিনেদুপুরে রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপরায়ণতার রোজনামচায় নাগরিকজীবন রীতিমতো আতঙ্কিত।

শারদোৎসবকে ঘিরে বহু মানুষের রুজি রোজগারের ব্যবস্থা প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। এখন থিম পুজোর দৌলতে এবং সরকারি আনুকূল্যে তা অবশ্য আরও বেড়েছে। দেবাশিসবাবু দাবি করেছেন ‘‘দেশবিদেশে এই সব জাঁকজমকের প্রচার হতে থাকলে পশ্চিমবঙ্গের প্রতি পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়বে।’’ বাস্তবে দেখা যায় রাতের পুজোপ্যান্ডেলে দেশবিদেশ নয়, মফস্সলের উঠতি বয়সিদের ভিড় সামলাতেই পুলিশ হিমশিম খায়। দেবাশিসবাবু ঠিকই ধরেছেন, ‘‘ইদানীং পুজো থেকে বিসর্জন পর্যন্ত দুর্গোৎসবের সমারোহ যে মাত্রা পেয়েছে, তাতে মমতার ভূমিকা অস্বীকার করার নয়।’’ কার্যত শাসক দল এ রাজ্যে সরকারি আনুকূল্যে যে ভাবে শারদোৎসবকে অধিগ্রহণ করেছে, অতীতে কোনও সরকারের শাসক দল তা পারেনি। বিদেশে শিল্প বৈঠক কিংবা ঘটা করে শিল্প সম্মেলন করেও তেমন কর্মসংস্থান চোখে পড়ে না। বরং এ রাজ্যে রুগ্‌ণ শিল্প অধিগ্রহণ না হলেও ধর্মীয় উত্সবে সরকারি অধিগ্রহণ চলছে। বিদেশি পুঁজি না এলেও, উত্সবে বিদেশি পর্যটক টানার প্রচেষ্টায় শিল্পমন্ত্রীর চেয়েও ধর্মমন্ত্রীর বড় প্রয়োজন।

দেবব্রত সেনগুপ্ত
কোন্নগর, হুগলি

 

কী পেলাম

রবি ঠাকুরের প্রেম পর্যায়ের ৩৯৫ সংখ্যক গানটি মনে পড়ল ‘উৎসবের পাওয়া, না পাওয়া’ নিবন্ধটি পাঠ করে। গানটির কথা পাল্টে নিয়ে যদি বলি, উৎসব তোমাকে যেতে দিতে চায় না মন, তা হলে কেমন হয়? সেই মহালয়ার দিন থেকে শুরু হওয়া উৎসব এখনও বহমান। অচিরে শক্তিপূজার আয়োজনে মেতে উঠবে এই বঙ্গের উৎসবপ্রিয় জনতা। সঙ্গে জুড়বে শব্দবাজির তাণ্ডব।
রাস্তা জুড়ে পুজোর প্যান্ডেল তৈরির রেওয়াজ জনগণ মেনে নিয়েছেন বহু কাল যাবৎ। কিন্তু দশ-বারো দিনের মহোৎসব পালনে কী মহিমা আছে? কতটা পর্যটনশিল্পের বাড়বাড়ন্ত হয়? মুষ্টিমেয় টুরিস্টকে পুজো কার্নিভালে হাজির করিয়ে কোন মহাভারত পাঠের পুণ্য অর্জিত হয়? কাজকর্ম লাটে উঠিয়ে দিয়ে স্কুলকলেজের ছুটির মতো সরকারি অফিসকাছারিতে সুদীর্ঘ পূজাবকাশ চলে। দিব্যি খেয়ে–ঘুমিয়ে-ঘুরে বেড়িয়ে, আড্ডা মেরেও যখন অফিস যাওয়ার তাড়া অনুভূত হয় না, গায়েগতরে ব্যথা ধরে যায় ছুটির তাণ্ডবে, তখন পুজোতে পাওয়া, না-পাওয়া সব গুলিয়ে যায়। পাওয়া বলতে তো চূড়ান্ত আলসেমি। আর না পাওয়া বলতে, পুজোর ছুটিটা ভাইফোঁটা অবধি কেন হয় না, এ জাতীয় ক্ষোভ।

প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে, অফিস কাছারি খোলা না থাকলে রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়, যেমন বিদ্যুৎ খরচের বহর কমে, পরিবহণজনিত দূষণের হাত থেকেও সাময়িক রেহাই মেলে, কিন্তু তাতে সুরাহা কী হয়? রাজ্যে কি কাজ কম পড়িয়াছে? ছুটিতে জমে থাকা কাজ কি পুজোর পর অফিস খুললে নির্দিষ্ট সময়ে শেষ হয়? এ সব প্রশ্ন বাতুলতা মাত্র। সরকারি কাজের বিশ্লেষণ আমজনতার ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। কিন্তু, এত ছুটি কেন? কী ক্ষতি পঞ্চমী থেকে দশমী, লক্ষ্মী পুজো এবং দীপাবলি ভাইফোঁটায় একটি করে ছুটি বরাদ্দ হলে? কী লাভ পুজো কার্নিভাল, বড়দিন, ইংরেজি নববর্ষের আবহে শহরকে বিশেষ ভাবে চিহ্নিতকরণের? এ বাহুল্য, এই বিপুল ব্যয়ভার বহন এবং দেখনদারির কৃতিত্ব অর্জন খুব কি জরুরি? কার্নিভাল কী এমন মান্যতা দেয় পুজোর আবহে? 

এহ বাহ্য। উৎসবকে মোচ্ছবে রূপান্তরিত করতে গিয়ে আমরা এখন তো অবিরাম পিছনপানে ছুটছি। কোথাও বা পুরনো কাল্পনিক রাজবাড়ির অলীক ঠাকুরদালানে মা দুর্গার সংসার, কোথাও আস্ত একখানি গ্রামকে তুলে এনে তাক লাগানোর প্রচেষ্টা। এ ছাড়া আছে বিমূর্ত ছবির মতো প্যান্ডেল, আবহ, আলোআঁধারির খেলা। প্রাচীন অলিন্দ, প্রেমে মজে গিয়ে স্মৃতিজাগানিয়া পুরনো কলকাতার সাময়িক খণ্ড চিত্র প্রদর্শন। সোনায় মুড়ে দেওয়া শাকম্ভরী বা রুপোর রথের প্রচার মহিমায় মেতে উঠেছেন পাবলিক। কত মোহাবিষ্ট জনতা যে নিদেনপক্ষে একটা সেলফি (প্যান্ডেল সমেত) বা মায়ের ছবি সমেত গ্রুপফি সুষ্ঠু ভাবে না নিতে পেরে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন, তার হিসেব কে রাখে? ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকে কেবল তাড়া খাওয়া। তাড়াতাড়ি করে ঠাকুর দেখে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য রীতিমতো হুকুম। অগত্যা, নান্যপন্থাঃ! পুজো এখন কে-ই বা দেখেন? সবাই সেলফি এবং বন্ধু-বন্ধুনির সঙ্গসুখের মস্তিতে উত্তর থেকে দক্ষিণ চষছেন। তা চষুন। পুলিশ প্রশাসনের অবিরাম নজরদারি এবং অক্লান্ত পরিশ্রমে পুজোটা এ বারকার মতো উতরে গেল। এটাই বা কম কী? কিন্তু, কোন মোক্ষ লাভ হয় মাতৃবন্দনার নামে এই বাড়াবাড়িতে?

ধ্রুবজ্যোতি বাগচী
কলকাতা-১২৫

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা
সম্পাদক সমীপেষু, 
৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০১। 
ইমেল: letters@abp.in
যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।

ভ্রম সংশোধন
ইডেনে হিরো কাপের পঁচিশ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানের ছবিতে (খেলা, পৃ ২৬, ৩-১১) শহর সংস্করণে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় না থাকলেও ক্যাপশনে তাঁর নামের উল্লেখ রয়েছে। অনিচ্ছাকৃত এই ভুলের জন্য আমরা দুঃখিত ও ক্ষমাপ্রার্থী।